Follow us
English

দার্জিলিং শহরের এখানে সেখানে, ঠেলায় পড়ে সান্দাকফু

দার্জিলিং শহরের এখানে সেখানে, ঠেলায় পড়ে সান্দাকফু

সেবার দার্জিলিংয়ে গিয়েছি একটু বিশ্রামের জন্যেই। শুয়ে, বসে, খেয়েদেয়ে, বই পড়ে, পাহাড়ি পথে পায়চারি করে ক’টা দিন কাটিয়ে দেব, এই মনোবাসনা। পুজোর সময়। প্রচুর পর্যটকের সমাবেশ ঘটেছে। অক্টোবর মাস। আবহাওয়া ভালোই। মাঝেমধ্যে দু’-এক পশলা বৃষ্টি হয় বটে, সে রোদ-বৃষ্টির দুষ্টুমি।

দার্জিলিংয়ের সর্বজনগ্রাহ্য মলের কাছাকাছিই একটি হোটেলে গেড়ে বসেছি। তবে একেবারে মলের ওপরেই নয় হোটেলটা। একটু হেঁটে যেতে হয়। পাড়ার রাস্তা দিয়ে যাই। রাস্তার দু’পাশে আঞ্চলিক মানুষজনের ঘর-গেরস্থালী। এই শর্টকাট রাস্তাটা আবিষ্কার করে নিয়েছিলাম। অন্যথায় মলে যাওয়ার ব্যস্ত রাস্তা নেহরু রোড হয়ে যেতে হয়। ওদিকে বেশ ভিড়। সাইটসিয়িংয়ের জন্য গাড়িচালকদের হাঁকডাক। আমি দার্জিলিংয়ের খাস আদমীদের জীবনযাত্রার টুকরো টুকরো নানা ছবি দেখতে দেখতে মলে যাই। দেখি, প্রায় প্রতি বাড়ির সামনেটা ফুলের টব দিয়ে সাজানো। আর অধিকাংশ বাড়ির সামনে একটা করে ঝুড়ি। তার মধ্যে কম্বল ইত্যাদির মতো গরম আচ্ছাদন। পরে লক্ষ্য করে দেখলাম রাতে পথের কুকুরগুলো ওই ঝুড়িগুলিতে আশ্রয় নেয়। ঠাণ্ডা অঞ্চলের মানুষ তো, অন্য প্রাণীর ঠাণ্ডার কষ্টটাও বোঝে।

আগে মলের পাশের ঘোড়ার আস্তাবলের সামনে মলের দিকে মুখ করা ছোট একটা রেস্তোরাঁ ছিল। পাশ দিয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্মারকগৃহ ‘স্টেপ অ্যাসাইড’ যাওয়ার সিঁড়ি নেমেছে। পাহাড়, বন, খাদ ইত্যাদির সঙ্গে মানানসই রেস্তোরাঁটি এখন আর নেই। বদলে বিরাজ করছে পরিচিত কাফে চেনের ঝকঝকে একটি শাখা।

সকালে ওই পুরনো রেস্তোরাঁটিতে যেতাম কোনও কোনও দিন। জায়গাটা আসলে একটা বাড়ির ছাদ। তার ওপর একদিকে কাঠ, কাঁচ দিয়ে ঘেরা মূল রেস্তোরাঁটি, বাকি অংশ রেলিংয়ে ঘেরা নিপাট ছাদ। এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু চেয়ার-টেবিল। বাড়িটা কয়েক’ তলার। পাহাড়ের ধাপে তৈরি। ছাদ ছাড়া পুরো বাড়িটাই চোখের আড়ালে, মলের দিক থেকে দেখলে। বাড়ির ছাদটি মলের সমান্তরালে। পুরো বাড়িটাই দেখা যাবে, উল্টোদিক অর্থাৎ খাদের দিক থেকে দেখলে। পাহাড়-অঞ্চলে অনেকেই এই ধাঁচের বাড়ি দেখেছেন এবং এমন বাড়িতে থেকেছেনও। তবুও বলা, পরিবেশ সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়ার জন্য।

ওই ছাদে একটি রঙিন ছাতার নীচে আমি। আকাশ একটু মেঘলা। কুয়াশা ঘণ হচ্ছে। খাদের ওপারে ধূপির জঙ্গলে মেঘ জমছে। টেবিলে এল ধোঁয়া ওঠা আলুপরটা, সঙ্গে আচার। মিহি মেঘে ছেয়ে যাচ্ছিল গোটা মল ও আশপাশটা। রেস্তোরাঁর এই ছাদেও একটু দূরের টেবিল-চেয়ার, রঙিন ছাতা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে। সোয়েটার, মাফলারে ভেজা ভেজা ভাব। চারপাশটা যেন একটা জলছবি এখন। মলে দাঁড়ানো দু’টো ঘোড়া চিঁহিঁহিঁহিঁ স্বরে ডাকছিল। খাদের মধ্যে থেকে এখন গলগল করে মেঘ উড়ছে। কফি দিতে এল নেপালি ছেলেটি; জিজ্ঞেশ করলাম, ঘোড়াগুলো এরকম ডকছে কেন ভাই? ঘোড়া দুটোর পানে এক ঝলক তাকিয়ে ছেলেটি বলল, “হস রহা হ্যায়”।

আকাশ হাসল। চিড়িয়াখানা থেকে ফেরার পথে। পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক। দার্জিলিংয়ের চিড়িয়াখানা। স্নো লেপার্ড, ব্ল্যাক লেপার্ড, ক্লাউডেড লেপার্ড, রেড পান্ডা, ব্লু শিপ, ট্র্যাগোপান, হিমালয়ান মোনাল ইত্যাদির সাক্ষাৎ পাওয়া যায় এখানে। কোনও কোনও দিন সকালের দিকটায় চলে আসি চিড়িয়াখানা চত্বরে।

পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক

চিড়িয়াখানার পাশেই বিশ্বখ্যাত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (এইচ এম আই)। ভালো লাগে এখানকার সামগ্রিক পরিবেশটা। আর আমার বিশেষ আকর্ষণ এখানকার মিউজিয়ামটি। বিখ্যাত সব পর্বতারোহীদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম, ফটোগ্রাফ, নথিপত্র ইত্যাদি সংরক্ষিত আছে সংগ্রহশালায়। যে-সব সরঞ্জাম নিয়ে এডমন্ড হিলারি আর তেনজিং নোরগে এভারেস্ট শীর্ষে পৌঁছেছিলেন তা এখনকার সাজ-সরঞ্জামের সঙ্গে তুলনায় সেগুলোকে নেহাতই প্রাগৈতিহাসিক বলে মনে হবে।

হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট

জর্জ ম্যালরির ফটোটির দিকে চোখ চলে যায় বারবার। স্বপ্নমাখা এবং তীক্ষ্ন দৃষ্টির দুটি চোখ। ১৯২৪ সালে ব্রিটেনের জর্জ ম্যালরি এবং আ্যান্ড্রু আরভিন এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। পর্বতারোহণের ইতিহাসে বিষয়টি একটি প্রশ্নচিহ্ন হয়ে থেকে গিয়েছে। ১৯৯৯ সালে ম্যালরির দেহটি খুঁজে পাওয়া যায় এভারেস্টের উত্তর-পূর্ব গিরিশিরায়। যে জায়গাটিতে ম্যালরির দেহ ও কিছু সরঞ্জাম খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, সেখান থেকে মারত্মক খাড়াই পথে এভারেস্ট শীর্ষ ৮০০ ফুট। অ্যান্ড্রুর দেহটি নিখোঁজই থেকে গেছে। প্রশ্ন হল, এভারেস্টে ওঠার পথে নাকি এভারেস্ট শীর্ষে ওঠার পরে নেমে আসার পথে ম্যালরি ও অ্যান্ড্রুর মৃত্যু হয়েছিল? প্রশ্নটির নির্দিষ্ট উত্তর নেই। উত্তরটির গুরুত্ব এইখানে যে, যদি প্রমাণ মেলে এভারেস্ট শীর্ষ থেকে নেমে আসার পথেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল, তবে প্রথম মাউন্ট এভারেস্ট শীর্ষে ওঠার কৃতিত্বটি আর এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের দখলে থাকে না। হিলারি ও নোরগে মাউন্ট এভারেস্ট উঠেছিলেন ১৯৫৩ সালে।

সকালে কখনো মল রোডের কোনও চেয়ারে গিয়ে বসি।। অবজার্ভেটরি হিল বা মহাকাল মন্দিরের পাহাড়টিকে বেড় দিয়ে মল রোড। এখন রাস্তাটির নাম হয়েছে ভানুভক্ত সরণী। সার্কুলার রোড। ইংরেজ আমলে এ রাস্তায় হাঁটতেন, জগিং করতেন বড় বড় সাহেব, মেমরা। রাস্তাটির দু’টি মুখ মিলিত হয়েছে মলের দু’ প্রান্তে, ভানুভক্ত আচার্যর মূর্তীর দু’ ধারে। এখন আঞ্চলিক বাসিন্দারা মর্নিং ওয়াক করেন। মল রোডের একপাশে গভর্নর হাউস। হাউস মানে প্রাসাদ। ব্রিটিশ আমলে বড়লাটরা কলকাতার গরম এড়াতে গ্রীষ্মে এই প্রাসাদে এসে থাকতেন। ১৮৭৭ সালে কোচবিহারের মহারাজার কাছ থেকে প্রাসাদটি কিনেছিল ব্রিটিশরা। এখনো পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালেরা গ্রীষ্মের কয়েক দিন কাটিয়ে আসেন দার্জিলিংয়ের এই গ্রীষ্মাবাসে।

মহাকাল মন্দির

মলের পশ্চিম প্রান্তে মল রোডের বাঁ-হাতি রাস্তাটি ধরে সোজা আড়াই কিলোমিটার হাঁটলে চিড়িয়াখানা ও এইচ এম আই চত্বর। পথে পড়বে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ। ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। সন্ধ্যায়, রাতে চিড়িয়াখানা-এইচ এম আই যাওয়ার এই রাস্তা থেকে দার্জিলিংয়ের আলোকপুঞ্জ এক অসাধারণ দৃশ্য রচনা করে।

সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ।

ওই যে, মলের উত্তর প্রান্তে স্টেপ অ্যসাইড, তার পাশ দিয়ে নেমে গেছে একটি ঢালু রাস্তা। ওটা ভুটিয়া বস্তি যাওয়ার রাস্তা। একদিন নামতে থাকলাম ওই রাস্তা ধরে। নামছি তো নামছিই। রাস্তার পাশে ফুলে ছাওয়া সুন্দর সব বাড়িঘর। রাস্তায় ক্যারাম খেলছে ছেলেরা। মেয়েরা দু’হাতে জলের বালতি নিয়ে খাড়াই পথে উঠে আসছে। ওই পথ ধরে আরও খানিকটা নামতে বাঁ-দিকে চোখে পড়ল একটি মনাস্ট্রি। গুটি গুটি মনাস্ট্রির আঙিনায় গিয়ে দাঁড়ালাম। মনাস্ট্রির মূল গেটটি বন্ধ। বাইরে থেকে ঘুরেফিরে দেখছিলাম। এক বৃদ্ধ লামা এসে দাঁড়ালেন সামনে। “আইয়ে”, মৃদু স্বরে বললেন তিনি। চললাম তাঁর পিছু পিছু। মনাস্ট্রির দরজা খুলে দিলেন তিনি।

ভুটিয়া বস্তির মনাস্ট্রিতে লামার সঙ্গে। ছবি : লেখক

তিব্বতী ও সিকিমিজ স্থাপত্য ঘরানার মিশেলে তৈরি মনাস্ট্রির মধ্যে কেমন একটা গোধূলি-রঙা আবহাওয়ায় প্রাচীণ দেওয়ালে নানা চিত্র, নানা রঙ, কত মোটিফ। কিছু কিছু সোনার কারুকাজও চোখে পড়বে। অনেক কিছুই তিব্বত থেকে এসেছে। সেই গোধূলী আলোয় কী এক গভীর নীরবতার মধ্যে মগ্ন হয়ে আছে জায়গাটা। বৃদ্ধ লামা নীম্নকন্ঠে এটুকু-সেটুকু বলছেন। ইতিমধ্যে একটি তরুণ ও একটি তরুণী কখন যেন আমার একটু পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন।

ঝমাঝম, ঝম ঝমাঝম, একটা বাজনার তাল কানে আসছে। একটু থেমে থেকে লামা যা বললেন তার মর্মার্থ হল, বিয়েবাড়ির শোভাযাত্রা আসছে। বরকনে-সহ বেশ কিছু লোকজনের সমাগম ঘটল মনাস্ট্রি চত্বরে। নবদম্পতি আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে এসেছেন। লামার কাছ থেকে জানা গেল, শুধু বৌদ্ধ ধুর্মাবলম্বীরাই নন, হিন্দুরাও আসেন এরকম নানা অনুষ্ঠানে, মনাস্ট্রিতে প্রার্থনা করেন।

লামা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি মনাস্ট্রির পিছন দিকটায় এসে দাঁড়ালাম এবং হতবাক হয়ে পড়লাম, ঝকঝক করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। মনাস্ট্রি চত্বর থেকে কী যে সুন্দর লাগছিল সে দৃশ্য।

মুখে মুখে নাম ভুটিয়া বস্তি মনাস্ট্রি। প্রকৃত নাম কর্মা দর্জি চোলিং মনাস্ট্রি। এখন যেখানে মহাকাল মন্দির, আগে সেখানেই ছিল এই মনাস্ট্রি। ১৭৮৮ সালে নেপালি সেনাদের আক্রমণে ধ্বংস হয় সেই মনাস্ট্রি। এরপর ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পিঠটান দেয় নেপালি হানাদারেরা। নতুন করে ওই মনাস্ট্রি তৈরি হয় ভুটিয়া বস্তির বর্তমান জায়গাটিতে ১৮৬০ সালে। ১৯৩৪-এর ভূমিকম্পে মারত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই মনাস্ট্রি। আবার নতুন করে তৈরি হয়। স্থান পরিবর্তন, নতুন করে গঠন ইত্যাদির পরম্পরা গণনা করলে, ভুটিয়া বস্তির এই মনাস্ট্রিই দার্জিলিং অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো মনাস্ট্রি।

উঠে আসার পথে আলাপ হল ওই তরুণ-তরুণীর সঙ্গে। ওঁরা কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোরে থাকেন। তরুণী বাঙালী, তরুণ দক্ষিণ ভারতীয়। বন্ধু ওঁরা। এক গাড়িচালকের কাছ থেকে খবর পেয়ে ওঁরা এই মনাস্ট্রি দেখতে এসেছিলেন। মনে মনে তারিফ করি ওঁদের কৌতূহল ও উদ্যমের। সাধারণত ভ্রমণার্থীরা এখানে আসেন না। তথ্যের অভাব ও ফেরার সময়ে চড়াই পথ ধরে ওঠার অসুবিধা এর কারণ হতে পারে। প্রসঙ্গত, ‘বরফি’ সিনেমার খানিকটা শ্যুটিং হয়েছিল এই ভুটিয়া বস্তিতে। তারপর ভুটিয়া বস্তিতে খানিকটা পদচারণা করে আসার একটা ধুম পড়েছিল কিছু পর্যটকের মধ্যে, সেটা চলেছিল কিছুদিন।

বিকেল, সন্ধ্যায় মলে যাতায়াতের রাস্তা নেহরু রোডে পর্যটকদের উচ্ছসিত ভিড়। কেভেন্টারস, গ্লেনারিজে রসিকজনের জমায়েত। মহাকাল মন্দিরের নীচের রাস্তায় ভুটিয়াদের শীতবস্ত্রের বাজারও জমজমাট। আমি হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই লোয়ার বাজার বা চক বাজারে। মল এলাকা থেকে মিনিট ১৫ সময় লাগে। একটা শর্টকাট রাস্তাও আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম। পাহাড় ঢালের পাড়ার মধ্যে দিয়ে সেই রাস্তা। চায়ের দোকান, ছাংয়ের (আঞ্চলিক মদ) ঠেক, রান্নাঘরের দেওয়ালে শুকনো মোষের মাংসের চেন, এসব দেখতে দেখতে নেমে যাই। অসুবিধা হয়নি কখনো।

চকবাজার ব্যস্ত সকাল বিকেল। আঞ্চলিক মানুষের ভিড় সেখানে। সাজানো গোছানো নয় মোটেই জায়গাটা। ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, রাস্তায় প্রচুর গাড়ি, হৈ চৈ। সাংসারিক প্রয়োজনের সবকিছুই পাওয়া যায় এই বাজারে। সব্জির বাজারটিতে আমার বিশেষ আকর্ষণ। গাছ থেকে সদ্য তুলে আনা স্কোয়াশ, রাইশাক, তাজা গাজর, বড় আকারের পাহাড়ি শশা, টমেটো, লাল রঙের গোলাকার প্রচণ্ড ঝাল লঙ্কা যার আঞ্চলিক নাম ডালে খুরশানি, সব মিলিয়ে রঙের কী বাহার সে বাজারে।

চকবাজার থেকে কখনো বা হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই লাডেন-লা রোডের রিঙ্ক মলে। এখানেই রয়েছে নাথমুল্লাস টি কোজি। প্রকৃতই দার্জিলিং চা পাওয়া যাবে এখানে। বহু রকমের চা পাওয়া যায় বহু পুরনো এই টি শপে। এখানে বসে পছন্দের চা খাওয়া যায়। কিনে নিয়েও আসা যায়। ১৯৩১ সাল থেকে চলছে নাথমুল্লাসের চা পরিসেবা। কয়েক বছর আগে চৌরাস্তা মলেও নাথমুল্লাসের একটি আউটলেট খুলেছে।

একদিন দেখলাম, একদল তরুণ জড়ো হয়েছে মলে,ভানুভক্ত আচার্যর মূর্তির সামনে। গুটি গুটি এগিয়ে গেলাম সেই জটলার কাছে। পেছনের দেওয়ালে একটি ব্যানার টাঙানো হল, ব্যানারের শীর্ষে লেখা রয়েছে, ‘স্যাক্রিফাইস অফ লাইফ ফর টিবেট’। লেখাটির নীচে বেশকিছু মুখের ছবি। কোনও কোনও ছবির জায়গা ফাঁকা। নাম লেখা আছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে মৃতের ছবি সংগ্রহ করা যায়নি। দাঁড়িয়েছিলাম। ওঁরা মোমবাতি জ্বালাচ্ছিল। এক যুবক ইশারায় আমি একটি মোমবাতি নিতে চাই কিনা জানতে চাইলেন। আমি একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলাম। চিনের কবল থেকে তিব্বতের মুক্তির পক্ষে এঁরা। স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন যাঁরা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ছোট্ট অনুষ্ঠান ছিল এটি।

ছবি : লেখক

দার্জিলিং পৌঁছানোর পর এ পর্যন্ত একমাত্র লেবং কার্ট রোডে যাতায়াত ছাড়া আর গাড়িঘোড়ায় উঠিনি। শুরুতেই বলেছি, ছোটাছুটির কোনও পরিকল্পনা ছিল না এবারের দার্জিলিং ভ্রমণে। শুয়ে-বসে, একটু এদিক-সেদিকে হাঁটাহাঁটি করে সময় কাটাব, এটাই তো ভেবে রেখেছিলাম।

একদিন হঠাৎ বৃষ্টি নামল। দৌড়ে ঢুকে পড়লাম অক্সফোর্ড বুক শপে। অক্সফোর্ড বুক অ্যান্ড স্টেশনারি কোম্পানি,আসল নাম। ৬০ বছরের বেশি বয়স এই বই বিপণীর। এ বই সে বই দেখতে দেখতে জ্যাক কেরুয়াক-এর ‘অন দি রোড’ বইটি পেয়ে গেলাম। বইটির কথা জানি, কিন্তু পড়া হয়ে ওঠেনি। ভ্রমণের সঙ্গে আত্মজীবনীর মেলবন্ধনে এক নতুন আঙ্গিকে লেখা ‘অন দি রোড’-এর লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে পৃথিবীব্যাপী। বইটির উল্লেখ এই কারণে যে, ‘অন দি রোড’-ও আমার খানিকটা সময় নিয়ে নিতে থাকল। মনে আছে লেবং রেসকোর্সের (এখন আর রেসকোর্স চালু নেই) কাছে একটা জায়গায় বসে বেশ মৌজ করে বইটি পড়েছিলাম বেশ খানিকক্ষণ। শুধু তো বইয়ে চোখ রাখা নয়, আশপাশটাও দেখা সেই সঙ্গে। লেবং একটা উপত্যকা। দার্জিলিং শহর থেকে ১০০০ ফুট নীচে লেবংয়ের অবস্থান। মল থেকে দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। লেবং থেকে দার্জিলিং শহরটাকে খুব সুন্দর দেখায়। ইংরেজরা লেবংয়ে একটি রেসকোর্স গড়েছিল। এখন সেটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীন এলাকা। অনুমতি নিয়ে ভিতরে ঢুকতে পারলে পরিষ্কার দিনে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দারুণ ভিউ পাওয়া যায়। টাইগার হিল থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়ে কম কিছু নয়। লেবং উপত্যকার বাদামতাম চা-বাগানটি উপত্যকার সৌন্দর্যে সূক্ষ্ম মাত্রা যোগ করেছে।

লেবং

একদিন বিকেলে গিয়েছিলাম ঘুমে। ঘুম মনাস্ট্রিতে আগেও গিয়েছি। আবারও গেলাম। ঘুমের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলাম। রাত হয়ে গিয়েছিল। খুব ঠাণ্ডা সেদিন। স্টেশনে বিশ্রামরত টয়ট্রেনের ইঞ্জিনের গা বেয়ে জল ঝরছে দেখলাম। ঘণ কুয়াশায় ছেয়ে আছে চারিদিক। কয়লার ইঞ্জিনের তপ্ত শরীরটা জুড়োচ্ছে। এক সহৃদয় নেপালি ব্যক্তি সেদিন রাস্তায় আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাঁর গাড়িতে তুলে নিয়ে দার্জিলিং পর্যন্ত লিফট দিয়েছিলেন।

ঘুম মনাস্ট্রি

মলে দাঁড়ালে খাদের ওপারে যে-সব ঘরবাড়ি দেখা যায়, একদিন রাস্তার খোঁজ করে করে গেলাম সে-পাড়ায়। সম্পন্ন এলাকা। দুর্গাপুজোর মণ্ডপ একটা পড়ল পথে। দু’ তিনজন লোক তদারকির কাজের মধ্যে রয়েছেন। প্রধাণত নেপালি মানুষজন এই দুর্গাপুজোর পৃষ্ঠপোষক। আলাপ হল কোট পরিহিত পেটানো চেহারার এক পৌঢ়ের সঙ্গে। গোর্খা রেজিমেন্টে ছিলেন। দুটো যুদ্ধে দেশের হয়ে লড়েছেন। সকালের খাওয়া হয়েছে কিনা জিজ্ঞেশ করলেন। “না” বলায় সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন পাড়ার একটা খুবই সাধারণ দোকানে, সেখানে নানা কিছু বিক্রি হয়, মোমো, থুকপাও পাওয়া যায়। দোকানী এক তিব্বতী মহিলা। দুই বোল থুকপার অর্ডার দিলেন ভদ্রলোক। বিভিন্ন জায়গায় থুকপা খেয়েছি। কিন্তু এই সকালের ধোয়াঁ ওঠা থুকপা যেন সবাইকে ছাপিয়ে গেল। হয়তো আতিথেয়তার উষ্ণতায় খাদ্যের স্বাদ আরও বেড়েছিল। খাবারের দাম দিতে যেতেই একটা গর্জন ছাড়লেন পৌঢ়। একে গোর্খা, তার উপর প্রাক্তন সেনা। আমি থেবড়ে বসে পড়েছিলাম।

পাঁচদিন হল দার্জিলিং এসেছি। মোট ৮ দিনের জন্য হোটেল বুক করা আছে। নানা কৌতূহলী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যেমন, “চার দিন হয়ে গেল, সাইটসিয়িং হয়নি”? “টাইগার হিল থেকে আজ সানরাইজটা মিস করলেন মশাই”। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা-সহ কেউ বা বলেন, “আপনি লাকি মশাই, ছোটাছুটি নেই, ব্যস্ততার মধ্যেই তো দিনগুলো কাটে, বেড়াতে এসেও সেই ব্যস্ততা, কাঁহাতক পারা যায়, তবে বেড়াতে এসে ঘরকুনো হয়ে থাকাটাও কাজের কথা নয়”। এমন অনেক মন্তব্য শুনতে হয়। একদিন এক মহিলা, একই হোটেলের আবাসিক আমরা, সন্ধ্যার পরপর, হোটেলে ফিরেছি সবে, জিজ্ঞেশ করলেন, “কোথা থেকে ঘুরে এলেন দাদা? আমাদের একটু টিপস দিন না”। মহিলার স্বামীজি দেখলাম মুখ টিপে হাসছেন। “সব্জির বাজারে গিয়েছিলাম”, বলি আমি। ভদ্রলোকের টিপটিপে হাসি থামে। মহিলার মুখে বিষ্ময়, “আপনি কি নিজে রান্না করে খাচ্ছেন”, প্রশ্ন করেন ভদ্রমহিলা। “আমাদের এখানে গেস্টদের জন্য রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, উনি বাজার দেখতে গিয়েছিলেন”, আমার বদলে উত্তর করে হোটেলের তরুণ ম্যানেজার। আসলে এই নিয়ে চতুর্থবার দার্জিলিং আসা। দার্জিলিং শহরকে কেন্দ্র করে সাইটসিয়িং বলতে যা যা বোঝায় সেগুলো আগেই দেখে নেওয়া হয়েছে। এবার হেঁটে হেঁটে বেড়াচ্ছি। দেখছি আঞ্চলিক জীবনজাত্রার নানা চিত্র। ভালোই তো লাগছে।

একদিন রাতে বাইরে থেকে ফিরেছি সবে হোটেলে। ম্যানেজার ছেলেটি ডাকল। এক কানে ইয়ার রিং পরা এই তরুণ ম্যানেজারটির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে খুব নিশ্চিন্ত বোধ করতে পারিনি। পরে আমার সেই অসার বোধ ধোপে টেকেনি। ওঁর নামটি এখন আর মনে নেই। ছেলেটি তাঁর কাজে তৎপর। প্রয়োজনে চটজলদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কলকাতার দমদম অঞ্চলের ছেলে, যতদূর মনে পড়ে। ওঁর আরেকটা গুন হল, নেপালি ভাষাটা বলতে পারে চমৎকার। সে-কারণে, আঞ্চলিক মানুষজন, গাড়িচালকদের সঙ্গে ছেলেটির যোগাযোগ বেশ ভাল।

“দাদা, একটা জায়গায় যাবেন? যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে আমি ব্যবস্থা করে দেব।” স্যার থেকে দাদা হয়েছি তরুণ ম্যানেজার ছেলেটির কাছে এবং তাতে আমার ভালো লেগেছে। “কোথায় যাওয়ার কথা বলছ, আর বেশ তো আছি, যাবই বা কেন”? জিজ্ঞেশ করি আমি। “যাবেন সান্দাকফু, আর আপনার হাতে এখনো তিন দিন সময় আছে। এই যে অন্যেরা জানতে চায় কোথায় কোথায় সাইটসিয়িং করলেন, ফিরে এসে বলবেন, সান্দাকফু বেড়িয়ে এলাম, সব হাঁ হয়ে যাবে”। ওঁর মনোভাবটা বুঝতে পেরে হেসে ফেলি। এই যে আমার দার্জিলিং শহরের মধ্যে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো, প্রচলিত সাইটসিয়িংয়ে না যাওয়া এবং তা নিয়ে নানা জনের নানা প্রশ্ন, মন্তব্য ইত্যাদি ছেলেটির হয়তো ভাল লাগেনি। ভাইয়ের মতোই দাদাকে জিতিয়ে দিতে চায় সে। “তোমার মাথা খারাপ হয়েছে, সান্দাকফু ট্রেক করার মতো আর সময় আছে? প্রস্তুতিরও একটা ব্যাপার আছে, উঠলো বাই তো সান্দাকফু যাই, এমন হয় নাকি,” আত্মরক্ষার্থে আর্ত কণ্ঠে বলি আমি।

“আপনি চাইলে সম্ভব, দাঁড়ান মাস্টারজিকে ফোন করি”। আমার আপত্তির তোয়াক্কা না করে কোনও এক মাস্টারজিকে ফোন করে ম্যনেজার ছেলে। পরদিনই মাস্টারজির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। মাস্টারজির বসবাস মানেভঞ্জনে। আঞ্চলিক একটি স্কুলের প্রিন্সিপাল। সান্দাকফু, ফালুট-সহ সিঙ্গালীলা গিরিশিরার নানা রুটে ট্রেকিংয়ের আয়োজন করে থাকেন মাস্টারজি। আভিজ্ঞ মানুষ। এক-কথার মানুষও বটে। মাস্টারজির খবর অনেক দিন নেওয়া হয় না। এ কাজটি তিনি এখনো করছেন কিনা জানা নেই।

কীসব কথা হল ওঁদের মধ্যে। “টাকা-পয়সার ব্যাপারে বুদ্ধিমানের মতো গুটি কয়েক প্রশ্ন করল ছোকরা, মানে ভাইটি আমার। তারপর কার্যত নির্দেশের মতো বলে চলল, “একটা ব্যগ গুছিয়ে নিন। ভারী করবেন না। সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে নীচের জিপ স্ট্যান্ডে চলে যাবেন। ওখান থেকে মানেভঞ্জন যাওয়ার শেয়ার গাড়ি পাবেন। মানেভঞ্জনে নেমে মাস্টারজির অফিসে চলে যাবেন, যে-কেউ দেখিয়ে দেবে। মাস্টারজি বাকি ব্যবস্থা করে দেবেন। আপনি ল্যান্ড রোভারে যাবেন। কাল দুপুরে সান্দাকফু পৌঁছে যাবেন। ফালুট হচ্ছে না। গাড়ি আরেকটি ট্রিপের জন্য বুক করা রয়েছে আগে থেকে। সান্দাকফুতে হোটেলে থাকা-খাওয়ার খরচ আপনার। হোটেলের ব্যাপারে আপনার ড্রাইভার-কাম-গাইড হেল্প করবে। ওর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ও-ই করে নেবে। পরশু দিন ওখান থেকে খেয়েদেয়ে গাড়িতে উঠবেন। পরশু সন্ধ্যা নাগাদ হোটেলে পৌঁছে যাবেন। লকারে বাকি জিনিসপত্র রেখে যাবেন। গেস্ট পেলে আপনার ঘর ভাড়া দিয়ে দেব। আপনার একদিনের ভাড়া লেস হয়ে যাবে। আর যে-কোনও একটা ঘর তো আপনি পেয়ে যাবেনই”।

আমি আবাক হয়ে চেয়ে থাকি ছেলেটির মুখের দিকে। শুধু এইটুকু বলতে পারি, “ঘরটা বদল কোরো না, ভাড়া দিয়ে দেব”। “সে দেখা যাবেখন”, মুচকি হাসে ও, বুঝে ফেলেছে ধরা পড়েছি জালে। এই ধরা পড়াটা বন্দীত্ব নয়। বরং উল্টোটাই সত্যি। খরচ ইত্যাদি যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করেছে ম্যানেজার সাহেব। তার প্রমাণ পেয়েছি নানাভাবে। এই হোটেলে আমি যে ঘরটিতে থাকছি তার চওড়া জানলা দিয়ে পাহাড়ের বিস্তৃত সবুজ ঢাল দেখা যায়। সেই পাহাড়-ঢালে সত্যি সত্যিই মেঘের দল গাভীর মতোই চরে বেড়ায়। জানলার সামনে একটা বই আর এক কাপ চা বা কফি নিয়ে বসলে কোথা দিয়ে সময় কেটে যায়। তাই ফিরে এসে যতক্ষণ থাকব, ওই ঘরটিতেই থাকতে চাই।

সান্দাকফু

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে যুদ্ধজয়ী ম্যানেজারকে জিজ্ঞেশ করলাম, “তুমি গেছ সান্দাকফু”? “তিনবার, দু’বার ট্রেক করে, একবার ল্যান্ড রোভারে ড্রাইভারের সঙ্গী হয়ে। আবার যাবো, মানে ইচ্ছে আছে”।
“বাঃ”। আমি উপরে উঠে আসি।

সামান্য কিছু গোছগাছ, সে-সব সারা হল। সকালে কিছু শুকনো খাবার কিনে নেওয়া যাবে। তারপর নীচের জিপ স্ট্যান্ডে যাব। সেখান থেকে মানেভঞ্জন, সেখান থেকে সান্দাকফু।

ঝাঁকিদর্শনে সান্দাকফুর কথা পরের পর্বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *