নিম্ন হিমালয়ের তিন গ্রাম। লাটপাঞ্চার, শেলপু, অহলদাড়া। অবস্থান দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াং সাব-ডিভিশনে। এক যাত্রায় অনায়াসে তিনটি গ্রাম বেড়ানো যায়। চাইলে যাওয়া যায় আশেপাশে, আরেকটু দূরে। আঞ্চলিক গাইড সঙ্গে নিয়ে ঢুকে পড়া যায় মহানন্দা অভয়ারণ্যের অভ্যন্তরে।
লাটপাঞ্চার
মহানন্দা অভয়ারণ্যের মধ্যে পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত লাটপাঞ্চার গ্রামটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াং ডিভিশনের লাটপাঞ্চার মহানন্দা অভয়ারণ্যের সর্বোচ্চ পয়েন্টও বটে। উচ্চতা কমবেশি ৫,০০০ ফুট। পাখির আবাস হিসেবে লাটপাঞ্চারের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।
রুফাস নেকড হর্নবিল, মিনিভেট, ফ্যালকন, ঈগল, ক্রেস্টেড সারপেন্ট ঈগল, স্কারলেট মিনিভেট, সুলতান টিট, এমারেল্ড ড্রোভ, গ্রিন-বিলড মালখোয়া, ব্ল্যাক বাজা, মাউন্টেন স্কপস আউল ইত্যাদি সহ ২০০-র বেশি পাখির দেখা পাওয়া যায় লাটপাঞ্চারে। লাটপাঞ্চার এবং লাটপাঞ্চার-সংলগ্ন অন্যান্য গ্রাম যেমন ৬-মাইল গ্রাম, শেলপু, সিটং এলাকা জুডে বৃহত্তর বার্ডিং অঞ্চলের বিস্তার। আর আছে প্রজাপতি। বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতির দেখা পাওয়া যায় লাটপাঞ্চারে। নানা রকমের ভেষজ উদ্ভিদ আছে এখানে। আগ্রহীরা চিনে নিতে পারেন। দূরে মাথা উঁচিয়ে থাকবে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

পাহাড়-অরণ্যের যুগলবন্দি দেখা যায়, শোনা যায় এখানে। চাইলে আঞ্চলিক গাইড সঙ্গে নিয়ে জঙ্গল-পথে ট্রেক করা যেতে পারে। পার্বত্য অরণ্যের রূপ রস গন্ধ বর্ণের আন্তরিক পরিচয় পাওয়া যাবে। রক ক্লাইম্বিংয়েরও সু্যোগ আছে। নেচার স্টাডি ক্যাম্প আয়োজিত হতে পারে। লাটপাঞ্চার থেকে অহলদাড়া ৩ কিলোমিটার মাত্র। অহলদাড়ার পাহাড়ের শীর্ষ থেকে সূর্যোদয় চাক্ষুষ করে অবাক হতেই হবে। লাটপাঞ্চার থেকে খুব ভোরে যাত্রা করতে হবে। অহলদাড়া শীর্ষেও থাকার ব্যবস্থাও আছে।
শেলপু গ্রাম
শেলপু নতুন ভ্রমণ ঠিকানা। ৪০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত শেলপু লাটপাঞ্চার থেকে ৪ কিলোমিটার, অহলদাড়া থেকে ১ কিলোমিটার। পাখি, প্রজাপতি, ফুল, সুন্দর করে সাজানো ছোট ছোট বাড়ি, কমলালেবুর বাগান, দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা, মহানন্দা অভয়ারণ্যের প্রান্তসীমায় অবস্থিত গ্রামের মানুষের জীবনচর্চা, এ সব নিয়ে শেলপু গ্রাম নিম্ন-দার্জিলিংয়ের নতুন ভ্রমণ ঠিকানা হিসেবে পর্যটকদের মন কেড়েছে।

শেলপু থেকে দিনে দিনে বেড়িয়ে আসা যায় লাটপাঞ্চার ও অহলদাড়া। চটকপুর লাটপাঞ্চার থেকে দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার। চটকপুর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জের দৃশ্য চমৎকৃত করবে। একটু থেমে থেমে যেতে চাইলে ঘন্টা দুয়েক সময় লাগবে। মহালদিরাম, বাগোরার মতো অফবিট টুরিস্ট স্পট হয়ে চটকপুর পৌঁছাতে হয়। পথে পড়বে নানা গ্রাম। পথের বিভিন্ন জায়গা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা দেবে। বাগোরা, মাহালদিরাম ও চটকপুরে থাকার জন্য হোমস্টে রয়েছে।

অহলদাড়া
প্রথমে রাঙিয়ে ওঠে পুবের আকাশ। তারপর জ্বলে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা। রঙের খেলা শুরু হয় কাব্রু, সিনিয়ালচু শৃঙ্গে। সেই জাদুকরী সূর্যোদয়ের সাক্ষী থাকতে খুব ভোরে পৌঁছে যেতে হবে অহলদাড়া। অন্যথায় আগের দিনেই পৌঁছে যেতে হবে অহলদাড়া পর্বত শীর্ষে। থাকার ব্যবস্থা আছে।

দার্জিলিং জেলার নতুন পর্যটন ঠিকানা অহলদাড়া অল্পদিনেই খ্যাতি অর্জন করেছে তার চারদিকের দৃশ্যপটের জন্য। আর সানরাইজ পয়েন্ট হিসেবে অহলদাড়ার তুলনা কমই আছে। সমগ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জটাই দেখা যায় অহলদাড়া থেকে।
শেলপু পাহাড়ের ৪২০০ ফুট উচ্চতার অহলদাড়া থেকে একদিকে ডুয়ার্স ও তরাইয়ের সমভূমি অঞ্চল,অন্যদিকে দার্জিলিং,কালিম্পঙ,সিকিমের বিভিন্ন পাহাড়,চা বাগান এবং তিস্তার গর্জ দৃশ্যমান। আর দিনভর কাঞ্চনজঙ্ঘা ভেসে থাকে দূরের দৃশ্যপটে।

পাহাড়ের মাথায় রয়েছে গোটাতিনেক কটেজ। আর কিছু নেই। গোটা পাহাড়চূড়াটাই ওই তিন কটেজের পর্যটকদের।
অহলদাড়া থেকে এক কিলোমিটার নেমে এলে কমলালেবুর গ্রাম সিটং।
অহলদাড়া থেকে খানিকটা নেমে এলে নামথিং পোখরি। পাইন বনে ঘেরা ছোট্ট একটি জলাশয়। তবে শীতে, গ্রীষ্মে জল থাকে না। বর্ষায় টইটম্বুর। তখন ব্যাঙের মতো একধরণের বিপন্ন উভচর প্রাণী হিমালয়ান স্যালামান্ডারের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে সেই পোখরি।
যাওয়ার পথ
এন জে পি বা শিলিগুড়ি থেকে সেবক,কালিঝোরা হয়ে রাস্তা। কালিঝোরা শিলিগুড়ি থেকে ৩০ কিলোমিটার। কালিঝোরা থেকে বাঁদিকের রাস্তা ধরে শাল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে খানিকটা খাড়াই পথে ১৭ কিলোমিটার চলে এলে লাটপাঞ্চার। এখান থেকে অহলদাড়া ৩ কিলোমিটার। কালিঝোরা পর্যন্ত শেয়ার গাড়িতে এসে সেখান থেকে প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে অহলদাড়া আসা যেতে পারে। এন জে পি বা শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি অহলদাড়া চলে আসা যাবে।
দার্জিলিং থেকে বাগোরা, মারমিং হয়ে অহলদাড়া ৬৫ কিলোমিটার, কালিম্পঙ থেকে জাতীয় সড়ক ৩১এ ধরে কালিঝোরা হয়ে অহলদাড়া ৫৫ কিলোমিটার।

থাকার ব্যবস্থা
লাটপাঞ্চারেঃ হর্নবিল হোমস্টে, ফোন ৯৪৭৫৯-৫৯৯৭৪, ৯০৬৪১-৩৪১৯৮। লাটপাঞ্চার হোমস্টে, ফোন ৮৫১২৯-৮৮২৯৭, ৮৩৫০০-৬৭৭১৬। আশ্রয় হোমস্টে, ফোন ৮১০১৫-৫৪৩১৮, ৯৬০৯৯-৩৯৪৩২।
শেলপুতেঃ হ্যাপি ফিট হোমস্টেঃ ফোন ৭০২৯৬-২৮৫৪০। হামরো হোম শিবালিক শেলপু কটেজঃ ফোন ৯৭৩৩০-৭১৭১৬।
অহলদাড়ায় রয়েছে হামরো হোমের তিনটি কটেজ। হোমস্টে ব্যবস্থায় থাকা-খাওয়া। পাহাড়ের মাথায় তিনটি ছিমছাম কটেজ। কটেজের মালিক পদম গুরুং। বুকিংয়ের জন্য সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন পদম গুরুংয়ের সঙ্গে। যোগাযোগের নম্বর : ৮৯২৬০-১৫৪৭৭,৮৯০৬২-৩২২০২। থাকার ব্যবস্থার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন হামরো হোমের সঙ্গেও। ফোন ৯৭৩৩০-৭১৭১৬, ৯৭৩৩০-৬৯৬৯০।




