Follow us
Search
Close this search box.

পিরামিডের দেশে (দ্বিতীয় পর্ব)

পিরামিডের দেশে (দ্বিতীয় পর্ব)

আজ ২৬ ডিসেম্বরের (২০২২)। ইজিপ্টে আমার তৃতীয় দিন। গতকাল গিজার তিন পিরামিড ও সাকারার স্টেপ পিরামিড দেখেছি। আজ যাব আলেকজান্দ্রিয়ায়। সকাল সকাল ঘুম ভেঙেছে। বাইরে মোলায়েম রোদ্দুর। মৃদু বাতাসে হিমের পরশ। সবমিলিয়ে চমৎকার আবহাওয়া। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে প্রাতরাশের জন্য হোটেলের ডাইনিং হলে চলে এলাম। আবাসিকদের জমায়েত ঘটতে শুরু করেছে সেখানে। ব্রেকফাস্ট সেরে যে যার পরিকল্পনা মতো বেড়াতে বেরবে।

প্রথম পর্বের লেখাটি পড়তে পারেন এই লিঙ্কেঃ https://torsa.in/in-the-land-of-the-pyramids-part-1/

টেবিলে থরে থরে খাদ্যের সম্ভার সাজানো। যার যেরকমটা ইচ্ছে নিয়ে নাও। বুফে সিস্টেম। চিজ, সালাদ, চিকেন, বেকড পোটাটো, পাস্তা, রূটি, জ্যাম ইত্যাদির মতো কন্টিনেন্টাল নানা পদ ও ফলমূলের মধ্যে প্রায় আত্মগোপন করে ছিল ইজিপশিয়ান ঘরানার দু-তিনটি পদ। চেখে দেখার জন্য তার মধ্যে থেকে একটু ফুলমুতামুস নিলাম। ইজিপশিয়ানদের প্রিয় পদ এটি। সেদ্ধ করা বিন, টম্যাটো ইত্যাদি নানা মশলা সহযোগে পরিবেশিত হয়ে থাকে। রুটি দিয়ে খেতে হয়। হালকা খাবার। মন্দ লাগল না ফুলমুতামুস।

অ্যাটেনডেন্ট এসে জানিয়ে গেল আলেকজান্দ্রিয়া যাওয়ার গাড়ি এসে গিয়েছে। গাড়ি মানে বেশ বড়সড় ঝকঝকে তকতকে কোচ। অনেকেই আলেকজান্দ্রিয়া যাচ্ছেন আজ। উঠে পড়লাম কোচে। বেশ ব্যবস্থা। কায়রো থেকে সড়কপথে আলেকজান্দ্রিয়া প্রায় ২২০ কিলোমিটার। কায়রো থেকে যাওয়ার ট্রেন ও বাসও পাওয়া যায়।

আলেকজান্দ্রিয়া

প্রাচীনতার সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে ভূমধ্য সাগরের তীরে আলেকজান্দ্রিয়ায়। ইজিপ্টের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়া একটি পুরনো বন্দর শহরও বটে। উগান্ডা, তানজানিয়া, কেনিয়া জুড়ে বিস্তৃত লেক ভিক্টোরিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে নীলনদ ভূমধ্যসাগরে মিলিত হয়েছে এই আলেকজান্দ্রিয়ায়।

জিশু খ্রিস্টের জন্মের ৩৩১ বছর আগে আলেকজাণ্ডার দি গ্রেট এই শহরের পত্তন ঘটিয়েছিলেন। মেমফিস বা বৃহত্তর কায়রো থেকে প্রাচীন ইজিপ্টের রাজধানীও স্থানান্তরিত হয়েছিল এই আলেকজান্দ্রিয়ায়। গ্রিসীয়দের পরে আলেকজান্দ্রিয়া এল রোমানদের দখলে। এ হেন শহর যে প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থান হবে তাতে আর আশ্চর্য কী।

সমাধি কক্ষের দেওয়াল

আমরা প্রথমে গেলাম ক্যাটাকমস অফ কম এল শোকাফা (catacombs of Kom El Shoqafa). ভাঙাচোরা সামগ্রীর স্তূপ । মূলত এক হতবাক করে দেওয়া সমাধিক্ষেত্র। শোক এখানে শিল্প হয়ে উঠেছে। মৃত্যু জাতি মানে না। মাটির নীচের চেম্বারে গ্রিক-ইজিপশিয়ান সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের দিব্য সঙ্গত দেখা যায়। ঘুরে দেখলে রোমান স্থাপত্যশৈলীর ডাইনিং হল চোখে পড়বে। রিলিফের বড় বড় কাজ, পেইন্টিং, ‘শিয়াল দেবতা’ আনুবিস কী স্পষ্ট। জীবন্ত। ঘোর লেগে গেল।

সোকাফার সমাধিক্ষেত্রে মৃতদের আত্মার উদ্দেশে অর্পণ করার জন্য নানা আকারের পাত্রে বিবিধ সামগ্রী আনা হত সমাধিক্ষেত্রে। সেই সব পাত্র আর ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত না। ভেঙ্গে ফেলা হত। তারই স্তূপ গড়ে উঠেছিল। কত যে শিল্পসুষমামণ্ডিত টেরাকোটার পাত্র গভীর মনযোগ সহকারে গড়ে আবার নির্মোহ মনোভাবে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।

সমাধি ক্ষেত্রের একটি চেম্বারে

পম্পেইয়ের স্তম্ভ দেখলাম। রোমান স্থাপত্যরীতিতে গড়া বিজয়স্তম্ভ। রোমান সম্রাট জোভিয়াসের সম্মানে স্তম্ভটি তৈরি হয়েছিল ৩০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ। বেলা গড়িয়েছে। একটু বসতে পারলে ভালো হয়। আরও হাঁটাহাঁটি আছে। মধ্যাহ্নভোজন সেরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। রেস্তোরাঁয় বসে ভাবছিলাম, কী যত্ন করে এখনকার মানুষ ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। গ্রিক, রোমান স্থাপত্যগুলিকে ভেঙেটেঙে ফেলার কথা কল্পনাতেও ভাবতে পারেন না আলেকজান্দ্রিয়া তথা ইজিপ্টের মানুষ। আর ইতিহাস সংরক্ষণ করে আর্থিক দিক থেকেও লাভবান হচ্ছে দেশটি।

পম্পেইয়ের পিলারের সামনে লেখক

বিকেলের দিকে দেখতে গেলাম কোয়াইত বে দুর্গ। সুলতান আল-আসরফ সাইফ আল-দিন কোয়াইত বে ভূমধ্যসাগরের তীরে পেল্লায় এই দুর্গটি তৈরি করিয়েছিলেন। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে। সমুদ্রপথে তর্কীদের আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল দুর্গটি। বিরাট বিরাট হল, সিলিংয়ের কারুকাজে সুলতানী মেজাজ।

আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারে তো যেতেই হবে। ‘গ্রেট লাইব্রেরি অফ আলেকজান্দ্রিয়া’। রসিকজনেদের শুধু এই প্রাচীন গ্রন্থালয় ও সংগ্রহশালাতেই কেটে যেতে পারে দিনের পর দিন। শুধু যুদ্ধবাজ কিছু সৈন্য নয়, দিগ্বিজয়ের সময়কালে আলেকজান্ডারের সঙ্গে ছিল নানা বিষয়ের পণ্ডিতদের দলও। অ্যারিস্টটলের ছাত্র, মহাকাব্য ‘ইলিয়াডের’ ভক্ত আলেকজান্ডার দি গ্রেট প্রদীপটা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। জ্ঞান আহরণ, তার সংরক্ষণ ও প্রয়োগের ধারণা ও ইচ্ছেটা জ্ব্লে উঠেছিল। তারই ফল আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি। প্রাচীন সব পুঁথি, প্যাপিরাসের স্ক্রোল, প্রাচীন পুস্তক, কোথায় কী মাণিক্য অন্তরালে রয়ে গিয়েছে কে জানে। জিশু খ্রিস্টের জন্মের ৩২৩ বছর আগে মৃত্যু হয়েছিল আলেকজান্ডারের। যতদূর জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে এই গ্রন্থাগারটি ছিল। আমরা এখনো দেখতে আসছি।

আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি। ফটো সৌজন্য: বাইবেল ওডিসি

কায়রো ফেরার পথে আলেকজান্দ্রিয়ার মনতাজহ গার্ডেনে ঢুঁ মেরেছিলাম। রাজকীয় বাগিচা। সঙ্গে বিরাট প্রাসাদ। বিংশ শতকে তৈরি হয়েছে। জানা গেল, প্রাসাদের গঠনশৈলীতে তুরস্ক ও ইটালির ফ্লোরেন্সের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। মেরামত ইত্যাদির কাজ চলছিল। খুব ঘুরে দেখা হয়নি। আর, যা যা দেখলাম, তার মধ্যে সময়ের বিচারে এ জায়`ঋ তো দুধের শিশু। মাথার মধ্যে ক্যাটাকমস অফ শোকাফা আর আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের নানা দৃশ্য ভেসে উঠছে। টাইম মেশিনে চড়ে বেড়িয়ে এলাম যেন।

আলোয় ছয়লাপ কায়রো শহরে প্রবেশ করলাম। ক্রমশ জমে উঠবে খান-এল-খলিলির বাজার। পরের পর্বে এই বাজারটির কথা বলব।

 

ফটো:পম্পেইয়ের পিলারের সামনে লেখক ও আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি ছাড়া অন্য ছবিগুলি তুলেছেন লেখক।
পরবর্তী অংশ আগামী পর্বে

4 Comments

  1. […] দ্বিতীয় পর্বের লেখাটি পড়তে পারেন এই লিঙ্কেঃ https://torsa.in/in-the-land-of-the-pyramids-part-2/ […]

  2. […] দ্বিতীয় পর্বের লেখা পড়ার লিঙ্কঃ https://torsa.in/in-the-land-of-the-pyramids-part-2/ […]

  3. […] দ্বিতীয় পর্বের লেখা পড়ার লিঙ্কঃ https://torsa.in/in-the-land-of-the-pyramids-part-2/ […]

  4. […] দ্বিতীয় পর্বের লেখা পড়ার লিঙ্কঃ https://torsa.in/in-the-land-of-the-pyramids-part-2/ […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *