Follow us
English

জাদু-বাস্তবতার সুন্দরবন

জাদু-বাস্তবতার সুন্দরবন

সে এক আশ্চর্য জগৎ। হঠাৎ উড়ে যায় শঙ্খচিল। নদীর চরায় কাদা মেখে রোদ পোহায় কুমির। চরায় ধানি ঘাস খেতে আসে হরিণেরা। নজর রাখে বাঘ। দূরের নদী চিকচিক করে আলোয়। কখনো কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয় জল-জঙ্গল। তখন চারপাশটার অন্য রূপ। অনেকটা গোধূলি রঙের। বিকেলে নদী রাঙিয়ে সূর্য যায় পাটে। পূর্ণিমায় নদী ছলছল। বনের মাথায় মাথায় জ্যোৎস্নাচূর্ণ। চরাচর জুড়ে কী এক রহস্য। রাতচরা কোনও পাখির ডাকে সম্বিৎ ফিরবে হয়তো।

মোটর বোট বা লঞ্চ চলেছে। বদলে বদলে যাচ্ছে নদীপথ। তীরে কেওড়া, কাঁকড়া, গেওয়া, হেতাল, গোলপাতা, সুন্দরীর ঠাসবুনোট জঙ্গল। নদী, খাঁড়িপথ ধরে ঢুকে পড়ছেন পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ ও ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অভ্যন্তরে।

অপরূপ সুন্দরবন ভয়ঙ্কর সব সামুদ্রিক তুফানের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানো এক আশীর্বাদী অরণ্যভূমি। অবাক করার মতো তার উদ্ভিদকুল, জীববৈচিত্র। সেখানে জলে যেমন মাছ, তেমনই কুমির-কামট। গাছের বীজের দল জলে ভেসে গিয়ে নতুন বন সৃষ্টি করে। নোনা জলে গাছের মূলগুলো আকাশের দিকে মুখ তুলে থাকে। লড়াইয়ের জন্য অভিযোজন। জীবন কঠোর।

কলকাতাকে যদি যাত্রা শুরুর পয়েন্ট হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, তবে ঘন্টা পাঁচেকের মধ্যে ঢুকে পড়া যায় বনবিবি, দক্ষিণরায়ের বাদাবনে। নোনা জল, নোনা হাওয়া, সুমিষ্ট মধুর সুন্দরবনে। শীতের মরসুমে নদীগুলো শান্ত। সুন্দরবন ভ্রমণের আদর্শ সময় ।

বঙ্গপোসাগরে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপের ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের বিস্তৃতি। এরমধ্যে ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত সুন্দরবনের আয়তন ৪২৬৪ বর্গকিলোমিটার। বাকি অংশ বাংলাদেশের অন্তর্গত।

অসংখ্য নদী,খাল,খাঁড়ি দিয়ে ঘেরা ১০২ টি দ্বীপের সমষ্টি ভারতের সুন্দরবন। এর মধ্যে ৫৪টি দ্বীপে জনবসতি রয়েছে। বাকি ৪৮ টি দ্বীপ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। টাইগার রিজার্ভ, ন্যাশনাল পার্ক এবং ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনকে পুরোপুরি জানা হয়ে গেছে এ দাবি এখনো করা যাবে না।

জীবজন্তু

বাঘ তথা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের জন্য বিশেষ খ্যাত হলেও সুন্দরবনের জল-জঙ্গল বিভিন্ন ধরণের স্তন্যপায়ী জন্তু, সরীসৃপ ও পাখির আবাস। বাঘ ছাড়াও জঙ্গলে রয়েছে চিতল হরিণ, বাঁদর,বুনোশুয়োর, মেছো বিড়াল,বনবিড়াল,শিয়াল,বেঁজি,বনমুরগি, কিং কোবরা, ইন্ডিয়ান রক পাইথন। নদী খাঁড়িতে রয়েছে কুমির, গাঙ্গেয় ডলফিন। নদীর চরে ঘুরে বেড়ায় অসংখ্য লাল কাঁকড়া। কাঁকড়াও নানা প্রকার। রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ। আর আছে মাছ। নদী, খাঁড়ি, খালে অফুরন্ত মাছ।

প্রায় ২৫০ প্রজাতির পাখি আছে সুন্দরবনে। মাছরাঙাই আছে কত রকমের। ব্রাহ্মণী চিল, শঙ্খচিল,সামুদ্রিক ঈগল,গাল, সারস প্রজাতির পাখি, গোল্ডেন প্লোভার, নাইট হেরন, পিনটেল, মার্শ হ্যারিস প্রভৃতি পাখি চোখে পড়বে জলপথে চলতে চলতে, সকালবেলায় নদীর তীরে পদচারণার সময়।

গাছপালা

সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের জঙ্গল। সেইসব উদ্ভিদ, যারা নোনা জলে বেঁচে থাকতে পারে। বাঁচার তাগিদেই অভিযোজনের মাধ্যমে নোনা জলে টিকে থাকার, বংশবিস্তার করার ক্ষমতা অর্জন করে নিয়েছে তারা। জোয়ারের সময়ে নোনাজলে ভেসে যায় বনের বিস্তীর্ণ অংশ। অক্সিজেন গ্রহণের জন্য গাছের শ্বাসমূল জলের ওপর উঁচিয়ে থাকে তাই।

 

 

 

 

সুন্দরী, গোলপাতা, হেঁতাল,গেওয়া,গরান,কাঁকড়া,ধুধুল প্রভৃতি সুন্দরবনের প্রধান উদ্ভিদ। এক সুন্দরীরই বিভিন্ন রকমফের আছে। সুন্দরী গাছ থেকেই জঙ্গলের নামকরণ সুন্দরবন বলে একটি জোরালো অভিমত রয়েছে। গোলপাতা, হেঁতালের বন বাঘের গা ঢাকা দিয়ে থাকার আস্তানা। এপ্রিল-মে মাসে রংবাহারি রূপ ধরে সুন্দরবনের জঙ্গল। তখন গেওয়া ও কাঁকড়া গাছে লালফুল ফোটে। কাঁকড়া গাছের ফুল অনেকটা কাঁকড়ার আকৃতির।

ওই এপ্রিল-মে মাসেই ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় খলসী বন। গাছে গাছে গড়ে ওঠে মৌচাক। খলসী ফুলের মধু ভেষজ গুণে সমৃদ্ধ। এখনো পর্যন্ত সুন্দরবন অরণ্যে ৭৮ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ নথিভুক্ত করা গেছে। নাগালের মধ্যে পেয়ে গেলে নিয়ে নেবেন খলসীর ফুলপট্টি মধু।

 

বেড়ানোর কথা

সুন্দরবনের জলজঙ্গলে বেড়ানো আর পাঁচটা জায়গায় বেড়ানোর মতো নয়। সাধারণত, সুন্দরবন ভ্রমণের বেশিরভাগ সময়টাই কেটে যায় নদীপথে। লঞ্চ বা শক্তপোক্ত মোটর বোট প্রধান বাহন। মাতলা,বিদ্যাধরী,ঠাকুরণ,রায়মঙ্গল,হরিণভাঙা, কালিন্দী প্রভৃতি নদীর ওপর দিয়ে যাত্রা। দুপাশের লোকালয় ছাড়িয়ে একসময় জলযান ঢুকে পড়বে জঙ্গলের অন্দরমহলে। নদীপথ ও জঙ্গল মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যপট রচিত হবে। চলতে চলতেই চোখে পড়তে পারে গাঙ্গেয় ডলফিনের ডিগবাজি ,নদীর চরে রোদ পোহানো কুমির,জঙ্গলপ্রান্তে দৌড়ে চলা বুনো শুয়োর বা একপাল হরিণ, কিংবা গাছের মগডালে শিকারের জন্য ওঁৎ পেতে বসে থাকা শঙ্খচিল।

সুন্দরবন মানেই শুধু বাঘ নয়, আরও অনেককিছু । অতবড় জঙ্গল। সেখানে কিছু বাঘ। তার দেখা মেলা মোটেও সহজ কথা নয়। কখনো সখনো চকিত দর্শন মেলে বটে, তবে সে ঘটনা অহরহ ঘটে না।

সুন্দরবনের মৎস্যজীবী, মউলেরা ( যাঁরা জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করেন জীবন বাজি রেখে) বাঘকে নামধরে ডাকেন না, বলেন বড় মিঞা। এঁরা কিন্তু বাঘের দর্শন চান না। জঙ্গলে বাঘ মানে এঁদের কাছে সাক্ষাৎ যম। মাছ,কাঁকড়া ধরতে গিয়ে, মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতি বছরই বাঘের আক্রমণে প্রাণ দিতে হয় সুন্দরবনের কিছু মানুষকে। জীবন জীবিকার জন্য যাঁরা সুন্দরবনের জল-জঙ্গলের উপর নির্ভর করেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা, যে জঙ্গলে বাঘ উপস্থিত থাকবে, তার কাছ দিয়ে গেলে, মনে রাখবেন, আপনি তাঁকে দেখতে না পেলেও জঙ্গল থেকে মিয়াঁ কিন্তু আপনার ওপর লক্ষ্য রেখেছে।

দুর্দান্ত সব নদীর উপর দিয়ে ভেসে চলেছেন। জল-জঙ্গলের এক আশ্চর্য তালমিল দেখুন। কাঠিন্যের মধ্যে টইটম্বুর রসের সন্ধান পাওয়া যাবে। আপনি যখন বোটে তখন কোথাও না কোথাও বনবিবির পাঁচালি পড়া হচ্ছে। মঙ্গল-প্রার্থনায়। বনবিবি সুন্দরবনের বনদেবী। দক্ষিণ রায় বাঘের দেবতা। বন-সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে বনবিবি দক্ষিণ রায়ের থান রয়েছে। সজনেখালিতে বনবিবির মন্দির আছে।

সুন্দরবনের বিভিন্ন জঙ্গলে রয়েছে ওয়াচটাওয়ার। কোথাও কোথাও নজরমিনারের কাছাকাছি রয়েছে ছোট জলাশয়। জঙ্গলের জন্তুজানোয়ার ওখানে জল খেতে আসে। সে দৃশ্য ওয়াচটাওয়ার থেকে দেখা যায়। তবে সবসময়ই যে দেখা যাবে এমনটা নয়। চুপ করে অপেক্ষা করতে হয়। অনেকে ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়াচটাওয়ারে কাটিয়ে দেন বন্যপ্রাণী ক্যামেরাবন্দি করার জন্য। তবে ওয়াচটাওয়ার থেকে গা-ছমছমে আদিগন্ত সবুজ বনভূমি দর্শনও একটা বড়রকমের অভিজ্ঞতা। এখানে প্রধান কয়েকটি ওয়াচটাওয়ারের কথা জানানো হল-

সজনেখালি ওয়াচটাওয়ার

অনেক পুরনো ওয়াচটাওয়ার এটি। এই ওয়াচটাওয়ার থেকে বিস্তৃত জঙ্গল দেখা যায়। এখানে রয়েছে ম্যানগ্রোভ ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার। সুন্দরবন জাতীয় উদ্যানে প্রবেশের অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হয় এখানকার বনবিভাগের অফিস থেকেই। থাকার জন্য রাজ্যের পর্যটন বিভাগের টুরিস্ট লজ আছে এখানে।

সুধন্যখালি ওয়াচটাওয়ার

অনেকসময়ই এই ওয়াচটাওয়ার থেকে বাঘ দেখা গেছে। ওয়াচটাওয়ারের পেছনে রয়েছে একটি মিষ্টি জলের পুকুর। তার পেছনে ঘাসবন। ওই ঘাসবনে গা ঢাকা দিয়ে পুকুরে জল খেতে আসে বুনোশুয়োর, হরিণ। কখনো সাবধানী বড় মিয়াঁও।

বুড়িরডাবরি ওয়াচটাওয়ার

এটি একটি বিখ্যাত ওয়াচটাওয়ার। এখানে কাদামাটির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায় রায়মঙ্গল ভিউপয়ন্টে। এই ভিউপয়েন্ট থেকে রায়মঙ্গল নদীর অপরূপ সৌন্দর্য চাক্ষুষ করা যায়। হাঁটতে হাঁটতে দেখা পাবেন নানা প্রজাতির শামুক ও কাঁকড়ার। একটি কাঠের পুলের ওপর দিয়ে যেতে হবে ওয়াচটাওয়ারে। ওয়াচটাওয়ারের ওপর থেকে রায়মঙ্গলের ওপারে বাংলাদেশের অন্তর্গত সুন্দরবনের গুরুগম্ভীর রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়।

নেতিধোপানি ওয়াচটাওয়ার

এই নজরমিনারটির সঙ্গে বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি যুক্ত হয়ে আছে। মনে করা হয়, স্বামী লখিন্দরের মৃতদেহবাহী বেহুলার ভেলাটি নেতাধোপানি এলাকাটি অতিক্রম করেছিল। ওয়াচটাওয়ার থেকে ৪০০ বছরের পুরোনো একটি শিবমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। মনে করা হয়, জঙ্গলের ডানপাশে একটি রাস্তা আছে। রাস্তাটি তৈরি করেছিলেন বাংলার বারো ভুঁইঞার এক ভুঁইঞা মহারাজা প্রতাপাদিত্য। ষোড়শ শতকের সেই রাস্তা এখন মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। নেতিধোপানি অঞ্চল থেকে টেরাকোটার কিছু প্রত্নসামগ্রীও উদ্ধার করা গেছে।

দোবাঁকী ওয়াচটাওয়ার

দোবাঁকীতে ক্যানোপি ওয়াক-এর ব্যবস্থা আছে। মাটি থেকে ২০ ফুট উঁচুতে দুপাশে তারের জালের বেড়া দেওয়া প্রায় আধ কিলোমিটার পথ হেঁটে ওয়াচটাওয়ারে পৌঁছাতে হয়। চলতে চলতে নানা প্রকারের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে খুব কাছ থেকে। সাক্ষাৎ ঘটতে পারে নানা পাখির সঙ্গে।

ভগবতপুর কুমির প্রকল্প

এটি একটি জনপ্রিয় দ্রষ্টব্য স্থল। সপ্তমুখী নদীর মোহনায় লোথিয়ান দ্বীপ সংলগ্ন গভীর জঙ্গলের মধ্যে কুমির প্রকল্পের অবস্থান। নিসর্গ দৃশ্য চমৎকার। প্রকল্প এলাকায় যাওয়ার পথে অনেক সময়েই জঙ্গলে ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণের দর্শন মেলে। কুমির প্রকল্পে নানা বয়স ও আকারের কুমির, বাটাগুর বাস্কা প্রজাতির কচ্ছপের
দর্শন পাওয়া যাবে।

কলস দ্বীপ

মাতলা নদীর মোহনায় কলস দ্বীপের অবস্থান। বালুচরের ওপারে গা ছমছমে জঙ্গল। বেশিরভাগ সময়ে জলযান থেকেই বিপদসংকুল জঙ্গল দেখতে হয়। সশস্ত্র রক্ষী ছাড়া বালুচরে নামা নিষেধ। শীতে অলিভ রিডলে প্রজাতির কচ্ছপেরা এখানকার বালুচরে ডিম পাড়তে আসে। কলস দ্বীপে উপকূলীয় নানা পাখিরও দেখা মিলবে।

হ্যালিডে আইল্যান্ড

হ্যলিডে আইল্যান্ডের জঙ্গল একটি অভয়ারণ্য। আয়তন ৬ বর্গকিলোমিটার। কাকর হরিণের আবাস এখানকার জঙ্গল। পরিবেশ সম্পর্কে আগ্রহীরা এই দ্বীপটি দেখতে যেতে পারেন।

পঞ্চমুখানী

পাঁচটি নদী মিলিত হয়েছে এখানে। নদীগুলি হলোঃ মাতলা, বিদ্যাধরী, হেড়োভাঙা,নবাঁকী, গাজিখালি। জলযানে চলতে চলতে সমুদ্রের মতো বিপুল জলরাশির পঞ্চমুখী তথা পাঁচ নদীর মিলনের জায়গাটি দেখে বিস্মিত হতে হয়। নবাঁকী থেকে নদীপথে পঞ্চমুখানী হয়ে দোবাঁকী ওয়াচটাওয়ারে যাওয়া যায়। এ পথে গাঙ্গেয় ডলফিন চোখে পড়ে অনেক সময়েই।

কনক সৈকত

কনক একটি ঝকঝকে সৈকত এলাকা। অভয়ারণ্যের অংশ। শীতের মরশুমে এখানে সামুদ্রিক অলিভ রিডলে কচ্ছপেরা ডিম পাড়তে আসে। মার্চ-এপ্রিল মাস নাগাদ এই ছোট আকৃতির কচ্ছপেরা আবার সমুদ্রে ভেসে পড়ে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে। যাবে ছেড়ে আসা গন্তব্যে।

বালি দ্বীপ

সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের অন্তর্ভুক্ত একটি দ্বীপ বালি। দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যা ও গোমতী নদীর পলি জমে দ্বীপটির সৃষ্টি হয়েছে। নদী দিয়ে ঘেরাও দ্বীপটিতে অনেক দিন ধরেই মানুষের বসতি রয়েছে। দুটি গ্রাম পঞ্চায়েতে বিভক্ত দ্বীপটি। বালি-১ ও বালি-২। চাষ-আবাদ,মাছধরা,কাঁকড়া সংগ্রহ, জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ দ্বীপবাসীদের প্রধান জীবীকা। আগে আশেপাশের জঙ্গল থেকে প্রায়ই বালি দ্বীপে বাঘ হানা দিত। প্রসঙ্গত, সুন্দরবনের বাঘ কিন্তু খুব ভালো সাঁতার জানে। ফলে নদী পেরিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়া এদের কাছে কঠিন কোনও কাজ নয়। এখন দ্বীপে বাঘের আগমণ আটকাতে শক্তপোক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। বালি দ্বীপে পর্যটকদের থাকার জন্যও ভালো ব্যবস্থা আছে। বালি দ্বীপ থেকে যেমন সুন্দরবন ঘুরে দেখা যায়, তেমন স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে তাঁদের জীবন-জীবিকার কথা শোনা যায়। সঙ্গে থাকে বাঘের গল্প। গদখালি থেকে মোটর বোটে বালি দ্বীপ পৌঁছাতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে।

যাওয়ার পথ

সুন্দরবনের নিকটতম রেলস্টেশন ক্যানিং। শিয়ালদা দক্ষিণ শাখা থেকে দিনের বিভিন্ন সময়ে পাওয়া যাবে ক্যানিং লোকাল। দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। সময় লাগবে সোয়া এক ঘন্টা।

সুন্দরবন প্রবেশের জন্য বেশিরভাগ জলযাত্রাই শুরু হয় গদখালি জেটি থেকে। ক্যানিং স্টেশন চত্বর থেকে গদখালি জেটির দূরত্ব প্রায় ২৯ কিলোমিটার। ক্যানিং থেকে অটোরিকশা, ছোট আকারের বাস পাওয়া যায়।৩০-৪০ মিনিট সময় লাগবে। ক্যানিং থেকে সোনাখালি বা ধামাখালি গিয়ে সেখান থেকেও জলযানে ওঠা যায়। ক্যানিং-ধামাখালি দূরত্ব ২৭ কিলোমিটার। ক্যানিংয়ের দিক থেকে গদখালি যাওয়ার পথে আগে পড়বে সোনাখালি। সড়কপথে কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে নামখানা,রায়দিঘি ও ন্যাজাটের। এই জায়গাগুলো থেকেও সুন্দরবনে প্রবেশ করা যায়।

বাবুঘাট থেকে সায়েন্স সিটি হয়ে বাসন্তী হাইওয়ে ধরে সোনাখালি পর্যন্ত সি এস টি সি-র বাস আছে। সোনাখালি থেকে গদখালি ফেরিঘাট যাওয়ার জন্য অটোরিকশা পাওয়া যাবে। প্রাইভেট গাড়িতে বাসন্তী হাইওয়ে ধরে সরাসরি গদখালি ৯৮ কিলোমিটার এবং রাজপুর, সোনারপুর রোড ধরে ক্যানিং হয়ে গদখালি ৭৯ কিলোমিটার।

কোনো টুর অপারেটর সংস্থার মাধ্যমে সুন্দরবন ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে সেই সংস্থাই কোন পয়েন্টে তাঁদের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হবে তা জানিয়ে দেবে। সরাসরি হোটেল বুক করলে, হোটেল কর্তৃপক্ষও আপনাকে হোটেল পৌঁছানোর ব্যাপারে সহায়তা করবেন। অনেকসময় ভ্রমণ সংস্থা এবং হোটেল কর্তৃপক্ষ কলকাতা থেকেই তাঁদের নিজেদের গাড়িতে পর্যটকদের তুলে নেন। সেক্ষেত্রে যাতায়াতের গোটা ব্যবস্থার দায়িত্ব নেন সংস্থা কর্তৃপক্ষ। বোটে সুন্দরবন বেড়ানোর ব্যবস্থা করবেন এঁরাই। যাতায়াত,থাকা-খাওয়া, বেড়ানো সবমিলিয়ে একটা প্যাকেজ তৈরি হবে।

নিজেদের মতো করে বেড়াতে চাইলে গদখালি বা সোনাখালির মতো এন্ট্রি পয়েন্ট থেকে দিনপ্রতি ভাড়ায় বোট পাবেন। দরদাম করে নিতে হবে। আর সজনেখালিতে বনদপ্তরের অফিস থেকে পারমিট সংগ্রহ করে নিতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের সুন্দরবন প্যাকেজ টুরের ব্যবস্থা আছে। টুরটির নাম ‘সুন্দরবন সাফারি’। এম ভি চিত্ররেখা বা এম ভি সর্বজয়া লঞ্চে সুন্দরবন ঘুরিয়ে দেখানো হয়। যাতায়াত,থাকা-খাওয়া, বেড়ানোর সমস্ত দায়িত্ব পর্যটন বিভাগেরই।

বিভিন্ন বেসরকারি পর্যটন সংস্থা সুন্দরবনে প্যাকেজ টুরের আয়োজন করে থাকে।

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *