শরতের কাশ্মীর, ঝরা পাতার রূপকথা
September 9, 2026
তুষার পাত্র
২০৬২৩ মালগুডি এক্সপ্রেস থেকে নেমে যখন রামনগরম স্টেশনে পা রাখলাম, তখন সত্যিই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। মাঝে মধ্যে এই স্টেশনের ওপর দিয়ে গেলেও নামা হয়নি কখনো। এই প্রথমবার নামলাম কর্নাটকের রামনগরম স্টেশনে। শোলে ছবির রামগড় আজকের রামনগরম। সে দিনের সঙ্গে আজকের স্টেশনের আসমান -জমিন তফাত ঘটে গেছে। বাহান্নটা বছর কেটে গিয়েছে ইতিমধ্যে। ১৯৭৩ সালে পরিচালক রমেশ সিপ্পি প্রায় প্রবাদে পরিণত হওয়া ‘শোলে’ ছবির আউটডোর লোকেশন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এই নিরালা পাহাড়ি জনপদ রামদেওরা বেট্টা জায়গাটিকে। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৫ সালে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে আরেকটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে শোলে।
ছবির দুই চরিত্র জয় আর বিরু (যথাক্রমে অমিতাভ বচ্চন ও প্রইয়াত ধর্মেন্দ্র) যখন তৎকালীন রামগড় স্টেশনে নেমেছিল তখন পাহাড়ে ঘেরা ছোট্টো একটা স্টেশন, চলত স্টিম ইঞ্জিনের ট্রেন । আজকের রামনগরম ঝাঁ চকচকে, একেবারে আধুনিক একটা স্টেশন। স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে এলাম বাইরে। বাঁ-দিকে কিছুটা হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালাম একটা গাছের নিচে।না….আজ আর বাসন্তীর (হেমামালিনী) সেই টাঙ্গা নেই। সেই জায়গায় শুধু অটোর সারি। পুরানো সেই গাছটা কিনা জানিনা, তবে জায়গাটা ঠিক সেটাই। বাসন্তীর টাঙ্গার পথ ধরে কিছুটা গিয়ে উঠে পড়লাম একটা অটোতে। সে সব কাঁচা রাস্তা এখন পাকা। গ্ৰামের খোলস ছেড়ে এখন রামনগরম পুরোদস্তুর এক আধুনিক জনপদ।

অটো চালক ভদ্রলোক স্থানীয় এবং বয়স্ক। ইচ্ছে করেই অটো চালক নির্বাচন করেছিলাম, শোলে সিনেমাটির সেই সময়কার কিছু তথ্য পাওয়া যায় কিনা সেই আশায়। জানা গেল রামগড়ে শোলের শ্যুটিং চলাকালীন সময়ে উনি স্কুলে পড়তেন। মাইশোর-বেঙ্গালুরু হাইওয়ে টপকে অটো থামল এক জায়গায় শোলের শ্যুটিংয়ের ওই সময়ে এখনকার হাইওয়ের সমান্তরাল কোন দিকের কাঁচা রাস্তায় ছোটানো হত ঘোড়া, ঠিক কোথায় তৈরি হয়েছিল শোলে ছবির সেই বিখ্যাত জলের ট্যাঙ্ক। একটু দূরে তৈরি হয়েছিল গ্ৰামের সেট। সামনে ডানদিকের পাহাড়ের কোলে তৈরি করা হয়েছিল ঠাকুর সাহেবের (সঞ্জীব কুমার) ঘর। এখন সেখানে গড়ে উঠেছে জনবসতি।

আরো কিছুটা পথ যাওয়ার পর অটো এসে থামল একটা গেটের সামনে। গেট থেকে পাঁচশ মিটার দূরে অতীতের মূল শ্যুটিং স্পট এখন রামদেওরাবেট্টা ভালচার স্যাংচুয়ারি। এন্ট্রি ফি মাথাপিছু পঁচিশ টাকা। ছুটির দিন। প্রচুর গাড়িঘোড়া চারিদিকে। লোকজন এসেছেন প্রধাণত অভয়ারণ্য ঘুরে দেখতে, জায়গাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। আমি পাহাড়ের উপর শোলে ছবির শ্যুটিংয়ের স্মৃতি রোমন্থনকারী এক নিঃসঙ্গ পথিক।

খোঁজ করে স্যাংচুয়ারির এক কর্মীকেই গাইড হিসেবে পেলাম। এই স্যাংচুয়ারির আশেপাশেই ছবির বেশির ভাগ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছিল। সে সময়ে জায়গাটা ছিল রুক্ষ, পাথুরে। সেই জায়গাগুলো এখন বনসৃজনের কল্যাণে গাছগাছালিতে ভরা। চেনার একমাত্র উপায় বড় বড় বোল্ডার, টিলা। গাইড ভদ্রলোক ঘুরে ঘুরে শোলের অ্যালবাম মিলিয়ে দেখালেন জায়গাগুলো। গব্বরের (আমজাদ খান) পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আশা থেকে শুরু করে, দোলনা টা ঠিক কোথায় টাঙানো হয়েছিল…হেমা মালিনীর সেই বিখ্যাত নাচ কোথায় শ্যুট হয়েছিল… যেখানে দাঁড়িয়ে গব্বরের বিখ্যাত ডায়লগ – কিতনে আদমি থে!…তারপর হাতে চাবুক নিয়ে পায়চারি…তারপর সেই হাসি….তারপর? ..”যো ডর গয়া সমঝো মর গয়া”। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সামনের টিলায় কোথায় বসে ছিল শাম্ভা.. রক্তাক্ত জয় আর বীরুর সেই শেষ দৃশ্যের শ্যুটের জায়গাটা চেনা গেল পিছনের পাথরটা দেখে। তার পর সেই জায়গাটা….গব্বর আর-ঠাকুর সাহাব মুখোমুখি, গব্বরের সেই হুঙ্কার, “ইয়ে হাত মুঝে দে দে ঠাকুর”।

সমতলের দৃশ্যগুলোর বেশির ভাগ জায়গা এখন গাছে ঢাকা। জায়গাটাকে ক্যামেরার কারিগরিতে বিভিন্ন অ্যঙ্গেল থেকে নানা দৃশ্যে দেখানো হয়েছিল। পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত। শোলে ছবির আঁতুড়ঘরে দাঁড়িয়ে আমি, আর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল কালজয়ী শোলে সিনেমার নানান দৃশ্য। শোলে সত্যিই এক নস্টালজিয়া!
বেঙ্গালুরু থেকে মাইসোর রোড ধরে রামনগরের শোলে সিনেমার শ্যুটিং স্পট ৫০ কিলোমিটার। বাস ও প্রাইভেট গাড়ি পাওয়া যাবে। ছবিতে দেখা সেই রুক্ষ, পাথুরে জমি অনেক পাল্টে গিয়েছে। জায়গাটিতে এখন সবুজের সমারোহ। অনেকেই বেড়াতে যান। ছোট ট্রেকিং করে টিলায় পৌঁছানো যায়। রয়েছে একটি শিবমন্দির। যাঁরা শোলে সিনামেটি দেখেছেন তাঁরা এখানে আসলে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়বেন। অল্পবয়স্করা সিনেমাটি দেখে এখানে বেড়াতে এলে মজা পাবেন।
ফটোঃ লেখক