সেপ্টেম্ব মাসের মাঝামাঝি সময়। বর্ষার রেশ আবহাওয়ায়। এরকম সময়ে একদিন হাওড়ার শালিমার স্টেশন থেকে সকালের ধৌলী এক্সপ্রেসে চড়ে বিকেলে ভুবনেশ্বরে। তারপর সন্ধ্যা ৭-৩৫’এ ভুবনেশ্বর স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে হীরাকুদ এক্সপ্রেসে কোরাপুট অভিমুখে যাত্রা। পরের দিন সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ দক্ষিণ ওড়িশার কোরাপুটে পৌঁছানো গেল। বৃষ্টিধৌত কোরাপুট। সবুজে সবুজ। চোখ জুড়িয়ে গেল। কোরাপুট স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দুরের হোটেল রাজ রিজেন্সি থেকে পাঠানো গাড়ির চালকের আহ্বানে হোটেল অভিমুখে যাত্রা করা গেল।
দক্ষিণ ওড়িশার ‘ট্রাইবাল বেল্ট’ নামে চিহ্নিত অঞ্চলের একাংশ এই কোরাপুট ওড়িশার একটি জেলা। জেলার প্রধান শহরের নামও কোরাপুট। কোরাপুট শহরের উচ্চতা ২,৮০০-৩,০০০ ফুট। আদিবাসী-অধ্যুষিত কোরাপুটে নল রাজাদের শাসন ছিল প্রাচীন সময়ে। তেরশ শতকের বেশ খানিকটা সময়য় ধরে কাশ্মীর থেকে আসা সূর্যবংশীয় রাজাদের শাসন চলেছে এখানে। ব্রিটিশদের নজরে এসেছিল জায়গাটা। উন্নয়নের কাজকর্ম শুরু করেছিল তারা। ১৮৭০ সাল নাগাদ ব্রিটিশরা কোরাপুটকে স্বাস্থ্যকর জায়গার স্বীকৃতি দেয়।
গোঁড, ভূমিয়া, ভাত্রা, খন্ড আদিবাসীদের আপন ভূমি কোরাপুট। ভূমিজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক এই আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির প্রাত্যহিক জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, অনুষ্ঠান সম্পর্কে বেশ একটা ধারণা পাওয়া যাবে কোরাপুটে বেড়াতে এলে।

বর্ষার কোরাপুট অপরূপ, এ কথা শোনা ছিল। সেটা দেখার আশাতেই এই সময়ে কোরাপুটে আসা। প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গেল সবুজ কোরাপুটকে। হোটেলে চেক-ইনের পরে স্নানাদি ও সকালের জলযোগ সেরে দেওমালি ভিউ পয়েন্টের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। দেওমালি ওড়িশার সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ (৫৭৮০ ফুট)। কোরাপুট শহর থেকে দেওমালি ৬০ কিলোমিটার। পূর্বঘাট পর্বতমালার অংশ দেওমালি। যাওয়ার রাস্তাটি চমৎকার। শেষ ১০ কিলোমিটার তো আসাধারণ। একেবারে প্রকৃতির অভ্যন্তরে পৌঁছে যাওয়ার পথ।
ভিউ পয়েন্টে যখন পৌঁছালাম, তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে। তাপমাত্রা ১৬-১৭ ডিগ্রি। হাওয়ার জন্য আরও ঠান্ডা লাগছিল। পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে উড়ে যাচ্ছল মেঘের দল। চমৎকার সেই দৃশ্য।
দেওমালি ভিউ পয়েন্ট থেকে রানি দুদুমা জলপ্রপাতের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। এবার যাত্রা সে পথে। সেই পথের পাশের এক শান্ত রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ হল। প্রপাত-সংলগ্ন এলাকায় গাড়ি থামল। সেখান থেকে ৬০০ মিটার মতো হাঁটাপথ। বাঁধানো রাস্তা। কোথাও কোথাও সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া। তিন-ধারার দুদুমা জলপ্রপাতের এখন এই শেষ বর্ষায় রানির মতোই মেজাজ। তবে এই জলপ্রপাতটি প্রায় সারা বছরই বেগবতী থাকে বলে জানা গেল।

কোরাপুট ফিরে সন্ধ্যায় গেলাম জগন্নাথ মন্দিরে। কোরাপুট শহরের বিশেষ আকর্ষণ এই মন্দির চত্বরটি। নীলাশৈল নামের একটি টিলার ওপর মন্দির চত্বর। শ’খানেক সিঁড়ি বেয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছাতে হয়। এখানেও সাড়ম্বরে রথযাত্রা আয়োজিত হয়ে থাকে। মন্দির স্থাপিত হয়েছে উনবিংশ শতকে। পরে আরও নানা দেবদেবীর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে মন্দিরের চৌহুদ্দির মধ্যে। জায়গাটি মনোরম। কোরাপুটের জগন্নাথ মন্দির ‘সবারা শ্রীক্ষেত্র’ নামে পরিচিত।
সবারা নামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে দক্ষিণ ওড়িশা ও সমুদ্র তীরবর্তী উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশে। সবারা শ্রীক্ষেত্রর সঙ্গে ওতপ্রতো যুক্ত রয়েছে আদিবাসী আচার ও সংস্কৃতি। জাতি, বর্ণের কোনও ভেদাভেদ নেই এখানে। সন্ধ্যারতি দেখলাম জগন্নাথ মন্দিরে। মূল জগন্নাথ মন্দিরের পাশেই একটি আদিবাসী সংস্কৃতি-বিষয়ক সংগ্রহশালা রয়েছে। সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ হয়ে যায়। এদিন সংগ্রহশালাটি ঘুরে দেখা হল না।

আজ ১৭ সেপ্টেম্বর। ব্রেকফাস্ট সেরে বেড়িয়ে পড়লাম। স্বর্গদ্বার গুহা দেখতে যাব। কোরাপুট থেকে ৭৫ কিলোমিটার। রাস্তা ভালো। গুহার প্রায় ২ কিলোমিটার আগে গাড়ি থেকে নেমে পড়তে হল। গুহার মুখ পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে। বাঁধানো রাস্তা, হাঁটতে অসুবিধা হয় না। গুহার ভিতরটা অন্ধকার, পিচ্ছিল পথ। ভিতরে ঢোকার ঝুঁকি নেওয়া গেল না। গুহার মুখ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সেখানে দেবদেবীর কিছু ছবি রয়েছে। এক পুরোহিতও উপবিষ্ট রয়েছেন দেখলাম।

স্বর্গদ্বার কেভের কাছেই গুপ্তেশ্বর শিবের মন্দির। ছত্তিশগড়, তেলেঙ্গনা, অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে ভক্তরা আসেন এই মন্দিরে। মন্দির দেখে চলে এলাম বর্ষায় টইটম্বুর কোলবা নদীর তীরে। আঞ্চলিকরা বলেন সাবেরি নদী। বিপুল সবুজের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে নদী।

ফিরতি পথে লাঞ্চ সারার পরে ফের একবার দুদুমা জলপ্রপাতের দর্শন পাওয়া গেল, সেইসঙ্গে কোলাব ড্যাম, কফির বাগিচা দেখে কোরাপুট ফিরে চলে এলাম জগন্নাথ মন্দির-সংলগ্ন মিউজিয়ামটিতে। আঞ্চলিক বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নানা সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে এখানে। বিবৃত হয়েছে তাঁদের ইতিহাস, সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক। সুন্দর একটি লাইব্রেরি রয়েছে মিউজিয়ামে। আদিবাসি-বিষয়ক মূল্যবান সব বই, দলিলপত্র রয়েছে এই গ্রন্থাগারে। ভালো লাগলো মন্দিরের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা।
ফটো (উপর থেকে যথাক্রমে)-
১। ট্রাইবাল মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বার, ২। দেওমালি ভিউ পয়েন্ট, ৪। রানি দুদুমা জলপ্রপাত, ৫। কোরাপুটের জগন্নাথ মন্দির, ৬। স্বর্গদ্বার গুহা, ৭। কোলবা (সাবেরি) নদী।
ফটো তুলেছেন লেখক ও পাপিয়া ঘোষ।






