Follow us
English

নীল সমুদ্র, সোনালী সৈকত, ফরাসী ঐতিহ্যের পন্ডিচেরি

নীল সমুদ্র, সোনালী সৈকত, ফরাসী ঐতিহ্যের পন্ডিচেরি

ফরাসী ঔপনিবেশিক আমলের হোয়াইট টাউনের কোনও কাফেতে এককাপ চা বা কফি নিয়ে বসুন। ইতিহাস ঘন হয়ে আসবে। প্রমেনেড সৈকতের বাতাসে ভালোবাসার আহ্বান। রেস্তোরাঁয় পাবেন হরেক ফরাসী কুইজিন। শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় পন্ডিচেরির ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পন্ডিচেরি (বর্তমানে পুদুচেরি) ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ছিল ফরাসী শাসনের অধীনে। এখনো অনেকে ফরাসী ভাষায় কথা বলেন এখানে। অনেকে ইংরেজি বলেন ফরাসী উচ্চারণে। এখানকার পুরানো ভিলা, নুড়িপাথর বেছানো গলিপথ, খাবারদাবার, চলনবলনে লেগে থাকে ফরাসী সংস্কৃতির ছোঁয়া। সেইসঙ্গে দারুণ সব সৈকত, চার্চ,মিউজিয়াম, অরবিন্দ আশ্রম, অরোভিল, দুর্দান্ত সব কাফে, সবমিলিয়ে পন্ডিচেরি ভারতীয়ত্ব ও আন্তর্জাতিকতার এক মেলবন্ধন এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্রও বটে। বছরভরই এখানে দেশীয় এবং বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনা লেগে থাকে।

বঙ্গোপসাগরের তীরে পন্ডিচেরি। জমজমাট প্রমেনেড সৈকত। সমুদ্র তীরে গোবার্ট অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটার যে ভালো লাগা তার রেশ মনে বিছিয়ে থাকে অনেকদিন। একদিকে সুনীল জলরাশি, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক আমলের সারি সারি বাড়ি। সন্ধ্যায় সেই সৈকত জুড়ে উৎসবের মেজাজ। শহরের বহু মানুষ বেড়াতে আসেন সমুদ্র তীরে। আসেন পর্যটকরা। আইসক্রিম, কফি এদিক সেদিক।

শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে সেরেনিটি বিচ। সারিবদ্ধ সবুজ পামগাছ,সাদা বালির সৈকত, নীল সমুদ্র, সব মিলিয়ে এক রূপকথা। সার্ফিংয়ের জন্য বিখ্যাত এই সৈকত। এখানকার কাল্লিয়ালয় সার্ফ স্কুল সার্ফিংয়ের প্রশিক্ষণ দেয়। নানা মূল্য ও মেয়াদের সার্ফিং প্যাকেজ আছে। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর : ০৯৪৪২৯৯২৮৭৪

পন্ডিচেরি শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অরোভিল সৈকত। পাশেই অরোভিল টাউনশিপ। সৈকত ঘেঁষে রেস্তোঁরা, দোকানপসারের ভিড় নেই। অপার শান্তির সৈকত এটি। অরোভিল সৈকত থেকে সূর্যোদয়, সূর্যাস্তের দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ।

 

পন্ডিচেরি মিউজিয়াম

পন্ডিচেরির মিউজিয়ামটি অবশ্য দ্রষ্টব্য। এই মিউজিয়ামে রয়েছে আরিকামেরুতে খননকার্য চালিয়ে পাওয়া এমন সব প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী যা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে,প্রাচীণ আরিকামেরু বন্দরের সঙ্গে রোমের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। পন্ডিচেরি থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে আরিকামেড়ু একটি মূল্যবান প্রত্নস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মিউজিয়ামে পল্লব ও চোলা আমলের অনেক পাথর ও ব্রোঞ্জ ভাস্কার্যের সংগ্রহ রয়েছে। দেখা যাবে ফরাসী চিত্রকলার সংগ্রহ। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে মিউজিয়াম। হোয়াইট টাউনের লুই স্ট্রিটে মিউজিয়ামের অবস্থান।

সেক্রেড হার্ট ব্যাসিলিকা

গথিক স্থাপত্যশৈলীর একটি চমৎকার নিদর্শন এই চার্চটি। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি পবিত্র তীর্থ। তবে সব ধর্মের মানুষই এখানে আসেন এর স্থাপত্য সৌন্দর্যের টানে। অসাধারণ সব গ্লাসপেন্টিং রয়েছে এই চার্চে। পর্যটকরাও এই চার্চে রবিবারের প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করতে পারেন।

মনকুলা বিনয়াগর মন্দির

পন্ডিচেরির প্রাচীন গণেশ মন্দির এটি। সমুদ্রতীরে মনকুলা বিনয়াগর স্ট্রিটে মন্দিরের অবস্থান। ফরাসী শাসনের সময়ে হোয়াইট টাউনের অন্তর্গত ছিল মন্দির এলাকাটি। সাহেবরা মন্দিরের গণেশ মূর্তির ক্ষতি করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল বলে কথিত আছে। প্রতি বছর অগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ২৪ দিন ধরে বড় মাপের উৎসব হয় মন্দিরে।

অরবিন্দ আশ্রম

শুধু পন্ডিচেরি বা ভারতের নয়, অরবিন্দ আশ্রম এখন একটি আন্তর্জাতিক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। সারাবছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ আসেন এখানে। একদা বিপ্লবী, পরবর্তীকালে যোগী, দার্শনিক ও লেখক শ্রী অরবিন্দ ঘোষ ঋষি অভিধায় পরিচিত হন।ঋষি অরবিন্দ তাঁর আধ্যাত্মিক সহযোগী মিরা আলফাসা তথা ‘মা’-র প্রচেষ্টায় পন্ডিচেরিতে একটি আশ্রম গড়ে ওঠে। পরে মায়ের নিরলস প্রচেষ্টায় আশ্রম বড় হয়। এখন সারা পন্ডিচেরি জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অরবিন্দ আশ্রমের আর্থসামাজিক ও আধ্যাত্মিক নানা কর্মকাণ্ড।

আশ্রমের মধ্যেই রয়েছে সমাধি। সকাল ৮টা থেকে ১২টা এবং দুপুর ২টো থেকে ৬টা পর্যন্ত সমাধি দর্শন করা যায়। সোম,মঙ্গল,বুধ ও শুক্রবার সন্ধ্যা ৭.২৫ থেকে রাত ৮.১৫ পর্যন্ত সমবেত মনঃসংযোগের সেশন আয়োজিত হয়। অংশগ্রহণের জন্য আশ্রম অফিস থেকে ভিসিট্র- পাস সংগ্রহ করতে হয়।

কন্ডাক্টেড টুর

অরবিন্দ আশ্রমের ‘অটোকেয়ার সার্ভিসেস’ প্রত্যেক কাজের দিন দুটো করে কন্ডাক্টেড টুরের আয়োজন করে থাকে পন্ডিচেরির মধ্যে। সকালের টুর শুরু হয় সোয়া ৮টায়। ঘুরিয়ে দেখানো হয় আশ্রমের বিভিন্ন বিভাগ। বেলা দেড়টার টুরে নিয়ে যাওয়া হয় অরোভিল (মাতৃমন্দির দর্শন স্থল)।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ শ্রী অরবিন্দ অটোকেয়ার সার্ভিসেস, ৩-এ রঙ্গপিল্লাই স্ট্রিট (কার্তিক হোটেলের উল্টোদিকে), পুদুচেরি – ১০৫০০১।
ফোন নম্বর : ৪১৩-২২৩৩৬৮৭ , ৯৮৪৩০-৩৮৭৭৩।

অরবিন্দ আশ্রমের ঠিকানা: ১২,মেরিন স্ট্রিট , হোয়াইট টাউন,পুদুচেরি – ৬০৫০০২। খোলা থাকে: সকাল ৮টা থেকে বেলা ১২টা এবং দুপুর ২টো থেকে সন্ধ্যে ৬টা।

অরোভিল

একটি পরীক্ষামূলক আন্তর্জাতিক টাউনশিপ অরোভিল। গড়ে উঠেছে শ্রী মা-র দর্শন অনুসারে। ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো অরোভিলের ধারণাকে মানবজাতির স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট হিসেবে আখ্যা দেয়।

 

পন্ডিচেরির ১০ কিলোমিটার উত্তরে তামিলনাড়ু ও পন্ডিচেরীর ২০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে অরোভিল টাউনশিপের বিস্তার। ১৯৬৮ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ভারতসহ ১২৪ টি দেশের প্রতিনিধিসহ মোট ৫০০০ মানুষের উপস্থিতিতে অরোভিল প্রজেক্টের উদ্বোধন হয়।

জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে একত্রিত স্বয়ংসম্পূর্ণ একত্রিত জীবন ও চেতনার উন্মেষ অরোভিলের বিশেষ আদর্শ। অরোভিল টাউনশিপের মধ্যে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল জোন,ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন,কালচারাল জোন,পিস এরিয়া, রেসিডেনসিয়াল জোন ও সবুজ অঞ্চল। বর্তমানে প্রায় ২৫০০ মানুষ নিয়মিতভাবে অরোভিল টাউনশিপে বসবাস করেন।

অরোভিল গেস্টহাউসঃ অতিথিদের থাকার জন্য অরোভিল টাউনশিপের মধ্যেই নানা মানের গেস্টহাউসের বন্দোবস্ত রয়েছে। গেস্টহাউস সংক্রান্ত তথ্যের জন্য দেখতে পারেন এই ওয়েবসাইটটি : https://guesthouses.auroville.org  


ফোন নম্বর : ০৪১৩-২৬২২৭০৪

পুদুচেরি শিল্পগ্রাম (আর্ট এন্ড ক্রাফট ভিলেজ)

পন্ডিচেরী শহরের প্রান্তে মুরুঙ্গাপক্কম এলাকায় পুদুচেরি আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট ভিলেজে দক্ষিণ ভারতের হস্তশিল্পের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।

কাঠ,টেরাকোটা,সেরামিক,টেক্সটাইল,হ্যান্ডমেড পেপার,কাঁচ প্রভৃতি মাধ্যমে রকমারি সামগ্রী তৈরির প্রক্রিয়াও দেখা যায় এখানে।হস্তশিল্পসামগ্রী কেনা যায়। তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন এই নম্বরে:(৪১৩) ২৩৫৮৫৭৬।

গমে (gourmet) বাজার

গমে একটি ফরাসি শব্দ। শব্দটির অর্থ বিশেষ,সূক্ষ্ম ইত্যাদি। পন্ডিচেরিতে এই নামের একটি বাজার এলাকা রয়েছে সমুদ্রতীরে। প্রচুর রেস্তোরাঁ রয়েছে এখানে। তামিলনাড়ু, কর্ণাটক,অন্ধ্রপ্রদেশ,কেরালার খাদ্যসম্ভার পাবেন এইসব রেস্তোরায়ঁ। চেট্টিনাদ, উদুপি,হায়দ্রাবাদী ঘরানার খাদ্যের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় আসলে পণ্ডিচেরীকে খুঁজে দেখারই একটি আভিযান। পাবেন চাইনিজ, ইউরোপিয়ান,ভিয়েতনামিজ,ফরাসী খানাও।

হেরিটেজ ওয়াক

ফ্রেঞ্চ হেরিটেজ ওয়াক ও তামিল কোয়ার্টার ওয়াকের ব্যবস্থা আছে পন্ডিচেরিতে। প্রথমটিতে ফরাসী স্থাপত্য ও ফরাসী স্মৃতিচিহ্নবাহী বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা যায় পায়ে হেঁটে। সঙ্গে গাইড থাকবেন। পুদুচেরি টুরিস্ট ইনফর্মেশন সেন্টার থেকে পদযাত্রা শুরু হয়। যাত্রা শেষও হয় এখানে। ২ কিলোমিটারের পদযাত্রা। সময় লাগে ১ থেকে দেড় ঘন্টা।


তামিল কোয়ার্টার ওয়াক শুরু হয় এশ্বরণ কোয়েল মন্দির চত্বর থেকে,শেষ হয় ডি ও সি স্কুলের সামনে। এই পদযাত্রায় পন্ডিচেরির প্রাচীন তামিল স্থাপত্য, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ২ কিলোমিটারের হাঁটাপথ। ঘন্টাখানেক সময় লাগে। হেরিটেজ ওয়াকের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন এই ঠিকানায়: ট্যুরিজম ইনফর্মেশন সেন্টার,৪০, গোবার্ট অ্যাভিনিউ, পন্ডিচেরী – ৬০৫০০১। ই-মেইল :  tourism.pon@nic.in ফোন: (৪১৩) ২৩৩৯৪৯৭।

যাওয়ার পথ

হাওড়া-পুদুচেরি সাপ্তাহিক এক্সপ্রেস সরাসরি পুদুচেরি যায়। সময় লাগে ৩২ ঘন্টা। হাওড়া থেকে করমণ্ডল এক্সপ্রেস বা চেন্নাই মেলে চেন্নাই পৌঁছে সেখান থেকে বাসে পন্ডিচেরি। পৌঁছানো যায় ৪ ঘন্টায়। দূরত্ব ১৬২ কিলোমিটার। চেন্নাইয়ের প্যারিস কর্নার বাসস্ট্যান্ড থেকে পন্ডিচেরি যাওয়ার বাস ছাড়ে ঘন ঘন। বিমানে চেন্নাই গিয়ে সেখান থেকে বাসে বা ট্যাক্সিতে পন্ডিচেরি পৌঁছানো যেতে পারে। সেক্ষেত্রে পন্ডিচেরির সঙ্গেই চেন্নাই সিটি টুর,কাঞ্চিপুরম, মামল্লপুরম ভ্রমণ যোগ করা যেতে পারে।

থাকার ব্যবস্থা

হোটেল আন্নামালাই ইন্টারন্যাশনাল : ০৪১৩ ২২৪৭০১১
দেভিস গ্রাম : ০৪১৩ ২২২৫২২২
অ্যাকর্ড পুদুচেরি : ০৪১৩ ২২৯৯১৭৭
অবিরামি রেসিডেন্সি:০৪১৩ ২২২৯৮৮১
হোটেল আনন্দ ইন : ০৪১৩ ২৩৩০৭১১
হোটেল অতিথি : ০৪১৩ ২২০৭৫০০
হোটেল মাস : ০৪১৩ – ৪২০৭০০১
লা মাইসন রাধা (হোমস্টে গেস্টহাউস) : ৯৮৪২৩৩৯৯৯০
ভিলা-দু ওসান : ৯৯৪৩০৬৫৬৬৬
হোটেল রাম ইন্টারন্যাশনাল : ৯৪৮৬১৪৪১০০
মাল্লা ইকো বিচ রিসর্ট : ০৪১৩ – ২৬৫৫৬৮৬
দ্য রিচমন্ড : ০৪১৩ – ২৩৪৬৩৬৩
সানওয়ে ম্যানর : ৯৬০০২৩৪৫৬৭

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *