Follow us
English

লাওস থেকে সড়কপথে ভিয়েতনাম

লাওস থেকে সড়কপথে ভিয়েতনাম

২০১৯-এ থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম, কাম্বোডিয়ার বিশেষ বিশেষ পর্যটন কেন্দ্রগুলি বেড়িয়েছি খুবই আনন্দের সঙ্গে। প্রথম দফায় থাইল্যান্ড ও লাওস ভ্রমণের কথা জানিয়েছি ‘থাইল্যান্ড ও লাওস সফর’ শীর্ষক লেখাটিতে। এবার ভিয়েতনাম বেড়ানোর কথা।

২০১৯-এর ৩০ জানুয়ারি। লাওসের লুয়াং প্রবাং থেকে সড়কপথে চলেছি ভিয়েতনাম। ২৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। রওনা হয়েছি সকাল সাড়ে ৮টায়। পথে লাওসের একটি গ্রামে খানিকের যাত্রাবিরতি। সেই অবসরে গ্রামটা একটু ঘুরে দেখা গেল। ইন্দো-চীন যুদ্ধের সময়ে এখানেও প্রচুর বোমাবর্ষণ হয়েছিল। বোমের প্রচুর খোল রাখা আছে গ্রামে।

লাওসের গ্রামে সাজিয়ে রাখা বোমের খোল। ছবি: লেখক

এখানকার লোকেরা দেখলাম খুবই ফর্সা। বেশ মিশুকেও। প্রচুর বাচ্চা ছেলেমেয়ে চোখে পড়ল।

আবার চলা। সীমান্ত শহর নং হেট পৌঁছানো গেল। লাওসের উত্তর-পূর্বে জমজমাট শহর নং হেট। লাওসের বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র ফনসাভান থেকে নং হেট ১১৯ কিলোমিটার। নং হেট থেকে ভিয়েতনাম সীমান্ত ১৩ কিলোমিটার।

ভিয়েতনাম সীমান্তে কাগজপত্র তৈরি হল। সময় লাগল খানিকটা। ভিয়েতনাম সীমান্ত থেকে বাস ছাড়ল বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ। ঘন্টা তিনেক পরে হোটেলে পৌঁছালাম। সুন্দর হোটেল। জমিয়ে ডিনার হল।

পু-মত ন্যাশনাল পার্ক, জিয়াং নদীতে ভ্রমণ

পরের দিন, অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি সকাল ৯টা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য পু-মত ন্যাশনাল পার্ক। উত্তর-মধ্য ভিয়েতনামের নেই অ্যান প্রভিন্সের টুওং ডুওং, কন কুওং, আন সন ( যতটা সম্ভব ইংরেজি বানান অনুসারে বাংলা বানান লেখার চেষ্টা করেছি, ভিয়েতনামিজ উচ্চারণ ভিন্নতর) ডিস্ট্রিক্টের ৯৪,৮০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে এই জাতীয় উদ্যান। পার্ক-সংলগ্ন মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখলাম। ভিয়েতনামেও নানা উপজাতি গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের চাষের উপকরণ, অস্ত্রশস্ত্র, রান্নার সরঞ্জাম, হস্তশিল্প সামগ্রী দেখলাম। জঙ্গলের খানিকটা অংশ দেখা গেল। জানা গেল এই অরণ্যে ৩৯ প্রজাতির বাদুড়ের দেখা মেলে। প্রায় ১৩২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে অরণ্যে। দেখলাম খে-কেম জলপ্রপাত। জঙ্গল পরিবেষ্টিত দারুণ সুন্দর জলপ্রপাত। শান্ত পরিবেশ। টুরিস্ট বলতে শুধু আমরাই ছিলাম। যাওয়ার পথটিও খুব সুন্দর।

ছবি সৌজন্য : lotussia.com

এরপর জিয়াং নদীতে স্পিড বোটে চড়ে ভ্রমণ। তার আগে একটা গ্রামে আমাদের লাঞ্চের আয়োজন করা হয়েছিল। আঞ্চলিক নদীর মাছ ভাজা, চিংড়ি ভাজা, ফ্রায়েড চিকেন এবং বাঁশের স্যুপ দিয়ে গ্রামীণ পরিবেশের মধ্যে বসে চমৎকার মধ্যাহ্নভোজন হল। এরপর নৌকা বিহার। নদীর দুই পাশে গভীর জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে রয়েছে গ্রাম। তাঁদের প্রধাণ যান নৌকা। প্রধাণ পথ নদী। হোটেলে পৌঁছালাম সন্ধ্যায়। আগামীকাল হ্যানয় যাত্রা।

হ্যানয়ে

রওনা হওয়া গেল সকাল ৮টা নাগাদ। দীর্ঘ ৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হ্যানয় পৌঁছাতে হবে। আজকের পথ শহরাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে। পথে সাবুর পাঁপড় ও বিয়ার খাওয়া হল। দাম পড়ল ৩৬,০০০ ডং। এক ডলারে ২৩ থেকে ২৪,০০০ ডং পাওয়া যায়। হ্যানয় পৌঁছালাম। ভিয়েতনামের রাজধানী শহর। বেশ রোমাঞ্চিত লাগছিল। ছোটবেলায় যুদ্ধের সময় রেডিও হ্যানয়, রেডিও সায়গন শুনতাম। এই সেই হ্যানয়। কত বিধ্বংসী যুদ্ধের সাক্ষী এই হ্যানয়। ফ্রান্স, চিন, আমেরিকা ও কাম্বোডিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছে ভিয়েতনামের। তাতে ভিয়েতনামের কোমর ভেঙ্গে দেওয়া যায়নি। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসেছে নতুন ভিয়েতনাম। একটা লড়াকু জাতি তৈরি হয়েছে।

শহরের মধ্যে পায়ে হেঁটে বেড়ালাম খানিকক্ষণ। ঘিঞ্জি শহর। শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রচুর দোকানপাট। বিশৃঙ্খলা চোখে পড়েনি। নানারকম কফি পাওয়া যায় হ্যানয় শহরে। এগ কফি খেলাম। ডিমের কুসুম, কনডেন্সড মিল্ক, চিনি সহযোগে তৈরি করা হয় এই কফি। দাম নিল ২৫,০০০ ডং। একটা ওয়াটার পাপেট শো দেখা হল। বেশ উপভোগ্য অনুষ্ঠান।

রাতে এক ভারতীয় রেস্তোরাঁয় ডিনার হল। রেস্তোরাঁয় এক বাঙ্গালী ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল। দেশের বাড়ি দীঘায়। ব্যাবসা সূত্রে ভিয়েতনামে সেটল করেছেন। বাড়িও তৈরি করেছেন এখানে। আমাদের হোটেলের নাম স্প্রিং ফ্লাওরার। হোটেলটির চারিদিকে ফুটপাথে প্রচুর খাবারের দোকান। খাচ্ছেও প্রচুর লোক। খানিকটা হাঁটাহাটি করে হোটেলে ফিরে এলাম।

হা-লং-বে

আজ ২ ফেব্রুয়ারি। আজ আমাদের গন্তব্য হা-লং-বে। সকাল সাড়ে ৭টায় যাত্রা শুরু হয়েছিল। পথে একটা শোরুমে স্মারক হিসেবে টুকিটাকি কিছু কেনাকাটা করা গেল। বাঁশ থেকে সুতো বের করে সেই সুতো দিয়ে পোশাক-সহ হরেক জিনিস তৈরি করা হয়েছে দেখলাম। এরপর যাওয়া হল একটি পার্ল ফার্মে। নানা রংয়ের মুক্তোর চাষ হয় এখানে। মুক্ত উৎপাদনের প্রক্রিয়াগুলো দেখানো হল এখানে।

পৌঁছালাম হা-লং-বে। ভিয়েতনামের উত্তরপূর্বাংশে হা-লং উপসাগরের মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো চুনাপাথরের দ্বীপ। নীল জলরাশির মধ্যে দ্বীপগুলো মুক্তোর মতো টলটল করে। কোনও কোনও দ্বীপে রয়েছে অরণ্য। চিন সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে হা-লং-বে’র। জলভ্রমণ, কায়াকিং, স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য সারা পৃথিবী থেকে পর্যটক আসেন হা-লং-বে অঞ্চলে। ক্রুইজের প্রোগ্রাম ছিল আমাদের। সঙ্গে লাঞ্চ। পুরো জাহাজটাতে ভ্রমণার্থী বলতে শুধু আমরাই। ওপরের ডেকে ইজি চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে সমুদ্রের নানা দৃশ্য চাক্ষুষ করা এক অসাধারণ অনুভূতি। পার্বত্য দ্বীপগুলিকে খুব সুন্দর লাগছিল। রকের আকার অনুযায়ী দ্বীপগুলির নানা নাম। যেমন, টার্টল রক, ফিশারম্যানস হেড, কক ফাইটিং রক, স্টোন ডগ ইত্যাদি।

জাহাজ থেকে একটা দ্বীপে নেমে আমরা একটা বিশাল গুহার মধ্যে ঢুকলাম। চুনাপাথরের গুহা। স্ট্যালাকটাইট, স্ট্যালাগমাইটের প্রক্রিয়ায় নানা অবাক করা মূর্তি তৈরি হয়েছে গুহার মধ্যে। আলোয় ঝলমল করছে গুহার মধ্যেটা। এরকম প্রাকৃতিক গুহা এখানে অনেক আছে। গুহা দর্শন সেরে জাহাজে ফিরে এলাম। মধ্যাহ্নভোজনের এলাহি ব্যবস্থা হয়েছিল জাহাজে। এই টুরটা খুব এনজয় করেছিলাম।

হো চি মিন কমপ্লেক্স

আজ ৩ ফেব্রুয়ারি। ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম। আজ হো চি মিন কমপ্লেক্স দেখতে যাব। খুবই আগ্রহ ছিল জায়গাটায় যাওয়ার জন্য। তিন দশক ধরে ভিয়েতনামের জাতীয় আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হো চি মিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এশিয়ায় ঔপনিবেশিকতাবাদ বিরোধী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তিনি। ১৯৪৫ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত গণপ্রজাতান্ত্রিক চিনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন হো চি মিন। তাঁর স্মৃতিচিহ্নগুলো দেখার খুব আগ্রহ ছিল। সকাল সকাল তৈরি হয়েছি। হাতে খানিকটা সময় ছিল। হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেলের নীচে বাজার বসেছে। কত রকমের যে মাছ আর সবজি। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। আমাদের দেশের মতোই। সাইকেলের বহুল ব্যবহার এদেশে। বিক্রেতারা তাঁদের পসরা এনেছেন সাইকেলে। ক্রেতারাও সাইকেলে বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।

গাড়ি ছাড়ল সাড়ে ৯টায়। তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেলাম হো চি মিন কমপ্লেক্সে। ভিয়েতনামের মানুষের কাছে বড় আপন হো চি মিন। তিনি সকলের প্রিয় ‘আঙ্কেল হো’। শান্ত পরিবেশ। আঙ্কেল হো-র সংরক্ষিত দেহ দেখলাম। মনে পড়ছিল ছোটবেলার কথা। তখন লোকের মুখে মুখে ফিরত ‘তোমার নাম আমার নাম, ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম’। বিশাল এলাকা জুড়ে কমপ্লেক্স। হো চি মিন যে ঘরগুলিতে থাকতেন, যেখানে হাঁটতেন, যেখানে ব্যায়াম করতেন, সব ঘুরে ঘুরে দেখলাম।

এরপর লাক্ষা দিয়ে নানা হস্তশিল্প সামগ্রী তৈরির একটি কেন্দ্র দেখে আমরা ভিয়েতনামিজ উইমেন’স মিউজিয়ামে এলাম। মহিলারা ঘর-সংসার সামলেও কীভাবে আমেরিকা-বিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, ভিয়েতনামের উন্নয়নে ভিয়েতনামের মহিলাদের ভূমিকা সম্পর্ক অবহিত হওয়া যায় এখানে। খুব ভালো লাগলো মিউজিয়ামটি।

বিকেলে চলে এলাম বিমানবন্দরে। পরবর্তী গন্তব্য হো চি মিন সিটি। আগে এই শহরের নাম ছিল সায়গন। বিমান ছাড়ল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। হো চি মিন সিটি পৌঁছালাম রাত সাড়ে ৮টায়। একটি রেস্তোরাঁয় ডিনার সেরে সোজা হোটেলে।

কাল আমাদের ভ্রমণের নবম দিন। কাল যাব মেকং ডেল্টা টুরে। সে-কথা পরের পর্বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *