Follow us
English

ধোত্রে থেকে টংলু, টুমলিং, মেঘমা হয়ে চিত্রে ট্রেক

ধোত্রে থেকে টংলু, টুমলিং, মেঘমা হয়ে চিত্রে ট্রেক

ধোত্রে। হিমালয়ের কোলে একটি ছোট্ট গ্রাম। অবস্থান দার্জিলিং জেলায়, সিঙ্গালীলা ন্যাশনাল পার্কের প্রান্তে। উচ্চতা ৮,৫০০ ফুট। এই ধোত্রে থেকে টংলু, টুমলিং, মেঘমা, চিত্রে হয়ে মানেভঞ্জন পর্যন্ত একটা ছোট ট্রেক করা যেতে পারে। পাহাড়, জঙ্গলের নিরালা পথ ধরে ট্রেকিং। গ্রীষ্মের মরশুমে জুন মাস পর্যন্ত এ পথে ট্রেক করা যায়।

এই করোনাকালে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে হলে দশ বার ভাবতে হচ্ছে নিরাপত্তার কথা ভেবে। সেদিক থেকে পাহাড়ের অন্দর নিরাপদ তো বটেই। সেইসঙ্গে নির্ভেজাল প্রকৃতির সাহচর্যে আর ট্রেকিংয়ের মধ্যে দিয়ে মন ও শরীর দুই-ই চাঙ্গা হয়। বুকে অক্সিজেন ভরে ফিরে আসা যায়। মধ্যমমানের ট্রেকিং। সর্বোচ্চ পয়েন্ট টংলু। উচ্চতা ১০,১৩০ ফুট। সামগ্রিক ট্রেকিং সম্পূর্ণ করতে দিন পাঁচেক সময় লাগবে।

যাওয়ার পথ

ট্রেকিং শুরু হবে ধোত্রে থেকে। দলে সদস্য সংখ্যা কয়েকজন হলে এন জে পি বা শিলিগুড়ি থেকে মানেভঞ্জন হয়ে ধোত্রে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। দলে সদস্য সংখ্যা কয়েকজন হলে গাড়ি রিজার্ভ করে ধোত্রে চলে আসা যায়। সাড়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগবে। গোটা গাড়ির জন্য ভাড়া লাগবে ৪০০০-৪৫০০ টাকা। শিলিগুড়ির দার্জিলিং মোড় থেকে বেলা ১১ থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ধোত্রে যাওয়ার শেয়ার গাড়ি ছাড়ে। দার্জিলিং শহর, দার্জিলিংয়ের ঘুম থেকেও গাড়ি পাবেন। দার্জিলিং মোড় থেকে সুকিয়াপোখরি যাওয়ারও শেয়ার গাড়ি পাবেন। সুকিয়াপোখরি থেকেও ধোত্রে যাওয়ার গাড়ি পাবেন।

ধোত্রে

ধোত্রে পৌঁছে কোনও হোমস্টে বা লজে ঢুকে পড়ুন। বিশ্রাম নিন। তারপর একটু হাঁটাহাঁটির জন্য বেরিয়ে পড়ুন। অবশ্য প্রথম কাজটি হবে ট্রেকিংয়ের জন্য একজন গাইড ঠিক করে ফেলা। ধোত্রেতে রয়েছে সিঙ্গালীলা ফরেস্ট প্রোটেকশন গাইডস অ্যান্ড পোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের অফিস। এই অফিস থেকেই গাইড পাবেন। মাল বহনের জন্য পোর্টারের প্রয়োজন না হলেও রাস্তা চেনানোর জন্য গাইডের দরকার হবে।

ভোরে উঠে পড়ুন। তখন ধোত্রের অন্য রুপ। অল্প কিছু লোকের বাস। ছোট ছোট কয়েকটা দোকান। নুডুলসের পাত্র উথলে উঠছে। মোরগের ডাক। একটু উপরে উঠে চলে আসুন তিব্বতীয় মনাস্ট্রি চত্বরে। ততক্ষণে রাঙিয়ে উঠেছে পুবের আকাশ। কাঞ্চনজঙ্ঘায়, পাণ্ডিম, কুম্ভকর্ণ, উত্তর ও দক্ষিণ কাব্রুর শৃঙ্গগুলিতে রঙের ছোপ। ধূপি বনে নরম রোদ্দুরের আঁকিবুকি। এক অদ্ভুদ ভালোলাগায় মন ভরে ওঠে।

টংলুর পথে

ব্রেকফাস্ট সেরে ফেলুন তাড়াতাড়ি। গাইড হাজির ততক্ষণে। যাত্রা শুরু। সিঙ্গালীলা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ। রডোডেনড্রনের ঝাড়ে মে মাসেও ফুলের বাহার দেখা যায়। পাইন, ফার, বার্চ, বাঁশের ঘন জঙ্গল ডানে-বাঁয়ে। সাক্ষাৎ হয়ে যেতে পারে ব্ল্যাক ঈগল, স্কারলেট ফিঞ্চ, দার্জিলিং উডপেকার, রেড-হেডেড বুলফিঞ্চের মতো পক্ষীকুলের সঙ্গে। সিঙ্গালীলার জঙ্গল রেড পাণ্ডার আবাস। থাকে গাছের মগডালে, কখনোসখনো দেখা মেলে। দেখবেন হিমালয়ের প্রাচীণ সব বৃক্ষ। মসে মোড়া গাছের গুড়ি। বড় গাছের গায়ে ঝুলে থাকা অর্কিডের দেখা পাওয়া যায়। পথ খানিকটা চড়াই। ৮,৫০০ ফুটের ধোত্রে থেকে ক্রমশ উঠে আসতে হবে ১০,১৩০ ফুটের টংলুতে। পথের দৈর্ঘ্য ৬ কিলোমিটার। চড়াই পথে উঠতে মাঝে মাঝে হাঁপ ধরতে পারে। থেমে থেমে ওঠাই ভালো। চলার পথে ভিউ পয়েন্ট পাবেন। সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও তার পারিষদবর্গের চমৎকার দৃশ্যের সাক্ষী থাকবেন।
চলতে চলতেই দূরে অনেকটা উঁচুতে দেখা দেবে টংলু।

টংলু

সিঙ্গালীলা গিরিশিরার একটি শৃঙ্গ টংলু। মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু যাওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। সান্দাকফুর যাত্রীদের অনেকেই এখানে রাত্রিবাস করেন। টংলুর পাহাড় থেকে বাঁ-দিক থেকে ডাইনে দেখবেন নেপাল, সিকিম ও ভুটান পাহাড়ের নানা পর্বতশৃঙ্গ। এভারেস্ট, মাকালু, কাঞ্চনজঙ্ঘা, কুম্ভকর্ণ, কোকথাং মাকালু, পাণ্ডিম প্রভৃতি। যে-দিন পৌছাচ্ছেন, সে দিন বিকেলে শৃঙ্গগুলোর ওপর দেখবেন অস্তগামী সূর্যের বর্ণচ্ছটা। বাকিটা তোলা থাকবে পরের দিনের সকালের জন্য। শীতের রাতে টংলুর আবাস থেকে বাইরে বেরনোর কথা ভাবা যায় না। গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় বসুন খোলা আকাশের নীচে। হাতে থাকতে পারে চায়ের কাপ, সঙ্গে গিটার জাতীয় বাদ্যযন্ত্র, গলায় থাকতে পারে গান। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে চোখ থাকুক আকাশে। দেখবেন, লক্ষ তারা-নক্ষত্র আপনাকে দেখছে। ঝলকানি নয়। শান্ত সুন্দর এই পৃথিবী। আসলে।

টুমলিং

পূর্ব নেপালের ইলম জেলার একটি ছোট্ট শান্ত গ্রাম টুমলিং। অবস্থান টংলু থেকে ২ কিলোমিটার পূর্বে। উচ্চতা ৯,৬০০ ফুট। দার্জিলিং সীমান্ত লাগোয়া নেপালের টুমলিংয়ে ভারতীয়দের প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনও বিধিনিষেধ নেই। গুরুং গোষ্ঠীর অল্প কিছু মানুষের বসবাস টুমলিংয়ে। বাঁধানো রাস্তা ধরে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘন্টার মধ্যে টুমলিংয়ে পৌঁছে যাওয়া যায়। উৎরাই পথ। কষ্ট কম। শীতে বরফ পড়ে টুমলিংয়ে। একটি ভিউ পয়েন্ট আছে টুমলিংয়ের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায়। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য অতি চমৎকার। দূরে দেখবেন সান্দাকফুর শীর্ষ। সিঙ্গালীলা ন্যাশনাল পার্ক টুমলিং থেকে মাত্র এক কিলোমিটার। একটি ছোট মনাস্ট্রি আছে টুমলিংয়ে। মনাস্ট্রি চত্বর থেকে চারপাশের দৃশ্য অতি সুন্দর। রাতে টুমলিংয়ের পাহাড় থেকে দার্জিলিং, কার্শিয়াংয়ের আলোকপুঞ্জ দেখা যায়। সান্দাকফু ট্রেক করতে চাইলে টুমলিং আসতেই হবে। টুমলিং থেকে সান্দাকফু ১৯ কিলোমিটার। শীতে টুমলিং প্রচুর তুষারপাত হয়।

মেঘমা

টুমলিং থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে ভারত-নেপাল সীমান্ত-ঘেষা মেঘমা ভৌগলিক দিক থেকে দার্জিলিং জেলার অন্তর্ভুক্ত। টুমলিং থেকে মেঘমা আসতে হবে নেপালের মধ্যে দিয়েই। ভিসা ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না। মেঘ থেকে মেঘমা। যখন তখন মেঘ ঘনায় মেঘমায়। উচ্চতা ৯৫১৪ ফুট। আবার টুমলিং না গিয়ে টংলু থেকে সরাসরি মেঘমা চলে আসা যায়। সরাসরি টংলু-মেঘমা পথের দৈর্ঘ্য ২ কিলোমিটার। এ পথ অনুসরণ করলে নেপালে ঢোকার দরকার হবে না।


মেঘমায় একটি সুন্দর মনাস্ট্রি আছে। এই মনাস্ট্রিতে বুদ্ধের ১০৮টি প্রতিকৃতি আছে। মেঘমার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি রেস্তোরাঁ। চা-কফি, স্ন্যাক্স ও দুপুর, রাতের খাবারও পাওয়া যাবে। চলার পথে চিত্রে মনাস্ট্রি দেখে নেবেন

মেঘমা থেকে চিত্রে হয়ে মানেভঞ্জন

মেঘমা থেকে লামিয়াধুরা হয়ে চিত্রে চলে আসবেন। দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। উচ্চতা ৮৩৪০ ফুট। যদি ধরে নেওয়া যায়, টুমলিং থেকে চিত্রে সরাসরি আসবেন তবে একদিনে ট্রেক করতে হবে ১০ কিলোমিটার। টুমলিং থেকে মেঘমা ৪ কিলোমিটার এবং মেঘমা থেকে চিত্রে ৬ কিলোমিটার। বিকল্প হতে পারে, একটা রাত মেঘমাতে কাটানো। সেক্ষেত্রে সরাসরি টংলু থেকে মেঘমা চলে আসতে পারেন। শর্টকাট পথে এলে ২ কিলোমিটার। টুমলিং হয়ে এলে ৬ কিলোমিটার। অর্থাৎ টুমলিংয়ে রাতে থাকছেন না। মেঘমাতে এসে রাত্রিবাস করছেন। আবার সময় হাতে থাকলে টুমলিং, মেঘমা দু’জায়গাতেই থাকতে পারেন।

চিত্রে থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জের অপূর্ব ভিউ পাবেন। চলার পথে চিত্রে মনাস্ট্রি দেখে নেবেন। চিত্রে গ্রামটিও খুব সুন্দর। চিত্রে থেকেই সান্দাকফুর ট্রেকিং শুরু হয়। মানেভঞ্জন থেকে ৮৩৪০ ফুট উচ্চতার চিত্রে আসতে হয় কঠিন চড়াই পথে। চিত্রে থেকে মানেভঞ্জন নেমে আসার ক্ষেত্রে সে কষ্ট নেই। নামার সময় উৎরাই পথ।
চিত্রে থেকে মানেভঞ্জন ৩ কিলোমিটার পথ। পথটা খুব সুন্দর। পথের দু’পাশ সবুজে সবুজ। রাস্তার ধারে ধারে বার্চ, ফার, পাইনের বন।
মেঘমা থেকে চিত্রে হয়ে মানেভঞ্জন পর্যন্ত ট্রেক করতে হবে মোট ৯ কিলোমিটার পথ। চাইলে একটা রাত চিত্রেতে থেকে যেতে পারেন। পা দুটো বিশ্রাম পাবে। আর চিত্রে থেকে সকালের কাঞ্চনজঙ্ঘা তো এক অপার্থিব পাওনা। পরের দিন ধীরেসুস্থে তিন কিলোমিটার ট্রেক করে মানেভঞ্জন নেমে আসুন।

রাত্রিবাসের ব্যবস্থা

ধোত্রেঃ পদ্মা লজ, ফোন-৮৭৬৮৮-৭৩১২১। ধোত্রে শেরপা লজ, ফোন-৯৭৩৩০-৪৮৫৭৯, ৯৭৩৩০-০৫১৯১। অর্কিড ডেল হোমস্টে, ফোন-৬২৮৯৭৬৮৩৩১। গোপাল হোমস্টে, ফোন-৯৪৩৪৩-০৯৬০৬, ৯০৬৪১-৬৪৪৯৩।

টংলুঃ টংলু ট্রেকার্স হাট, ফোন-৯৬৩৫২-৩১২৪৮। রাজু হোমস্টে, ফোন-৯৮৮৩৯-৪৬৮৮০।

টুমলিংঃ শিখর লজ, ফোন-৯১৪৮৮-২৪২২৭। সিদ্ধার্থ লজ, ফোন-৭০৪৪৭-৮৫৫১২/১৩/১৪। টুমলিং ব্যাকপ্যাকার্স ক্যাম্প, ফোন-৮৪৪৭৭-৪৫৯৬৪।

মেঘমাঃ মেঘমা গেস্টহাউস (ফোন নম্বর সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি)।

চিত্রেঃ হকস নেস্ট হোমস্টে, ফোনঃ ৯৭৩৩০-৮১১৮৪, ৭৩১৯৫-৯১৮৩৬।

* প্রসঙ্গত, রাত্রিবাস তথা থাকার আশ্রয়ের ব্যাপারে সঙ্গী গাইডও সহায়তা করবেন।

* ধোত্রের ফরেস্ট প্রোটেকশন গাইডস অ্যান্ড পোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের অফিসে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন। গাইডের ব্যবস্থা এখান থেকেই হবে। প্রয়োজনীয় পরামর্শও পাবেন এখান থেকে।

* তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন এই ঠিকানাতেওঃ গোর্খা ভবন, সল্টলেক সিটি সেন্টারের বিপরীতে, ব্লক-ডি ডি-২৮, সেক্টর-ওয়ান, সল্টলেক, কলকাতা-৬৪। ফোন- (০৩৩) ২৩৩৭-৭৫৩৪, ৯৯০৩১৭৪০৪৭।

* প্রয়োজনে মানেভঞ্জনের হাইল্যান্ডার গাইডস অ্যান্ড পোর্টারস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন এই নম্বরগুলিতেঃ৯৭৩৪০-৫৬৯৪৪, ৯৯৩৩৩-৬৯৪৪৯, ৯৪৭৬১-৫১৫২৩।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *