Follow us
Search
Close this search box.

সুন্দরবনের ছবিগুলি

সুন্দরবনের ছবিগুলি

লিখছেন শুভেন্দু মণ্ডল

বাঙ্ময় নৈঃশব্দ একটা। একটানা ঘুঘুর ডাক। বাতাসে নারকোল গাছের পাতার দুলুনির শব্দ। কান পাতলে সামনের পুকুরে বড় সাইজের জাপানি পুঁটির চকিত লাফের শব্দ শোনা যাচ্ছে। উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণে আদিগন্ত ধানের খেত। ফসল উঠেছে সদ্য। বাদামি রং ছড়িয়ে আছে দূর প্রান্ত পর্যন্ত। ফসলের মরসুমে রং বদলায় এইসব ধূ ধূ খেত। তখন চারিদিকে সবুজ আর সবুজ।

দৃষ্টি রাখলে রঙিন মাছরাঙার ছোঁ মেরে জলাভূমিতে নেমে আসতে দেখা যাচ্ছে। নানা জাতের মাছ আছে ওখানে। গতকাল গলদা চিংড়ি চোখে পড়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস। গত বছরের কথা। মিষ্টি রোদ্দুর। সামনেই গোমর নদী। পাঁচ মিনিট হেঁটে নদীর বাঁধে উঠে পড়া যায়। উত্তর থেকে মাঝে মাঝে হিমেল বাতাস বয়ে আসছে। শঙ্কর একটু আগে আরেক কাপ চা দিয়ে গেছে। একটা চেয়ার নিয়ে বসেছি রিসর্টের আলুর খেতের পাশে।

মানসচক্ষে ভেসে ওঠে ছবিগুলি। স্রোতের মতো টানে। এই শেষ শীতে বড় আরাম। ঠান্ডা জড়ানো মিষ্টি উত্তাপ। বসন্তের আগমনী শোনা যায়।

গল্পটা এরকম–আছি সুন্দরবনের সাতজেলিয়া দ্বীপের দয়াপুরে। গোমর নদীর পূর্ব তীরে এই সাতজেলিয়া দ্বীপটি গোসাবা ব্লকের অন্তুর্ভুক্ত।

শিয়ালদা থেকে ট্রেনে ক্যানিং। সেখান থেকে একটা গাড়ি রিজার্ভ করে সোনাখালি পেরিয়ে চলে এসেছিলাম গদখালি ফেরিঘাট। ক্যানিং থেকে গদখালি কমবেশি ২৯ কিলোমিটার। ক্যানিং স্টেশন থেকে বেরিয়ে গদখালির বাস পাওয়া যায়। স্টেশন থেকে আরেকটু এগিয়ে সোনাখালি হয়ে গদখালি যাওয়ার ট্রেকারের আড্ডা। টোটোয় সোনাখালি, সেখান থেকে টোটো পাল্টে গদখালি পৌঁছানো যায়। সরাসরি নিজেদের গাড়ি নিয়ে চলে আসা যায় গদখালি। গাড়ি রাখার নিরাপদ ব্যবস্থা আছে।

গদখালিতে অপেক্ষায় ছিল সুন্দরবন ডেল্টা রিসর্টের জলযান। পরিচয় হল সহ-ভ্রমণার্থীদের সঙ্গে। অধ্যাপক, প্রাক্তন অধ্যাপক, স্কুলশিক্ষক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা চলেছেন বিশ্বের বৃহত্তম বাদাবন তথা পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও ব-দ্বীপ (সামগ্রিক ভাবে) বেড়াতে। জুড়ে গিয়েছি আমিও। সব মিলিয়ে ১৫ জনের দল। সেই দলে চার-পাঁচজন কিশোর-কিশোরী রয়েছে। ওঁরাই তো সুন্দরবনকে নতুন করে আবিষ্কার করবে। সুন্দরবনের আরও কত রহস্য উন্মোচিত হবে। আমি একাই চলেছি। একাই বা কেন? সহযাত্রীরা রয়েছেন। এখন আমরা একই নৌকার যাত্রী।

জলযান দুলছিল মাতলা নদীর জলে। ভেসে যেতে চায়। টান পড়ছিল নোঙর বাঁধার রশিতে। বাঁধন খুলে বোট ছেড়ে দেওয়া হল। চালক এক ছোকরা। বোটের হুইলে তার আত্মবিশ্বাসী হাত। বোট চালায়, বাড়ির ছোটখাটো খেতে চাষের কাজ করে। গোসাবায় সকলে হ্যামিল্টনের বাংলো দেখতে গেল। আগে দু’বার গিয়েছি। সেই অবসরে ওই তরুণ সারেং আর তার সহকর্মীর সঙ্গে আলাপ জমালাম। বোটের হেঁসেলে রান্না চলছে জোরকদমে। সবাই ফিরে আসার পরে বোট ছাড়ল। চলন্ত বোটে বসল মধ্যাহ্নভোজনের জমজমাট আসর। নানা পদ। আঞ্চলিক ভেটকি মাছ।

গোধূলি লগনে বোট ভিড়ল গোমর নদীর কূলে, সাতজেলিয়ার দয়াপুর ফেরিঘাটে। নদীর ওপারে ঘন জঙ্গল। সজনেখালির জঙ্গল ওটা। রিসর্টের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন ফেরিঘাটে। ওরাই গাড়িতে চাপিয়ে সকলের মালপত্র আস্তানায় নিয়ে গেল। নদীর পারে একটা ছোট্ট বাজার। এই সন্ধ্যায় চা, সিঙ্গাড়া, জিলিপি। কিছু দোকান, আঞ্চলিক মানুষজনের আড্ডা। বেশ লাগল গঞ্জের বাজার।

সামান্য হাঁটাপথ। প্রবেশ করলাম সুন্দরবন ডেল্টা রিসর্টে। পরপর আলোকিত কটেজ। নতুন তৈরি হয়েছে। নানা গাছগাছালি। একটা পুকুর। সামনে আনেকটা খোলা জমি। রিসর্টের কর্ণধার ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক দুলাল মণ্ডল জেটিঘাটেই সকলকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।

বাজারের পথে আসার সময় গরম জিলিপি কিনে এনেছেন। চা আর সেই গরম জিলিপি পরিবেশিত হল। দুলালবাবু সব সময় তো থাকতে পারেন না, আমাদের এবারের ভ্রমণে ছিলেন। বোঝা গেল, সুন্দরবনের প্রেমে পড়েছেন। নিজস্ব একখানি বাড়িও আছে রিসর্ট থেকে খানিক দূরে। মূল আবাস দক্ষিণ কলকাতায়। এখানে এলে ওই বাড়িতেই থাকেন।

অনেক দূরে টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে। ওইদিকে দেখিয়ে দুলালবাবু জানালেন, ওইখানে আমার বাড়ি। মাঝে টানা লম্বা একটা জলা জায়গা। পাশে খেত। ওই জলা জমিটি রিসর্টেরই। শুনে একটু অবাক হয়েছিলাম। রাতে লম্বা টর্চ হাতে দুলালবাবু আমাদের নিয়ে গেলেন সেখানে। আকাশে চাঁদ ছিল। জল চকচক করছিল কোথাও কোথাও। ওখানেই টর্চের আলো ফেলে মাছের সাঁতার দেখালেন দুলাল স্যার। ইতিউতি কয়েকটি পাখি ডেকে উঠল। অসময়ে তাঁদের রাজ্যে মানুষের দল। বিরক্ত হওয়ারই কথা। জানা গেল রিসর্টের আওতাধীন জমির আয়তন ২০ বিঘা। ওই জলাভূমিতে হাত দেননি দুলালবাবু। মাছ, পাখি, প্রজাপতিদের জন্য ছেড়ে রেখেছেন।

পাকা পিলারের উপরে এক-একটা কটেজ। প্রত্যেকটি কটেজে দুটি করে ইউনিট। নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকে মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠল। প্রশস্ত ঘর। জানলা খুললে দূরে সেই টিমটিমে আলোকবিন্দু। ডবল বেডেড ঘর। প্রত্যেক কটেজের সঙ্গে রয়েছে খোলামেলা ব্যালকনি। এত বড় বাথরুম অনেক বড় হোটেলেও পাইনি। রাতে গরম ভাত, ডাল, আলুভাজা ইত্যাদির সঙ্গে দেশি মুরগির ঝোল।

আজ সকাল সকাল উঠে জলাভূমির পারের আলপথ ধরে খানিকটা হেঁটে এলাম। রিসর্টের বিশাল জমি সম্পর্কে একটা ধারণা হল। সোনালী রোদ্দুর বিছোল জলাভূমিতে, দিগন্তবিস্তৃত খেতে। জলে শালুক ফুটেছে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম বোটে জঙ্গল বেড়াতে যাব না। সেটা কয়েকবার তো হয়েছে। প্যাকেজ অনুসারে আজ সারাদিন জঙ্গল বেড়ানোর সূচি রয়েছে। নদী, খাঁড়িতে ভ্রমণ। কয়েকটি ওয়াচটাওয়ারে যাওয়া হবে। প্রাতরাশ ও মধ্যাহ্নভোজন বোটেই। তা হোক। এই গদখালি জায়গাটাই বেড়িয়ে দেখতে ইচ্ছে হল।

যাইহোক, মনোবাসনার কথা জানালাম সিদ্ধিনাথবাবুকে। রিসর্টের প্রাত্যহিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন। বললেন, থাকুন না, বাঁধের রাস্তায় বেড়িয়ে আসুন, আজ তো শনিবার, হাট বসবে, চাইলে যেতে পারেন। কিন্তু…, একটু থামেন সিদ্ধিনাথবাবু। তারপর বললেন, খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা সবই তো বোটে। সেখানে বড় ব্যবস্থা। আমরা এখানে কয়েকজন খাব, কিন্তু আপনার কি তা ভালো লাগবে, তাই ভাবছি।

আপনারা যা খাবেন তা-ই খাব, কিচ্ছু অসুবিধা নেই, বলি আমি।

বেরিয়ে পড়লাম। শঙ্কর পথ দেখিয়ে দিয়েছে। জলাভূমি আর খেতের মধ্যেকার আলপথ ধরে হাঁটা লাগালাম। এই শঙ্কর ছেলেটাকে যে-কোনও কাজেই দেখা যায়। খুব দায়িত্বশীল ছেলে। থেকে না গেলে সুন্দরবনের ভূমিপুত্র শঙ্করের সঙ্গে সঠিক পরিচয় হ’ত না, খেতে বসে সিদ্ধিনাথবাবুবাবুর গান, ক্রিকেটের কমেন্ট্রি শোনা হত না, অধ্যাপক মণ্ডলের খেতে বসে গাছ থেকে লেবু তুলে আনা দেখা যেত না।

রিসর্টের মূল গেটের উল্টোদিকের পথ ধরলাম, আলপথ। সে পথে পোকা ডাকে, ফড়িং, প্রজাপতি ওড়ে। জল থেকে ভেসে আসে মৎস্যপুচ্ছের ঝাপটার শব্দ। একটা রঙিন মাছরাঙাকে শূণ্য থেকে নেমে এসে জলে ছোঁ দিতে দেখলাম। রিসর্টের সীমানা পেরিয়ে বেশ চওড়া একটা খাল বরাবর বাঁধানো রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে বড় রাস্তায় পড়লাম। বড় রাস্তা মানে সাতজেলিয়া দ্বীপের মূন সড়কপথটি। বাজারের খানিক আগে ডানহাতি রাস্তা ধরে গোমর নদীর পারে চলে এলাম। উঠে এলাম বাঁধের রাস্তায়।

আলোকিত সকালের নদী। ওপারে ঘন জঙ্গল। বাঘের জঙ্গল। সজনেখালির ঘাটে পর্যটকদের বোটের ভিড় জমছে। ওখানকার বনদপ্তরের অফিস থেকে সুন্দরবনের নদী-খাঁড়িতে বেড়ানোর অনুমতি সংগ্রহ করতে হয়। জাহাজের আনাগোনা চোখে পডছে। অনেক জাহাজেই বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লার ছাই বোঝাই জাহাজগুলো বাংলাদেশের পথে ফিরছে। অনেক জাহাজ আসছেও। ওই ছাই থেকে ইট তৈরি হয়। বাঁধের রাস্তার অন্যদিকে আদিগন্ত ধানখেত। দু-চারটে বসতবাড়ি। হোটেল-রিসর্ট গড়ে উঠেছে। নানা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।

বাঁধ থেকে নেমে অন্য একটি রাস্তা ধরে চলে এলাম গদখালির বাজারে। বসলাম একটা চায়ের দোকানে। আঞ্চলিক মানুষজনের সঙ্গে আলাপ হতে থাকল। দুলালবাবুকে অনেকেই চেনে দেখলাম। দোকানে বেশ খাতির পেলাম। সাতজেলিয়া বেশ সম্পন্ন গ্রাম। অনেকে কলকাতায় চাকরি করেন। সপ্তাহান্তে গ্রামে আসেন। শিক্ষিতের হার বেশ ভালো। পুরনো স্কুল চোখে পড়েছে। পর্যটন অর্থনীতির বিকাশ ঘটছে দ্বীপটিতে। মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হচ্ছিল, উনি নদীতে মাছ ধরেন। লোকগান গাওয়াটা ছিল নেশা। এখন হোটেল-রিসর্ট থেকে ডাক আসে। সন্ধ্যায় বনবিবির পালার গান করেন সেখানে। নদী থেকে ধরা মাছ নিয়ে কেউ কেউ এখন হোটেল-রিসর্টে চলে যান। মাছের বাজারের এক দোকানি জানালেন, ভেটকি, কাঁকড়া এখন আর পড়ে থাকে না।

জানা গেল, আগে ওপারের জঙ্গল থেকে নদী সাঁতরে বাঘ চলে আসত এদিকের গ্রামে। বনদপ্তরের প্রচেষ্টায় এখন সেটা বন্ধ হয়েছে। গ্রামে শিয়াল আছে। খাটাস (সিভেট) আছে। চায়ের দোকানের মহিলা দোকানি জানালেন, বিকেল, সন্ধ্যায় হাঁস-মুরগি ছেড়ে রাখা যায় না। খাটাস ধরে নিয়ে যায়।

পাঁচ-ছ’জন বিদেশী পুরুষ-মহিলার একটা দলের আবির্ভাব ঘটল বাজার চত্বরে। আরেকটি রিসর্টে উঠেছে দলটি। রিসর্টের একজন কেয়ারটেকার ছিল দলটির সঙ্গে। জানা গেল, জার্মানি থেকে এসেছে এই দলটি। দিল্লি হয়ে কলকাতা। সেখান থেকে এই সাতজেলিয়া দ্বীপে। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভের অরণ্য বেড়াতে এসেছেন। শুধু জল-জঙ্গল নয়, এখানকার মানুষ এবং তাঁদের জীবনযাত্রা নিয়েও তাঁদের প্রবল আগ্রহ। হাই-হ্যালো বিনিময় হল ওঁদের সঙ্গে।

রিসর্টে ফিরলাম। স্নান সারা হতেই খাওয়ার ডাক পড়ল। আমার সঙ্গেই দ্বিপ্রাহরিক আহারে বসলেন দুলাল স্যার ও সিদ্ধিনাথবাবু। ডাল, সব্জির পরে এল মাছ। শঙ্কর পাতে মাছ দেওয়ার পরে সিদ্ধিনাথবাবু জিজ্ঞেস করলেন, খেয়ে বলুন কী মাছ। খেয়ে দেখলাম, দুর্দান্ত স্বাদ, একেবারে টাটকা মাছ। অনেকটা ভেটকির মতো, কিন্তু ভেটকি নয়। সিদ্ধিনাথবাবু জানালেন, এ মাছের আঞ্চলিক নাম দাঁতনে। এই সুন্দরবনের নদীতে মেলে কম পরিমাণে। দাঁতনের স্বাদ মুখে লেগে রয়েছে এখনো। বোটে আজ বিরাট খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। আমার প্রাপ্তিও কম নয়। রসনায় আবিষ্কৃত হল দাঁতনে আর জাভা মাছের স্বাদ।

রিসর্টের পুকুর থেকে সদ্য ধরা মাছ।

ফেরার পথে ক্যানিংয়ের মাছের বাজারে খোঁজ করেছিলাম মাছ দুটির। পাইনি। বিক্রেতারা জানিয়েছিল, যা ওঠে জালে, তা আঞ্চলিক বাজারগুলিতেই বিক্রি হয়ে যায়। দূরের বাজারে আসে না। সিদ্ধিনাথবাবু রিসর্টে আসা মাছওয়ালার কাছ থেকে সকালে ধরা এই দুই পদের মাছ কিনেছেন। না খাই যদি, তাই ট্যাংরা মাছের পদও ছিল।

খাওয়াদাওয়ার সেরে খানিক বিশ্রামের পরে হাটমুখো হওয়া গেল। তিন চাকার মোটরচালিত ভ্যানে চড়ে চলেছি। সুদূর-বিস্তৃত ধানের খেতের পাশ দিয়ে, মাঝে মাঝে লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি। দূরে একঝাঁক পখি উড়ল। ভ্যানের চালক জানাল, ওগুলো বালিহাঁস। ওর কথায় বোঝা গেল, শীতে পরিযায়ী পাখি আসে এখানে। আঞ্চলিক পাখি তো আছেই। সকালে একঝাঁক টিয়াপাখি দেখেছি রিসর্টের সবেদা গাছের ঝাড়ে।

বিকেলের হাট জমজমাট। স্থায়ী কিছু দোকান আছে হাট চত্বরে। প্রচুর লোকের সমাগম ঘটেছে। এই হাটের নাম ‘বুধের হাট’। বসে বুধ ও শনিবার। আঞ্চলিক শাক-সব্জি, গৃহস্থালীর নানা সরঞ্জাম, গরম গরম জিলিপি, চপ, চা। শনিবারের হাট জমজমাট। সাতজেলিয়া দ্বীপে উৎপাদিত চাল দেখা গেল। আঞ্চলিক আলু চোখে পড়ল। গাব ফলের কথা শুনেছি, প্রথম দেখলাম এই হাটে। এই গাব থেকে তৈরি আঠা ঘুড়ির মাঞ্জার মতো মাছ ধরার জালে ব্যবহার করা হয় জাল পোক্ত করার জন্য।

আরেকদিকে মাছ-মাংসের দোকান। মাংস বলতে চিকেনই প্রধাণত, প্রকৃতই দেশি মুরগিও চোখে পড়ল। সদ্য ধরা সব মাছ এসেছে। নদীতে ধরা মাছ। ২৫০ টাকা দরে যে দেশি ট্যাংরা কেনা হয়েছিল, কলকাতায় তার দাম ৫০০ টাকা কেজির নীচে হবে না। একটা বড় আড় মাছ দেখলাম। চিংড়ি কয়েক প্রকার। এক ঝুড়ি কাঁকড়া চোখে পড়ল। যে যেমন সংগ্রহ করতে পেরেছে নিয়ে এসেছে। একইরকম মাছ বেশি পরিমাণে পাওয়া যাবে না হাটে, তবে মাছের বৈচিত্র্য দেখা যাবে। মাছ চেনাও হয়।

চিংড়ি, ভেটকি, কাঁকড়া, সুন্দরবনের বহুব্যবহৃত আমিষ খাদ্য। সঙ্গে চিকেন। আর বর্ষায় ইলিশ। এ কথা বলতে হবে যে, ইলিশ পর্যটন বৃষ্টিতে সুন্দরবন ভ্রমণের প্রবণতা বাড়িয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের আঞ্চলিক মাছের বৈচিত্র্য এখনও অপামর ভ্রমণার্থীদের কাছে অধরা থেকে গেছে। আজ দাঁতনে খেয়ে এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে। গোধূলীর আলো পড়ল বড় বড় পুঁটি মাছের গায়ে। আমি একটা চায়ের দোকানে ঢুকলাম।

হাট থেকে রিসর্টে এসে দেখি সহ-ভ্রমণার্থীরা সদ্যই ফিরেছেন। ভালো বেড়িছেন ওঁরা। হাতে হাতে চায়ের কাপ ফিরছে। পরে জমল আড্ডা খাবার ঘরে। ঠান্ডা বাতাস। গরম জিলিপি, চা। হাসিঠাট্টা। গান।

দূরের সেই আলোকবিন্দুটি তিরতির করে কাঁপছে যেন। মনে মনে ঠিক করলাম বর্ষায় একবার আসতে হবে। এই খেত, জলাভুমি জুড়ে বৃষ্টিধারা দেখতে চাই। জঙ্গল, নদীর ওপর দিয়ে বয়ে আসা বৃষ্টির ঝংকার শুনতে চাই। বৃষ্টি মাথায় হাটে যাব।

সুন্দরবন ডেল্টা রিসর্টে যোগাযোগের নম্বরঃ ৯৩৩২৯ ৭৪১৩৩

সুন্দরবন ভ্রমণ-সংক্রান্ত আরও লেখা পড়তে পারেন এই লিঙ্কেঃ https://torsa.in/the-wonder-world-of-the-sundarbans/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *