Follow us
English

চলুন যাই দূষণমুক্ত সিঙ্গি গ্রামে

চলুন যাই দূষণমুক্ত সিঙ্গি গ্রামে

আদিগন্ত সবুজ খেত। হু হু বাতাস সেই টিয়ারঙা খেতে ঢেউ তোলে অহরহ। সূর্যাস্ত হয় শস্যখেতের দিগন্তে। তখন অদ্ভুদ এক মায়াবী আলো ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিকে। মিঠে জোছনায় নিঃশব্দ সুরের মায়াজাল ছড়িয়ে পড়ে ক্রমশ। খেতে ধেড়ে ইদুঁর ঘুরে বেড়ায়। আকাশে প্যাঁচা ওড়ে। ভোর হলে মৌটুসী, ফিঙে, বুলবুলি, খঞ্জন, কাস্তেচরা, মানিকজোড়, ছাতারের ডাকে দিনের পরিবেশ পরিশুদ্ধ হয়। হ্যাঁ, এসবই। বড় বড় দোকানপাট নেই। হট্টগোল নেই। খাবারদাবারে বিষ নেই। আছে শান্তির বিশ্রাম। আর পরিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণদায়ী অক্সিজেন।

কোথায় জায়গাটা?

সিঙ্গি। বর্ধমানের সিঙ্গি। পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া মহকুমার সিঙ্গি গ্রাম। কলকাতা থেকে মোটামুটি ৩ ঘন্টা সময় লাগে পৌঁছাতে। ট্রেন, বাস অথবা নিজস্ব গাড়িতে বা গাড়ি ভাড়া করে চলে যাওয়া যায়। যাওয়ার পথ সম্পর্কে বিশদ তথ্য নীচে জানানো হয়েছে।

থাকার ব্যবস্থা?

থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে বলতে গেলে শান্তিনিকেতন লজের কথা একটু বিশদে না বললেই নয়। এ পর্যন্ত সিঙ্গিতে এই শান্তিনিকেতন লজই থাকবার একমাত্র ব্যবস্থা। পরিবেশের সঙ্গে একেবারে মানানসই আয়োজন। অতিথিদের থাকার জন্য মোট ৬টি ঘর রয়েছে শান্তিনিকেতন লজে। একতলায় বাড়ির ভিতরের বাগান-সংলগ্ন একটি, দোতলায় দুটি এবং তিনতলায় তিনটি ঘর। সবকটি ঘরেই রয়েছে অ্যাটাচড বাথরুম। শুধু তিনতলায় তিনটি ঘর বাতানুকূল। গ্রীষ্মে সাধারণত একতলার চারশয্যার ঘর এবং দোতলার দ্বিশয্যার ঘর দুটি ভাড়া দেওয়া হয় না ঘরগুলি নন-এসি হওয়ার কারণে। গ্রীষ্মে তিনতলার এসি দ্বিশয্যার ঘরগুলি ব্যবহৃত হয়। ঘরগুলির নামে বৈচিত্র আছে। শান্তিনিকেতন লজের ছ’টি ঘরের নাম এরকমঃ তেজপাতা, পাঁচফোড়ন, কারিপাতা, পোস্ত, সর্ষে ও মণ্ডা। প্রসঙ্গত, বর্ধমানের সিঙ্গি এলাকার মণ্ডার যথেষ্ট সুখ্যাতি আছে।

 

শান্তিনিকেতন লজের কথা হবে আর সম্রাট বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা উঠবে না তা কি হয়? সম্রাট বন্দ্যোপাধ্যায় শান্তিনিকেতন লজের স্রষ্টা। এখানে লজ বলতে কিছু মানুষের থাকার ব্যবস্থা নয় মাত্র। শান্তিনিকেতন লজ পরিবেশের সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত হয়ে থাকে। সুস্থ ও অকৃত্রিম জীবনযাপনে প্রেরণা দেয়। এই করোনাকালে আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি, বিষমুক্ত বাতাস, বিষমুক্ত খাদ্য, পরিচ্ছন্নতার আন্তরিক অভ্যাস ছাড়া এই পৃথিবী বার বার নরকুণ্ডে পরিণত হবে। শান্তিনিকেতন লজের কর্ণধার দায়িত্বশীল পর্যটন আদর্শ মেনে চলার চেষ্টা করেন। ঘরের নামগুলির মধ্যেই প্রকৃতির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার অঙ্গীকার রয়েছে। কর্মকাণ্ডে সঙ্গী করে নিয়েছেন গ্রামের কিছু মানুষকেও। ছোট আয়োজন। ভাবনায় মহৎ।

লজ চত্বরের মধ্যেই রয়েছে দুটি বাগান। সেখানে মরশুমী সবজি ফলানো হয়। ফলের গাছ আছে। রয়েছে ছোট একটি জলাশয়, মাছের চাষ হয় সেখানে। চাষ নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন সম্রাটবাবু। সবজি বা মাছের চাষে কোনওরকম রাসায়নিক সার, কীটনাশক বা জলাশয়ে রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করা হয় না, এমনকী অনেকসময় জৈব সারও ব্যবহার করা হয় না চাষের কাজে। তাহলে কিভাবে শান্তিনিকেতন লজের বাগানে বিষমুক্ত নধর ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টম্যাটো ফলে। সম্রাটবাবু বলেন, ‘পার্মাকালচার’ বা পার্মানেন্ট কালচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সম্পূর্ণতই প্রাকৃতিক পদ্ধতি এটি। এ ব্যাপারে আরও জানতে হলে শান্তিনিকেতন লজে গিয়ে কাজের পদ্ধতি দেখতে হবে। সবজি, মাছ চাষের পাশাপাশি ঘি তৈরি হয়, তিলের তেল তৈরি হয়। তেল নিষ্কাশনের পরে সেই তিলের খোল জলাশয়ে দেওয়া হয় মাছের খাদ্য হিসেবে।

কেন যাবেন

সিঙ্গি একটা গ্রাম। বড় দোকানপাট নেই। শপিং মল ইত্যাদি দূর অস্ত। যা পাবেন তা হল, অক্সিজেনে ভরপুর বাতাস, যতদূর চোখ যায় সবুজ খেত। আর নির্বিষ খাবারদাবার। শান্তিনিকেতন লজে টেলিভিশন নেই। ঘরের কুলুঙ্গিতে পাবেন বই। এক কাপ চা আর মন চাইলে একটা বই নিয়ে ছাদে বা বাগানে বসুন। সামনে থাকবে সবুজের বিস্তার।

পাখি পর্যবেক্ষণে আগ্রহ থাকলে ক্যামেরা, বায়নাকুলার সঙ্গে আনবেন। ইচ্ছে হলে নিজের হাতে তৈরি করতে পারেন বিষমুক্ত ভোজ্য তেল। ঘি তৈরি শিখতে পারেন। চাইলে গাছপালা চেনা যায়। গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে পারেন। কাছ থেকে দেখবেন গ্রামীণ জীবন। দূষণমুক্ত পরিবেশই সিঙ্গির প্রধান সম্পদ। সঙ্গে ছোটরা থাকলে তাঁদেরও পরিচয় ঘটবে সেই গ্রাম-জীবনের সঙ্গে, চাষবাসের সঙ্গে, গাছগাছালির সঙ্গে, পাখির সঙ্গে।

সিঙ্গি থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে শ্রীবাটি গ্রামে রয়েছে তিনটি অসাধারণ টেরাকোটার মন্দির। দেখে আসতে পারেন। সিঙ্গি থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে জগদানন্দপুরের রাধাগোবিন্দ জিউর দারুণ সুন্দর পাথরের মন্দিরটিও দেখবার মতো। নতুন গ্রাম সিঙ্গি থেকে ১২ কিলোমিটার। কাঠের প্যাঁচা তৈরির জন্য বিখ্যাত এই নতুন গ্রাম।

খাওয়াদাওয়া

টাটকা শাক-সবজি, মাছ, ঘরে তৈরি তেল ও মশলা ব্যবহার করে রান্না নানা পদ পাবেন খাওয়ার পাতে। পাবেন ঘরে তৈরি ঘি, দই। সকালের চা, প্রাতরাশ, মধ্যাহ্নভোজন, বিকেলের চা, জলখাবার ও নৈশ আহারের জন্য প্রতিদিন জনপ্রতি খরচ ৫৪০ টাকা (নিরামিষ) ও ৭৫০ টাকা (আমিষ)। ৬ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত বয়সের বাচ্চারা খাওয়াদাওয়ার খরচে কিছুটা ছাড় পেয়ে থাকে।

ঘরের ভাড়া

শান্তিনিকেতন লজের তিনতলার বড় আকারের দ্বিশয্যা ঘরের ভাড়া দিনপ্রতি ২১০০ টাকা। তিনতলার অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের দ্বিশয্যা ঘরের ভাড়া দিনপ্রতি ১৮০০ টাকা। দোতলার বড় দ্বিশয্যা ঘরের ভাড়া ১৫০০ টাকা ও দোতলার ছোট আকারের দ্বিশয্যা ঘরের ভাড়া ১৩০০ টাকা। একতলার বাগান-সংলগ্ন ঘরটি চার শয্যার। ভাড়া দিনপ্রতি ১৬০০ টাকা। কোনও ঘরে অতিরিক্ত একজন অতিথির থাকার ব্যবস্থার জন্য ৩০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। গাড়ি নিয়ে এলে ড্রাইভারের থাকার জন্য ডর্মিটরির ব্যবস্থা আছে। থাকা এবং সারাদিনের খাওয়াদাওয়া বাবদ দিনপ্রতি খরচ পড়বে নিরামিষ খাবারের ক্ষেত্রে ৫৯৯ টাকা এবং আমিষ খাবারের ক্ষেত্রে ৭৯৯ টাকা।

যাওয়ার পথ

নিজেদের গাড়িতে এলে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে মেমারি চলে আসুন। সেখান থেকে সাতগাছিয়া, মন্তেশ্বর, মালডাঙ্গা, মেঝিরি ও সিঙ্গির মোড় হয়ে পৌঁছাবেন শান্তিনিকেতন লজ (সিঙ্গি গেস্টহাউস)। সিঙ্গি মোড় থেকে ৪ কিলোমিটার। কলকাতার শ্যামবাজার থেকে এ পথের দূরত্ব ১৩৩ কিলোমিটার। সময় লাগে মোটামুটি ৩ ঘন্টা। এছাড়া ডানকুনি থেকে পুরনো দিল্লি রোড ধরে মগরা, কালনা, পারুলিয়া হয়েও সিঙ্গি আসা যায়। এ পথের দৈর্ঘ্য শ্যামবাজার থেকে গণনা করলে ১৪৪ কিলোমিটার। বর্ধমান শহর হয়ে বলগোনা, কৈচর, কৈথন হয়েও সিঙ্গির মোড় পৌঁছানো যায়। কলকাতার শ্যামবাজার থেকে এ পথের দৈর্ঘ্য ১৫৫ কিলোমিটার।

কলকাতার ধর্মতলার এস বি এস টি সি-র বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ কাটোয়াগামী বাস ছাড়ে। সিঙ্গির মোড় ছুঁয়ে কাটোয়া যায়। সিঙ্গি পৌঁছাতে সাড়ে ৩ ঘন্টা মতো সময় লাগে। ওই বাসটিই সকাল ৬ টা নাগাদ কাটোয়া থেকে ছেড়ে সিঙ্গির মোড় হয়ে কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করে।

কলকাতার পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশনের সামনে থেকে একটি নন-এসি লাক্সারি বাস দুপুর ৩ঃ২০-র সময় রওনা হয়ে সিঙ্গি পৌঁছায় সন্ধ্যা ৭ টায়। আবার সকাল ৫ঃ৫৫ নাগাদ বাসটি পাটুলি থেকে রওনা দিয়ে শান্তিনিকেতন লজের সামনের রাস্তা ধরে কলকাতার দিকে রওনা দেয়। কলকাতায় পৌঁছায় সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ। এটি বেসরকারি বাস। যোগাযোগের নম্বরঃ৭৬০২৯-৩৮০৯৯।

ট্রেনপথে হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে কাটোয়াগামী যে-কোনও ট্রেনে উঠে পড়ুন। লোকাল ট্রেনে উঠলে নামতে হবে কাটোয়ার তিনটি স্টেশন আগে পাটুলি স্টেশনে। হাওড়া থেকে কাটোয়াগামী ট্রেনের সংখ্যা বেশি। হাওড়া থেকে কাটোয়া লাইনের ট্রেনের সংখ্যা বেশি। পাটুলি স্টেশনে পৌঁছাতে সময় লাগে পৌনে ৩ ঘন্টা। পাটুলি স্টেশন থেকে সিঙ্গি ১০ কিলোমিটার। স্টেশন থেকে অটো, টোটো পাবেন। শেয়ারের গাড়িও পাওয়া যাবে। এক্সপ্রেস বা মেল ট্রেন পাটুলি স্টেশনে থামে না। নামতে হবে কাটোয়া জংশনে। এখান থেকেও অটো, টোটো, ম্যাজিক গাড়ি পাবেন সিঙ্গি পৌঁছানোর জন্য।

শান্তিনিকেতন লজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লজে থাকার জন্য অন্তত ২৪ ঘন্টা আগে ঘর বুক করতে হবে। স্পট বুকিং হয় না।
যোগাযোগের নম্বরঃ ৭০৪৪৭-৯১৪৩৬

 

উপরোক্ত ছবি : শান্তিনিকেতন লজের সৌজন্যে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *