Follow us
English

হেনরিজ আইল্যান্ড, সঙ্গে বকখালি-ফ্রেজারগঞ্জ

হেনরিজ আইল্যান্ড, সঙ্গে বকখালি-ফ্রেজারগঞ্জ

হেনরিজ আইল্যান্ড:

দক্ষিণে বকখালি, পশ্চিমে ফ্রেজারগঞ্জ, পুবে বঙ্গপোসাগর, এই চৌহুদ্দির উত্তর-পূর্বাংশে হেনরি আইল্যান্ড বা হেনরিজ আইল্যান্ডের অবস্থান। উনিশ শতকের শেষদিকে হেনরি সাহেব যখন এই অঞ্চলে সার্ভে করতে গিয়েছিলেন, তখন অঞ্চলটি জুড়ে ম্যানগ্রোভের ঘন জঙ্গল। বুনো শুওর, হরিণ, মেছো বিড়াল, সাপখোপের আপনভূমি। দেখা যেত বাঘও। হেনরি সাহেবের নামানুসারেই পরে ভূখণ্ডটি হেনরি আইল্যান্ড নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

এখন অবশ্য বন্য জীবজন্তুর সে রমরমা নেই হেনরি আইল্যান্ডে। তা বলে প্রাণের অভাব নেই এখানে। পাখি আছে নানা কিসিমের। শুধু মাছরাঙাই কতরকমের।

মেছো বিড়াল চোখে পড়ে। বুনো শুয়োর আছে সৈকত তীরের জঙ্গলে। সৈকত লাল কাঁকড়ার বিচরণভূমি। আর আছে মাছ। বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে মৎস্য প্রকল্প। বিরাটাকার অনেকগুলো জলাশয়ে রুই কাতলা ভেটকি ভাঙ্গড় ট্যাংরা প্রভৃতি মাছের চাষ হয়। জলাশয়গুলোর ওপর দিয়ে বয়ে আসা বাতাসে প্রাণ জুড়োয়।

পশ্চিমবঙ্গ মৎস বিভাগের উদ্যোগে হেনরিজ আইল্যান্ডের এই মৎস প্রকল্প এলাকার মধ্যে গড়ে উঠেছে প্রকৃতি পর্যটনের ব্যবস্থা। একের পর এক জলাশয়। তার ধার দিয়ে দিয়ে হেঁটে বেড়াতে পারেন। সকালে মাছধরা দেখতে পারেন।

কাঠের একটি সেতু পেরিয়ে চলে যেতে পারেন সাদা বালির ধূ ধূ সৈকতে।

সেই সেতুর দু’পাশে রয়েছে নানা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের সমাবেশ। সৈকতের ধার বরাবর সেই জঙ্গল চলে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত। একটি ওয়াচটাওয়ার রয়েছে সৈকতে, তার উপর থেকে সমুদ্রে সূর্যোদয়ের দৃশ্য খুব সুন্দর।

সৌজন্যে bedouinsdiary.com

হেঁটে বেড়ান সৈকতে, মৎস প্রকল্পের জলাশয়গুলোর ধার দিয়ে দিয়ে। জলে ঘাই দেবে বড় মাছ। উড়ে যাবে পানকৌড়ির ঝাঁক। হঠাৎ হঠাৎ আবিষ্কার করবেন গোল্ডেন প্লোভার বা হোয়াইট ওয়াগটেল বা সি ঈগল। বর্ষায় বিরাট বিরাট জলাশয় ওপর অঝোরে বৃষ্টিপাত আরেক সৌন্দর্য রচনা করে।

বিশ্রামের জন্য হেনরিজ আইল্যান্ড আদর্শ। হেনরিজ আইল্যান্ড থেকে বকখালি ৫ কিলোমিটার, ফ্রেজারগঞ্জ ৭ কিলোমিটার। সময় করে বেড়িয়ে আসতে পারেন।

 

বকখালি-ফ্রেজারগঞ্জঃ

হেনরিজ আইল্যান্ড বেড়াতে গেলে বকখালি সৈকতে গিয়ে একবার দাঁড়াতেই হয়। হেনরিজ আইল্যান্ড থেকে বকখালি ৫ কিলোমিটার। বকখালি থেকে আরেক সৈকত ফ্রেজারগঞ্জ ২ কিলোমিটার। বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জ মিলিয়ে সেই সৈকত অন্তত ৭ কিমি দীর্ঘ। বকখালি সৈকত সদাব্যস্ত। বহু মানুষ দিনে দিনে বকখালি বেড়িয়ে বাড়ি ফেরেন। থাকার জন্য হোটেল-লজও প্রচুর।

বকখালির সৈকত মাটি-মিশ্রিত। সমুদ্রে নামতে গেলে এখানে সেখানে কাদা। স্নান করতে গেলে বরং ফ্রেজারগঞ্জের দিকে চলে যাওয়া ভালো। শুধু সৈকতের প্রশ্নই যদি ওঠে , তবে এটা বলতেই হয় যে, ফ্রেজারগঞ্জ-সংলগ্ন সৈকত গুণমানে উন্নত। সমুদ্রে নেমে অনেকটা পর্যন্ত বালি পাওয়া যায়।

রাতে বকখালি সৈকত অনেকটা জুড়ে আলোকিত। বেলাভূমির এই প্রবেশপথ-সংলগ্ন অঞ্চলটি জুড়ে নিত্যদিনের মেলা। চা-কফি, ঠাণ্ডা পানীয়, ঝালমুড়ি, ফুচকা, মাছভাজার অভাব হবে না। খাওয়ার জন্য দু-পা বাড়ালেই রেস্তোরাঁ। । রাজ ওয়েসিস,পারিজাত, নিরালা, সাগরকন্যা, রাজবালা প্রভৃতি রেস্তোরাঁ অনেকদিন ধরেই বকখালির ভ্রমণার্থীদের রসনা তৃপ্ত করে চলেছে। চাইনিজ, কন্টিনেন্টাল, মোগলাই? পেয়ে যাবেন। নানা পরবে বকখালি-ফ্রেজারগঞ্জে এখন ভালোই পর্যটক সমাগম হয়। তখন বকখালি জমজমাট। শীতে ভিড় বাড়ে। যাওয়া যায় বছরভরই। বর্ষায় ধূ-ধূ সৈকত জুড়ে বৃষ্টি। সে আরেক রূপ। রামধনু রঙের ছাতার নিচে বসে অলস সময় কাটাতে পারেন। বসার জন্য ঘন্টাপিছু চেয়ার ভাড়া পাওয়া যায়। ছোট খাবার দোকানগুলোতে আঞ্চলিক রন্ধন-প্রণালীর আস্বাদ পাওয়া যাবে। জেলেদের কাছ থেকে সামুদ্রিক মাছ কিনে এনে দিলে সামান্য দক্ষিনায় সেই মাছ ভেজে দেবেন দোকানিরা।

দিঘার সহচর যেমন শঙ্করপুর, বকখালির তেমন ফ্রেজারগঞ্জ। এক ভ্রমণে দুই সৈকত। সৈকত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফ্রেজারগঞ্জ। সৈকত ভ্রমণের সে অভিজ্ঞতা মনে রাখার মতো। সকাল সকাল গেলে মৎস্য বন্দরের জমজমাট ব্যস্ততা চোখে পড়বে। এডওয়ার্ড-ক্রিক (খাঁড়ি) ধরে সমুদ্র ফেরত নৌকা, ট্রলার এসে পৌঁছচ্ছে বন্দরে। রকমারি সব সামুদ্রিক মাছ। নিলামের পর সেইসব মাছ চলে যাচ্ছে দূরদূরান্তে। শংকরপুরে যেমন চম্পা নদীর মোহনা, ফ্রেজারগঞ্জে তেমন এডওয়ার্ড খাঁড়ির মোহনাকে কেন্দ্র করে মৎস্যবন্দর গড়ে উঠেছে। একটা দিন ফ্রেজারগঞ্জে থেকে যাওয়া যায়। বেনফিশের সুন্দর লজ রয়েছে ফ্রেজারগঞ্জে। মাছের বন্দর তো, সিগালের ওড়াউড়ি বেশি এখানে। ফ্রেজারগঞ্জ শুঁটকি মাছের একটি বিশেষ উৎপাদন কেন্দ্রও। সমুদ্র পারে, খাঁড়ির ধারে রয়েছে মাছ শুকানোর দেশি পরিকাঠামো। শুকনো মাছ এই বঙ্গোপসাগরের কোল থেকে পাড়ি দেয় দেশের বিভিন্ন বাজারে। উত্তর-পূর্ব ভারতে রয়েছে বড় বাজার।

বকখালি থেকে ফ্রেজারগঞ্জ বা ফ্রেজারগঞ্জ থেকে বকখালি সৈকত ধরে হাঁটুন। প্রতি জোয়ার-ভাঁটাতেই সৈকত অন্য হয়ে ওঠে। রং-রূপ-অবয়ব পাল্টে যায় প্রতিবার। সমুদ্র নানা ছবি আঁকে সৈকতে। বকখালির বালিতেও লালকাঁকড়ার মাতামাতি খুবই। ওরা ঘরদোর তৈরি করার সময়ে মাটিতে আল্পনা আঁকে। মাটিতে সুড়ঙ্গ তৈরির সময়ে গোলমরিচের মতো দেখতে, আকারে ছোট, অসংখ্য মাটির পুঁটি তৈরি হয়। সেগুলি ছড়িয়ে ফেলার কায়দাটা গর্ত তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত। কায়দাটা আল্পনা আঁকার মতো। এইসব রূপকারেরা সমুদ্রতীরে আল্পনা আঁকতেই থাকে। ঢেউ এসে ধুইয়ে দেয়, আবার আঁকা হয়। ভিতর-বাইরের খেলাটা চলতেই থাকে।

জম্বুদ্বীপঃ ফ্রেজারগঞ্জের ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের মধ্যে একটি ছোট্ট দ্বীপ জম্বু। এটি একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলও। দ্বীপের মোট আয়তন ১৯৫০ হেক্টর। দ্বীপটিকে বেড় দিয়ে রয়েছে সাদা বালির তট। কাজু বাদামের জঙ্গল রয়েছে এই দ্বীপে। আর আছে নানা প্রজাতির পাখি, সমুদ্র তীরের কর্দমাক্ত জমিতে আটকে পড়া মাছ, পোকামাকড় এইসব পক্ষীকুলের খাদ্য।

জম্বু দ্বীপে মানুষের বসবাস নেই। ২০০১ পর্যন্ত মাছধরার মরশুমে মৎস্যজীবীরা এই দ্বীপে অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করতো মাছ শুকনো ও থাকার জন্য। ২০০২ এর অগাস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে এই দ্বীপে মৎস্যজীবীদের সমস্তরকম কার্যকলাপ নিষিদ্ধ হয়।

স্বাভাবিকভাবেই জম্বু দ্বীপে থাকবার কোনও বন্দোবস্ত নেই। তবে বেড়িয়ে আসা যায় মোটর বোটে চড়ে। যাত্রার ব্যবস্থা রয়েছে ফ্রেজারগঞ্জ থেকে। মোটর বোট প্রথমে এডওয়ার্ড ক্রিক (খাঁড়ি) ধরে এগোবে খানিকটা। খাঁড়ির দু-ধারে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের জঙ্গল। এরপর সমুদ্রপথে নৌযাত্রা। ৩০-৪০ মিনিটের রোমাঞ্চকর জলযাত্রা মনে রাখার মতো। যাওয়ার পথে বাঁদিকে, দূরে একটা ছোট্ট দ্বীপ নজরে আসবে। ওটা সুন্দরবনের লোথিয়ান দ্বীপ। এখন আর দ্বীপে পা রাখতে দেওয়া হ্য না পর্যটকদের। জলযান থেকেই দ্বীপ দর্শন সারতে হবে। সমুদ্রের ওপর দিয়ে জলযাত্রাটাই অ্যাডভেঞ্চার। বর্ষায় জম্বু দ্বীপে যাওয়া যাবে না।

যাওয়ার পথ

সড়ক পথে কলকাতার ধর্মতলা থেকে বকখালি ১৩৫ কিলোমিটার। ধর্মতলার বাসগুমটি থেকে দিনের বিভিন্ন সময়ে দক্ষিনবঙ্গ পরিবহণের বাস ছাড়ে বকখালির উদ্দেশে। বকখালি পৌঁছে একটা টোটো নিয়ে ৫ কিলোমিটার দূরের হেনরিজ আইল্যান্ড চলে যাওয়া যায়। নিজেদের গাড়ি নিয়ে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে কাকদ্বীপ হয়ে সরাসরি হেনরিজ আইল্যান্ড পৌঁছানো যায়। সেক্ষেত্রে বকখালির কিছুটা আগে মূল রাস্তা থেকে গাড়ি বাঁ-দিকের রাস্তায় ঢুকবে। হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীর ওপর সেতু তৈরি হয়েছে। ফলে গাড়ি বার্জে তোলার দরকার হবে না। রেলপথে যেতে চাইলে শিয়ালদহ-নামখানা লোকাল ট্রেন ধরে নামখানা স্টেশনে পৌঁছাতে হবে। স্টেশনের বাইরে থেকে প্রাইভেট গাড়ি পাবেন। বাসে যেতে চাইলে টোটো করে চলে আসুন হাতানিয়া-দোয়ানিয়ার অপর পাড়ে, বাসস্ট্যান্ডে। ওখান থেকে বকখালি, ফ্রেজারগঞ্জ যাওয়ার বাস পাবেন। বকখালি থেকেও টোটোয় হেনরিজ আইল্যান্ড পৌঁছানো যায়। হাতানিয়া-দোয়ানিয়া পারের বাসস্ট্যান্ড এলাকা থকে প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি হেনরিজ আইল্যান্ড চলে আসতে পারেন।

হেনরিজ আইল্যান্ডে থাকার ব্যবস্থা

থাকার ব্যবস্থা মৎস প্রকল্প এলাকার মধ্যে, রাজ্য মৎস উন্নয়ন নিগম পরিচালিত ‘ম্যানগ্রোভ গেস্টহাউস কমপ্লেক্স’ ও ‘সুন্দরী গেস্টহাউস কমপ্লেক্স’-এ। দুটি কমপ্লেক্স-ই মন জুড়ানো প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত। উভয় কমপ্লেক্সেই রয়েছে রেস্তোরাঁ। ব্রেকফাস্ট থেকে ডিনার, সবই পাওয়া যাবে। ড্রাইভারের জন্য স্বল্প খরচে থাকার ব্যবস্থা আছে।

ম্যানগ্রোভ কমপ্লেক্সটি প্রকল্প এলাকায় প্রবেশপথের কাছাকাছি। সুন্দরী কমপ্লেক্স এই প্রবেশপথ থেকে খানিকটা দূরে। সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি। সঙ্গে গাড়ি থাকলে সুবিধা হবে, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে।

গেস্টহাউসে না থাকলেও প্রকল্প এলাকাটি ঘুরে দেখা যায়। এ ব্যবস্থাটি কিছুদিন স্থগিত রাখা হয়েছিল কোভিডের কারণে। এখন চালু রয়েছে।
ফোনঃ ম্যানগ্রোভ গেস্টহাউস কমপ্লেক্স ৯৪৭৪৭৩৫৪৪৩, ৯৬৭৯৩০৪২১৫, ৯৭৩৪২০৪৪১৩; সুন্দরী গেস্টহাউস কমপ্লেক্স ৯৪৭৪৭৩৫৪৪৩, ৯০৯৩৫৪২০৭৭, ৯৬৭৯৩০৪২১৫

বকখালি-ফ্রেজারগঞ্জে থাকার ব্যবস্থা

বেনফিশের সাগরকন্যা টুরিস্ট লজ ফ্রেজারগঞ্জে থাকার ভালো ব্যবস্থা। (০৩৩)২৩৫৭-৫২১৫, (০৩৩)২৩৫৫-৪৯৩১।

বকখালি
বে ভিউ টুরিস্ট লজ – ৯৮৩৬১-৩৫৯৪২, ৯৬৪৭০-৩৯৪৪৮।
বলাকা লজ – ৯০০৭৭৪১৫৫০।
হোটেল অমরাবতী – ৯৭৩২৬১৯৩৪০।
হোটেল আইকন হেরিটেজ – ৮৫১৪৯১২১১৬, ৯৮৩০২০৩৭৯৫।
হোটেল ডলফিন – ৮৩৩৬৯১৬৮৬০, ৯৪৩৩৫৪৬৪১৭।
হোটেল দীপক – ৯৭৩২৬০৪৮৩৩।
হোটেল ইনোদয়- ৯১৬৩৬৮০১১১, ৯০৭৩৯৬০৯৯৫।
সাগরবেলায় গেস্টহাউস – (০৩৩)২৪৫৩৫৮১৭।
নারায়ণী লজ – ৭৭৯৭১১৬৪৯৯।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *