Follow us
English

সিলারিগাঁও হয়ে রেশমপথে

সিলারিগাঁও হয়ে রেশমপথে

একসময় এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকাকে যুক্ত করেছিল রেশমপথ বা সিল্করুট। সিকিম ও ভুটানের মাঝখানে তিব্বত তথা চিনের চুম্বি উপত্যকা। এই চুম্বি উপত্যকায় চিনের সামরিক ঘাঁটি তৈরির প্রচেষ্টা ভারতের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার পরিপ্রেক্ষিতে। এই চুম্বি ভ্যালির মাধ্যমে তিব্বতের লাসার সঙ্গে বর্তমান কালিম্পংকে যুক্ত করেছিল ওল্ড সিল্করুট। উত্তরবঙ্গের মধ্যে দিয়ে চিন, তিব্বত থেকে আসা উন্নত মানের রেশম, পশম পৌঁছে যেত বঙ্গের প্রাচীণ তাম্রলিপ্ত বন্দরে। তারপর জলপথে সেইসব পণ্য পৌঁছাতো শ্রীলঙ্কা, বর্তমান মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলিতে।

ভারতের দিকে কালিম্পংয়ের পেডং থেকে সিকিমের রেনক, রংলি, জুলুক, নাথাং উপত্যকা, কুপুপ, সিকিম-তিব্বত সংযোগকারী জেলেপ লা বা জেলেপ পাস, চুম্বি ভ্যালি হয়ে সিল্করুট পৌঁছেছে তিব্বতের লাসায়।

আমরা এই প্রাচীণ রেশমপথের খানিকটা অংশ বেড়িয়ে আসতে পারি। সেই ভ্রমণের একটা রূপরেখা উপস্থাপিত হল এখানে। সময়-সুযোগ অনুসারে ভ্রমণের সূচি সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ তো রইলই।

ভ্রমণ-সূচি

প্রথম দিন

রাতের ট্রেনে যাত্রা শুরু। গন্তব্য নিউ জলপাইগুডি (এন জে পি) স্টেশন।

দ্বিতীয় দিন

এন জে পি স্টেশন থেকে সিলারিগাঁওয়ের উদ্দেশে যাত্রা। এন জে পি থেকে কালিম্পং হয়ে সিলারিগাঁও ৯৬ কিলোমিটার। স্টেশন চত্বর থেকে গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি সিলারিগাঁও পৌঁছানো যেতে পারে। এন জে পি বা শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার গাড়িতে কালিম্পং এসে সেখান থেকে পুরো গাড়ি ভাড়া করে সিলারিগাঁও যাওয়া যেতে পারে। নিউ মাল জংশন স্টেশন থেকেও সিলারিগাঁও যাওয়া যেতে পারে। দূরত্ব ৯৪ কিলোমিটার। পথে কোথাও ব্রেকফাস্ট সেরে নিন।

৬০০০ ফুট উচ্চতায় সিলারিগাঁও একটি শান্ত পার্বত্য গ্রাম। দূর আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা। মধ্যাহ্নভোজন সেরে সিলারিগাঁও দেখতে বেরিয়ে পড়ুন। প্রথম দিন দেখে নিতে পারেন সাইলেন্ট ভ্যালি, সাংচেন দর্জি মনাস্ট্রি ও ক্রস হিল। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে ক্রস হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য দেখে মন ভরে যাবে। সন্ধ্যায় হোটেল বা হোমস্টেতে ফিরে আসুন।

সিলারিগাঁও। সৌজন্যঃ ডুয়ার্স ট্রিপ।

তৃতীয় দিন

প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পডুন। খানিকটা ট্রেক করে যেতে পারেন ডামসাং ফোর্ট। সঙ্গে জুড়ে নিতে পারেন হনুমান তককে। বেড়িয়ে আসতে পারেন রিকিসুম থেকে। ডামসাং ফোর্ট এলাকা ও রিকিসুম পাখি পর্যবেক্ষদের কাছে আদর্শ জায়গা। ফিরে আসুন হোটেলে। মধ্যাহ্নভোজন সেরে খানিক বিশ্রাম নিয়ে ফের বেরিয়ে পড়া। চলুন রামিতে ভিউপয়েন্টে। সিলারিগাঁও থেকে ৩ কিলোমিটার। এখান থেকে তিস্তার ১৪টি বাঁক এবং তিস্তা ও রেশি নদীর সঙ্গম এক অবাক করা ছবি। কাছেই ইচ্ছেগাঁও। ইচ্ছেগাঁও থেকে ট্রেক করে সিলারিগাঁও ফিরতে পারেন। এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগবে ট্রেকপথে।

চতুর্থ দিন

সকালে প্রাতরাশ সেরে রেশিখোলার উদ্দেশে যাত্রা করা যাক। অরণ্য, নদী, পাহাড় ইত্যাদি-সহ বাংলা-সিকিম সীমান্তের রেশিখোলা পার্বত্য প্রকৃতির অন্দরমহল। অরণ্যপথ ধরে খানিকটা বেড়িয়ে আসতে পারেন, রেশিখোলায় স্নান করতে পারেন, নদীতে মাছ ধরতে পারেন। সন্ধ্যায় জমে উঠতে পারে ক্যাম্পফায়ার, বারবিকিউ।

রেশিখোলা। সৌজন্য: নর্থবেঙ্গল টুরিজম।

পঞ্চম দিন

ব্রেকফাস্ট সেরে রেশিখোলা থেকে বেরিয়ে পড়ুন মানখিমের উদ্দেশে। মানখিমে ঢুকে পড়েছেন মানে সেই পুরনো রেশম পথে পা রেখেছেন। আকাশে চোখ রাখলে কাঞ্চনজঙ্ঘা, নীচে অশ্বক্ষুরাকৃতির আরিতার লেক। মানখিম যেন এক জাদু-বাস্তবতা। হোটেল বা হোমস্টেতে আশ্রয় নিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নিন। তারপর চলে যান আরিতারে। বোটিং করতে পারেন লেকে। লেক-সংলগ্ন পাহাড়ের উপরের মন্দিরটিও দেখে নেওয়া যেতে পারে।

মানখিম থেকে দেখা। সৌজন্য: সিকিম টুরিজম।

ষষ্ঠ দিন

এ দিন লুংথুং যাওয়ার দিন। যাত্রাপথে দেখে নেওয়া যেতে পারে কিউ খোলা জলপ্রপাত ও মুলকারখা লেক। ছোট্ট লেক মুলকারখা। আবহাওয়া ভালো থাকলে লেকের জলে দূর কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিফলন দেখে অভিভূত হতে হবে। দেখে নিন লুংথুং মনাস্ট্রি। হোটেলে পৌঁছে লাঞ্চ সেরে বিশ্রাম। একটু হাঁটাহাঁটি আর চারদিকটা চোখভরে দেখা আর প্রাণভরে উপভোগ করা।

মুলকারখা লেক। সৌজন্য: ট্র্যাভেল উইথ বং

সপ্তম দিন

পূর্ব সিকিমের ১১,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত সমগ্র লুংথুং প্রকৃতপক্ষে একটি ভিউপয়েন্ট। একদিকে দীর্ঘ কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জ, অন্যদিকে জুলুকের পাহাড়ের গায়ে ৩২টি হেয়ারপিন বাঁকের রাস্তার সারি। বিশ্বের ১০টি বিপজ্জনকতম রাস্তার একটি জুলুকের এই ভুলভুলাইয়া রাস্তা।

জুলুকের ভুলভুলাইয়া রাস্তার সারি। সৌজন্য: উইকিমিডিয়া কমনস।

লুংথুংয়ের থাম্বি ভিউপয়েন্টে একবার যাওয়া উচিৎ। এখান থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য মনে গেঁথে থাকবে। ওই জিগজ্যাগ রাস্তার একাংশেই থাম্বি ভিউপয়েন্ট। বেড়িয়ে আসতে পারেন কুপুপ লেক থেকে। বেড়িয়ে আসা যায় তুকলা ভ্যালি থেকে। তুকলা ভ্যালি থেকে জেলেপ লা পাস দেখা যায়। জেলেপ লা ভারত ও তিব্বতের লাসার(চিন) মধ্যে যোগাযোগ ঘটিয়েছে।

অষ্টম দিন

এ দিন লুংথুং থেকে চলে আসা যাক ১৩,০০০ ফুট উচ্চতার নাথাং ভ্যালিতে। নাথাংকে ‘পূর্ব ভারতের লাদাখ’ বলা হয়। একটা অবাক করা ছবি যেন এই উপত্যকাটি। শীতে পুরু বরফের চাদরে ঢাকা পড়ে নাথাং। শরতে শুকনো ঘাসের বাহারে উপত্যকা সোনালী বর্ণ ধারণ করে। বর্ষায় উপত্যকার মধ্যে দিয়ে সগর্জনে প্রবাহিত হয় নদী। উপত্যকা বেড় দিয়ে তুষারশুভ্র সব পর্বতশীর্ষ।

নাথাং ভ্যালি। সৌজন্য: চোগিয়াল হোমস্টে।

নবম দিন

এ দিন সকাল সকাল বিছানা ছেড়ে উঠে নাথাংয়ের পাহাড় থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্যটি দেখুন। টানা আট দিন ধরে বেড়ানোর পরে আজকের দিনটি নাথাংয়ের ওই ছবির মতো পরিবেশে বিশ্রাম।

দশম দিন

এ দিন সকালের খাওয়াদাওয়া সেরে ধীরেসুস্থে এন জে পি স্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা। নাথাং থেকে এন জে পি স্টেশন ১৬৯ কিলোমিটার।

চাইলে নাথাং ভ্যালি থেকে ছাঙ্গু লেক ও বাবা মন্দির বেড়িয়ে গ্যাংটকে রাত্রিবাস করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বেড়ানোর সূচিতে আরেকটি দিন যুক্ত হবে। নাথাং ভ্যালি থেকে ছাঙ্গু লেক ২৮ কিলোমিটার। ছাঙ্গু লেক থেকে বাবা মন্দির ১৪ কিলোমিটার। বেড়িয়ে আসা যায় ভারত ও তিব্বত তথা চিন সংযোগকারী নাথুলা পাস থেকেও। ছাঙ্গু লেক থেকে নাথুলা পাস ১৭ কিলোমিটার। একই দিনে গ্যাংটক ফিরে আসা যাবে। ছাঙ্গু লেক থেকে গ্যাংটক ৪৫ কিলোমিটার। পরের দিন এন জে পি স্টেশন বা বাগডোগরার উদ্দেশে যাত্রা।

হেডার ছবিঃ সৌজন্য অ্যালামি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *