Follow us
English

জগদ্ধাত্রী পুজোয় ছন্দে ফিরল কৃষ্ণনগর

জগদ্ধাত্রী পুজোয় ছন্দে ফিরল কৃষ্ণনগর

কোভিডের জন্য গত দু’বছর ছিল না সেই চেনা জৌলুস। ছিল না উন্মাদনা। এ বছরের জগদ্ধাত্রী পুজোয় কৃষ্ণনগরকে পাওয়া গেল চেনা ছন্দে।

সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, নামী পুজোগুলোর চোখ ধাঁধাঁনো সব মণ্ডপ, চমৎকার সব দেবীমূর্তি, আলোকমালা, পথে মানুষের ঢল, বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, খাওয়াদাওয়া, নতুন পোশাক, ঠাকুর দেখা, সবমিলিয়ে এবারের জগদ্ধাত্রী পুজো উপলক্ষ্যে জাগ্রত হয়ে উঠেছিল সাবেক কৃষ্ণনগর এবং কোভিড-পরবর্তী কৃষ্ণনগর (কৃষ্ণগড়ও বটে)।

ইন্ডিয়া গেট। ঘূর্ণি নবারুণ সংঘের মণ্ডপ। ফটোঃ লেখক।

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো একদিনের পুজো। দুর্গাপুজোর মোটামুটি ৩০ দিন পরে শুক্লানবমীর দিন সন্ধিপুজো-সহ সপ্তমী আষ্টমী, নবমীর পুজো হয়ে যায়। বিসর্জন হয় দশমীতে। নিয়ম-নীতিকে মান্যতা দিয়ে পরিচালিত হয় বড় বড় সব পুজো।

মেয়ের চাকরি-সূত্রে মাঝে মাঝে এসে থাকি কৃষ্ণনগরে। নদিয়া জেলার সদর শহর। শিয়ালদা থেকে ট্রেনপথে ৯৭ কিলোমিটার, এসপ্ল্যানেড থেকে সড়কপথে ১০৭ কিলোমিটার। ঘিঞ্জি রাস্তাঘাট কম নয়। ধীরে ধীরে একটা উপলব্ধি হতে থাকল যে, শহরটার মধ্যে অন্তঃশলীলার মতো বয়ে চলেছে ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ একটা সংস্কৃতির ধারা।

জগদ্ধাত্রী পুজোয় সেই সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখলাম। বাইরে থেকে পুজো দেখতে এসেছেন বহু মানুষ। আঞ্চলিক অধিবাসীদের উৎসব উদযাপনের মধ্যে দীর্ঘ লালিত রুচি-ঐতিহ্যের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। কৃষ্ণনাগরিকদের একটা সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ গোটা উৎসবের আবহকে ইতিবাচক ভাবে প্রভাবিত করে।

এ বছরের পুজোর ইংরেজি তারিখ ছিল ২ নভেম্বর (২০২২)। দিন দুয়েক আগে থেকেই সেজে ওঠা শহরের রাস্তায় রাস্তায় মানুষের চলমান জমায়েত চোখে পড়ছে। ক্রমশ রাস্তায়, বাজারে, ঘরে ঘরে জ্বলে উঠল উৎসব ও আনন্দের রোশনাই।

পুজোর দিন দিনেরবেলায় রিকশায় চড়ে কয়েকটি মণ্ডপে গিয়ে ঠাকুর দেখলাম। দেবী অঙ্গে প্রচুর গহনা। কোনও কোনও মূর্তির ডাকের সাজ দেখে বিস্মিত হয়েছি। যেমন মণ্ডপ, তেমনি দেবীমূর্তীর শান্ত ও আনন্দিত সৌন্দর্য।

আগ্রার কেল্লা। শক্তিনগর এম এন বি ক্লাবের মণ্ডপ। ফটোঃ লেখক।

ঘরের মেয়ের মতো প্রতি পুজোর দেবীর আলাদা করে একটা নাম আছে। যেমন, সোনা মা, বাঘা মা, ছোট মা, আদি মা, বুড়ি মা। এক মহিলার সঙ্গে আলাপ হল বুড়ি মা-র মণ্ডপে। উনি শিলিগুড়ি থেকে এসেছেন বুড়ি মা-কে দর্শনের জন্য। উঠেছেন হোটেলে। পূর্ব স্মৃতি কিছু জড়িয়ে আছে হয়তো। বুড়ি মা-র পুজো খুব পুরনো পুজো। উদ্যোক্তাদের মতে, কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু হওয়ার কিছু পরেই বুড়ি মা-র পুজো শুরু হয়।

চাষাপাড়ার বুড়ি মা। ফটোঃ লেখক।

যতদূর জানা যায় এবং সেইসঙ্গে লোককথা অনুসারে, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র একসময় মুসলিম শাসকদের হাতে বন্দি হয়ে কিছুদিন ছিলেন মুঙ্গেরের জেলে। ছাড়া পেয়ে নদীপথে ফেরার সময়ে দুর্গা প্রতিমার বিসর্জনের দৃশ্য দেখে দুঃখিত হয়ে পড়েন। অঞ্জলি দেওয়া হল না। এরপরই জগদ্ধাত্রী পুজো করার জন্য মহারাজা স্বপ্নে নির্দেশিত হন বলে প্রচলিত শ্রুতি। সে ১৭৬২ সালের কথা। ওই বছর থেকেই কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু হয় বলে জানা যায়। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় যে জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন ঘটিয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। জগদ্ধাত্রী দেবী দুর্গারই আরেক রূপ।

পরে পুজোর আঙিনা প্রসারিত হয়। শুরু হয় বারোয়ারি পুজো। হুগলির চন্দননগর জগদ্ধাত্রী পুজোর আরেকটি বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে কালে কালে। এক সময় চন্দননগর ফরাসি উপনিবেশ থাকার সূত্রে হুগলি জেলার চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর সঙ্গে ফরাসিদের একটা সংযোগ রয়ে গিয়েছে, এখনো।

কলকাতায় এখন দুর্গাপুজোর বিসর্জনের কার্নিভাল আয়োজিত হচ্ছে। কৃষ্ণনগর ও চন্দননগরের শোভাযাত্রা-সহকারে জগদ্ধাত্রী প্রতিমার বিসর্জনের প্রক্রিয়া প্রকারন্তরে কার্নিভালই তো। ঐতিহ্যটা বহুকাল পেরিয়ে বহমান।

ক্লাব প্রতিভার প্রতিমা। ফটোঃ লেখক

কৃষ্ণনগরের কথায় আসি। বিসর্জনের কর্মকাণ্ডও বহুকাল ধরে লালিত ঐতিহ্য মেনে চলে। সকালে নদীতে ঘট ভাসানো হয়। ৮০-১০০ ‘বেহারা’ বা বাহক কাঁধে বাঁশ, খুঁটি ইত্যাদি দিয়ে তৈরি ‘সাঙ’ বা মাচায় প্রতিমা বহন করে। প্রতিটি প্রতিমার সাঙ রাজবাড়ির নহবতখানা ছুঁয়ে জলঙ্গী নদীর ঘাটে গিয়ে পৌঁছায়। তারপর নিরঞ্জন।

বিসর্জন দেখতে রাস্তায়, নদীর পারে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত ঘটে। দশমী ও তার পরের দিন অনেকটা সময় নিয়ে বিসর্জনের পর্ব সম্পূর্ণ হয়। সম্মিলিত সু-ব্যবস্থাপনার প্রশংশা প্রাপ্য বলে মনে হয়েছে ।

বিসর্জনের পথে। ফটো সৌজন্যঃ এইসময়

আর বিসর্জনে তো সমাপ্তি নয়, সে আগামীর আহ্বান-

হেডার ফটোঃ কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি। ফটো সৌজন্যঃ উইকিমিডিয়া কমনস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *