Follow us
English

ডেব্রিগড় সাতকোশিয়া মংলাজোড়িঃ একটি ভ্রমণ আলেখ্য (শেষপর্ব)

ডেব্রিগড় সাতকোশিয়া মংলাজোড়িঃ একটি ভ্রমণ আলেখ্য (শেষপর্ব)

ডেব্রিগড়ের অরণ্য, হীরাকুদ বাঁধ ও জলাধার বেড়িয়ে এবং ঘন্টেশ্বরী ও সম্বলেশ্বরী মন্দির দর্শন করে প্রবল ঝড়ের মধ্যে জঙ্গুলে পথ ধরে আমরা গতকাল রাতে এসে পৌঁছেছি ওড়িশার সাতকোশিয়ার টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্পে।

জায়গাটার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, চারিদিকে পাহাড় আর চারপাশটা সবুজে সবুজে, বড় প্রাণবন্ত। সামনে দিয়ে মহানদী বয়ে চলেছে। মহানদী এখানে অনেকটা ইংরেজী ‘ইউ’ অক্ষরের মতো বাঁক নিয়েছে। আমরা এই বাঁক-খাওয়া জায়গাটায় নদী থেকে ২৫-৩০ ফুট ওপরে সমতলে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখতে পাচ্ছি। এই সমতল জায়গাটায় যেন সবুজ ঘাসের গালিচা পাতা রয়েছে। নদীর অপর পারে বিস্তৃত বালির চর। সেই চরের ঠিক পিছনেই জঙ্গলে ছাওয়া পাহাড়। এক অপূর্ব লাবণ্যময় প্রাকৃতিক মাধুরী ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে।

মহানদীর চর।

নেচার ক্যাম্পের ডাইনিং হলটা একদম নদীর পাশে। সেখান, সেই অকৃত্রিম প্রাকৃতিক পরিবেশে সকলে মিলে খেতে বসা। দুপুরের আহার সারা হল। বৃষ্টিও বাড়ল। নদী, নদীর চর, পাহাড়, জঙ্গল জুড়ে সেই বৃষ্টি প্রথমে নিঃশব্দে দেখল সকলে। তারপর সে কী অপূর্ব আনন্দে জমে গেল আড্ডা। ঝরঝর বৃষ্টি, প্রাণ থেকে উঠে আসা হাসি, কথা। কত ছবি আঁকা হয়ে চলেছে।

আমাদের এই গ্ৰুপের বেশিরভাগ সদস্যের বয়স ৬০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। অরিন্দম আর সুজাতা যথাক্রমে ৩৫ ও ৩১এর কোঠায়। অশোকদা, বৌদি, সুমিত্রাদি, ও বিমলদা, ওঁরা সবাই দিব্য আছেন।

অরিন্দম কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা ও এন জি সি-র উচ্চপদে আসীন। দেখতেও বেশ সুশ্রী। ব্যবহারে একটা চাপা অহংবোধ আছে। সল্টলেকে নিজেদের ফ্ল্যাটে বাবা মায়ের সঙ্গে থাকে। জানতে পেরেছি, বছর পাঁচক আগে অরিন্দমের বিয়ে হয়েছিল। দু’বছরের বেশি বৈবাহিক সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। এরকম একটা ভ্রমণের ওর খুব দরকার ছিল, মনে হয়েছিল আমার।

সুজাতা ডক্তরেট করা অবিবাহিতা সুন্দরী মেয়ে। স্কুল জীবন থেকেই মেধাবী ছাত্রী। আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই মা, বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে থাকে। যৌবনে প্রবেশ করে নিজেকে সাবলম্বী করে তুলেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্যাকাল্টি হিসাবে কাজ করার সুবাদে একটা কর্তৃত্বসুলভ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে তাঁর মধ্যে।

ঝড়-বৃষ্টি শেষে রাতের আকাশ বেশ পরিষ্কার। শুক্ল পক্ষের চাঁদকে ঘিরে প্রদীপের মতো অজস্র ছোট বড় তারা যেন আলপনা এঁকেছে আকাশের বুকে। নদীর উল্টোদিকে বিশাল কালো ছায়াঘন দৈত্যের মতো পাহাড়টা দাঁড়িয়ে আছে। ডিনারের পর আমরা টেন্টের দিকে ফিরতে ফিরতে দেখলাম, হিমেল পরিবেশে চাঁদের আলোয় জেগে উঠেছে পাহাড়-জঙ্গল। নদীর জলে, চরের বালিতে চিক চিক করছে আলোর ছটা। আমরা আটজন নির্বাক পথযাত্রী যেন এইমাত্র আবিষ্কার করলাম জায়গাটিকে। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেলাম অরিন্দমের কথায়, “আচ্ছা গানটা যদি এরকম হত ‘এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলোতো’?” মূহুর্তের মধ্যে সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে হাসির হিল্লোল উঠল। সুমিত্রাদি বলে উঠলেন, “অরিন্দম তুমিই বলো।”

জোৎস্নায় সাতকোশিয়া।

তীরের মতো ধেয়ে এল আরিন্দমের কথাগুলো, “আসলে আন্টি ওই গানের শব্দ চয়নকে নির্দিষ্ট সুরে বাঁধতে হলে বয়স, সত্ত্বা আর মননশীলতার মেলবন্ধনের দরকার।” খানিকক্ষণ সবাই নির্বাক। বুদ্ধিমান ছেলে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, “না মানস আঙ্কেল, এই টুরটায় না আসলে খুব মিস করতাম।”

পরের দিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙলো। গুটি গুটি নদীর তীরের দিকে হাঁটা লাগালাম। ও পারটা কুয়াশায় আড়ালে। একটু দূরে কুয়াশার মধ্যে গায়ে শাল জড়ানো সুজাতাকে দেখতে পেলাম।
ভোরের এই সময়টা বোধহয় পৃথিবীর সর্বত্রই সুন্দর। হঠাৎ এক ঝাঁক টিয়া কোথা থেকে উড়ে এসে নেচার ক্যাম্পের একটা গাছে গিয়ে বসল সকলে মিলে। সুজাতা কিছুটা অলস পদচারণায় শিশির ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে কিছুটা আনমনে পাখিদের আশ্রয়স্থল গাছটির দিকে এগতে লাগল। সূর্য এখনো পাহাড়ের আড়ালে। আগের দিন তুমুল বৃষ্টি হয়েছে। কুয়াশা মাখা প্রকৃতির স্নিগধ লাবণ্য ফুটে উঠেছে।

এতক্ষণ সুজাতা ছাড়া কোনও জনমানব দেখা যাচ্ছিল না আশেপাশে। হঠাৎ চোখে পড়ল, ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসছে কেউ। ক্রমশ মূর্তিটি প্রকাশিত হল। নীল ট্র্যাক স্যুট ও সাদা উলিকটের গেঞ্জি পরিহিত আরিন্দম এগিয়ে চলেছে সুজাতার দিকে। আমি বেশ খানিকটা তফাতে কুয়াশায় ঢাকা।

কথাবার্তার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ঠিক কী কথা হছে বোঝা যাচ্ছে না। উচ্চকিত কথাবার্তা নয়। আড়ি পেতে শোনা ঠিক নয়। আমি মোড় ফিরলাম। ওরা ক্যান্টিনমুখো হল। কুয়াশার মধ্যে হাতের মুঠোয় গরম চা পাওয়া যাবে এখন। আমিও যাবো। একটু পরে।

সাতকোশিয়া গর্জে কুমীর ও কচ্ছপ সংরক্ষণের প্রয়াস চলছে। ব্রেকফাস্টের পর কপিলকে নিয়ে আমরা কুমীর আর কচ্ছপ প্রকল্প দেখে এলাম। দুপুরের খাওয়ার আগে কয়েকজন মহানদীতে বোটিং করে ফিরলেন।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমরা সাতকোশিয়ার আর এক প্রান্তে ছোটকেইয়ের ফরেস্ট বাংলোর উদ্দেশে রওনা হলাম। এই জায়গাটাও অসাধারণ। জঙ্গলের মধ্যে একটা টিলার উপর বাংলোর অবস্থান। স্ন্যাক্স-সহযোগে সন্ধ্যার চা খেয়ে তৃষ্ণা মিটল।

আমরা ছোটকেইয়ের জঙ্গলে নাইট সাফারির জন্য তৈরি হলাম। এখানে বলে রাখা ভাল, এরকম নাইট সাফারির অনুমতি নেই এই জঙ্গলে। কপিলের মতো অভিজ্ঞ ড্রাইভার ছাড়া যাওয়া মুশকিল। কপিল এই সাফারিটা করিয়ে থাকে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে। এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতে পাওয়ারফুল টর্চ জ্বালিয়ে আমাদের রাতের জঙ্গল ও বন্যপ্রাণী দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে গেল। ঘন্টা দেড়েকের সাফারিতে বেশ কিছু বাইসন, হরিণ, শুয়োর, সজারু দেখে সবাই রোমাঞ্চিত। টেন্টে ফিরে ডিনার সেরে ঘুমের দেশে।

আজ পঞ্চম দিনে আমাদের গন্তব্য সাতকোশিয়া-টিকরপাড়ার অপর প্রান্তে, বাঘমুন্ডা। ব্রেকফাস্ট সেরে সাড়ে ন’টা নাগাদ রওনা দেওয়া গেল। জায়গাটার অবস্থান পাহাড়ের চূড়ায়। ঘন জঙ্গলের
মধ্যে দিয়ে পথ। হাতি চলাচলের রাস্তা পেরতে হয়। টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প থেকে ঘন্টা দেড়েকের রাস্তা। এখানেও একটা চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হয়।

জোৎস্নায় ভেজা সাতকোশিয়া নেচার ক্যাম্প।

বেলা এগারোটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম। নেচার ক্যাম্পে পাঁচটা ডবল-বেডেড কটেজ আছে। এই জঙ্গলের মধ্যে মিনারেল ওয়াটার, পরিচ্ছন্ন তোয়ালে পাওয়া যাবে। সোলার আলোর ব্যবস্থা এখানে। একটা টিলার উপরে ডাইনিং হল। তাকে বেড় দিয়ে একটু দূরে দূরে কটেজগুলো।
ডাইনিং হল আর কটেজ যাতায়াতের জন্য সরু সরু পাথরে বাঁধানো পথ রয়েছে। এখানে ওখানে ফুলের বাগান। চারপাশটা সবুজ। ওই ডাইনিং হল পয়েন্ট থেকে পূর্বঘাট পুর্বতমালার দৃশ্য অনবদ্য। জায়জাটা ছেড়ে যেতে মন চায় না।

বাঘমুন্ডা।

কটেজে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে সকলে চলে এলেন ডাইনিং হলে। সবাই আপ্লুত অমন পরিবেশ। জমিয়ে আড্ডা চলল। সঙ্গে চলল ছবি তোলা।

দুপুরের আহার পরিবেশিত হল। এখানকার কেয়ারটেকার বিঘ্নর তত্বাবধানে আদিবাসী মেয়েরা খুব আন্তরিকতার সঙ্গে সজনে শাক,ডাল, কাকরোল ভাজা, বেগুন ভাজা, সবজি, মাছের ঝোল,চাটনি পরিবেশন করল। অমন সুন্দরের মধ্যে বসে সেই শান্তির মধ্যাহ্নভোজন যে কী তৃপ্তিদায়ক হয়েছিল।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ গাড়িতে করে কাছেই আদিবাসী বস্তির শেষে একটা জায়গায় পৌঁছলাম। এখান থেকে কপিলের সাহচর্যে অল্প একটু ট্রেক করে একটা টিলার উপর ওঠা গেল। ২-৩ জন নীচে থেকে গেলেন। এই পাহাড়ের ওপর থেকে সমগ্ৰ সাতকোশিয়াকে প্রায় পাখির চোখে দেখা যায়। অপরূপ সে দৃশ্য।

ফেরার পথে আদিবাসীদের বসতির কাছে একটু দাঁড়াতে হল। গতকাল রাতে হাতির দল এখানে আক্রমণ করে বেশ কিছু ঘরবাড়ি ভেঙ্গে ধান ধান লুট করেছে।। আমাদের দলের সকলেই কিছু কিছু আর্থিক সহায্য করলেন ওদের।

এখানে শুধু আজকের রাতটাই থাকবো। সন্ধ্যাটা সবাই ডাইনিং হলেই কাটালাম। নিষ্কলুষ প্রাকৃতিক পরিবেশ, অচেনাকে দেখা, শান্ত সৌন্দর্যে নিজেকেও নতুন করে আবিষ্কার করা, এ যেন শেষ হয়েও শেষ না হওয়া।

পরেরদিন সকাল ৮টার মধ্যে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম। আজকের গন্তব্য মঙ্গলাজোড়ি বা মংলাজোড়ি। কপিল আমাদের অঙ্গুল স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিল। ট্রেন ১০:১০ মিনিটে। নামবো খুরদা রোড স্টেশনে। যথা সময়েই অঙ্গুল থেকে ট্রেন ছাড়ল। প্রায় ১২:৩০ নাগাদ আমরা খুরদা রোড পৌঁছালাম। এখানেও আমাদের আগে থাকতে গাড়ির ব্যবস্থা করা ছিল। বেলা দেড়টা নাগাদ রিসর্টে পৌঁছে গেলাম। নাম গডউইট ইকো রিসর্ট। এখানকার ম্যানেজার ও অন্যান্য কর্মীরা আমার পূর্ব পরিচিত। ম্যানেজার রবীন্দ্রজি চেক ইন করে তাড়াতাড়ি আমাদের খেতে নিতে বললেন। তিনটের আগেই অটোরিক্সা চলে আসবে বলে জানালেন রবীন্দ্রজি।

ওই অটো আমাদের বোটিং পয়েন্টে নিয়ে যাবে। আমরা তৈরি হয়ে নিলাম। যথা সময়ে দুটো অটোতে চড়ে আমরা ৫কিলোমিটার দূরের বোটিং পয়েন্টে পৌঁছে নির্দিষ্ট দুটো নৌকায় উঠলাম ভাগাভাগি করে। এই বোটিংটা একটা বিরল অভিজ্ঞতা। আমরা শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি দেখতে দেখতে চলেছি। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যক নৌকায় পাখি-বিষয়ক বই-সহ একজন করে গাইড থাকে। তিনি দেশী-বিদেশী নানা প্রজাতির পাখির সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়ত পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। বোটগুলো চলেছে সরু সরু খাড়ি দিয়ে। চিলিকা হ্রদের উত্তরে মংলাজোড়ি এক বিশাল জলাভূমি। শীতে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা পাখির জমায়েত ঘটে মংলাজোড়ির জলাভূমিতে। সুদূর কাস্পিয়ান সাগর, বৈকাল হ্রদ, মঙ্গোলিয়া, সাইবেরিয়া থেকে আগত পাখিদের অপেক্ষায় থাকে আঞ্চলিক পাখিরা। মিলমিশের কলকাকলিতে আনন্দধারা। অসংখ্য খাড়ি আছে এই জলাভূমির মধ্যে দিয়ে। অনেক খাড়ি চিল্কার সঙ্গে মিশেছে। খাড়িগুলোর দুই পারে লতাগুল্মের ধূ ধূ প্রান্তর।

মংলাজোড়ির জলাভুমিতে পাখির মেলা।

একসময় পাখি শিকার জলাভূমি অঞ্চলে বসবাসকারি বহু মানুষের জীবীকা ছিল। বিভিন্ন ব্যক্তি, সেচ্ছ্বাসেবী সংগঠন ও সরকারি উদ্যোগে পাখি শিকার বন্ধ হয়েছে। প্রাক্তণ শিকারীরা এখন সেই পক্ষীকুলের রক্ষক। তাঁরাই এখন গাইড, নৌকাচালক, হোটেলের কর্মী।

নৌকা ভ্রমণে প্রায় আড়াই ঘন্টার সময় কোথা দিয়ে শেষ হল, আমরা বুঝতেও পারলাম না। কত যে চেনা ও অচেনা পাখি দেখা হল। আমাদের অটোগুলো অপেক্ষায় ছিল। রিসর্টে ফিরে এলাম।

আজই আমাদের ভ্রমণের শেষ রাত। আগামীকাল সকাল দশটায় খুরদা রোড স্টেশন থেকে হাওড়া যাওয়ার ট্রেন। অশোকদা আর সুমিত্রাদি প্রস্তাব দিলেন, আমরা নিজেরাই যদি এই ভ্রমণ শেষের রাতটিকে একটি আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে পারি তাহলে মধুরেণ সমাপয়েত হয়। সবাই খুব উৎসাহিত। ঠিক হল সন্ধ্যায় চায়ের পর্ব শেষ হওয়ার পর থেকে নৈশভোজের আগে পর্যন্ত অনুষ্ঠান।

সেইমতো চায়ের পর্ব সারা হতেই আমরা গুছিয়ে বসলাম। ঘিরে থাকল নিখাদ প্রকৃতি। প্রথমে অশোকদার স্ত্রী শুরু করলেন ‘আমার বেলা যে যায়’ গানটি দিয়ে। এরপর অশোকদা গাইলেন ‘আমার জীবন পাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছো দান’। জানিনা ওনারা চর্চার মধ্যে ছিলেন কিনা, অনবদ্য গাইলেন দুজনায়। মনে হল, ওনারা এই ধরনের অনুষ্ঠান প্রায়শই করেন। এরপর সুমিত্রাদি গাইলেন, ‘আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস গেলে করবো নিবেদন’। সবাই তারিফ করলেন এবং উনি যে যথেষ্ট আবেগ দিয়ে গেয়েছেন সেটা ওঁর গায়কীর ঢঙেই প্রমাণিত। এপর্যন্ত সবাই ঠিকঠাক চালিয়ে দিলেন, কিন্তু আর গান গাওয়ার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। বারংবার অনুরোধ করার পর অবশেষে অরিন্দম রাজি হল। জানাল, রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে পারবে না। আমরা বললাম, “তুমি যা পারবে তাই গাও।” বেশ কিছুটা সময় নিয়ে একটা অসাধারণ গান ধরলো অরিন্দম। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গলায় আমরা অনেকেই শুনেছি, ‘আমি এতো যে তোমায় ভালবেসেছি তবু মনে হয় এ যেন গো কিছু নয়, কেন আরো ভালবেসে যেতে পারেনা হৃদয়’। ও যে এতো ভাল গাইতে পারে, না শুনলে জানতেই পারতাম না। সুজাতা বলল, “এটা খুব কঠিন একটা গান, খুব সহজেই উনি গানটা গেয়েছেন। আমার অবশ্য শ্যামল মিত্রের গান ভাল লাগে।” সবার অনুরোধে অরিন্দম এবার শ্যামল মিত্রের বিখ্যাত গান ‘তোমার ওই ধূপছায়া রঙ শাড়ির পাড়ে চোর কাঁটাতে বিধিয়ে দিলাম মন’ গানটা গাইল। গানের অনুরণনে আবেগঘন এক পরিবেশ তৈরি হল।

অরিন্দমের গান শেষ হতে সবাই কিছুটা আচ্ছন্ন বা বিভোর হয়ে পড়ায় পরের অংশগ্ৰহণকারীকে অনুরোধ করতেই সবাই ভুলে গেছে। অবশেষে অরিন্দমই বিষয়টায় আলোকপাত করতে সবার হুঁশ ফিরল। এবার সুজাতার পালা। তার বক্তব্য, সে গান গাইতে পারেনা, তবে একটা কবিতার কিছু অংশ সে শোনাতে পারে। সকলে সানন্দে তাতে সায় দিল। সুজাতা শুরু করল–

‘হে প্রিয়তম, তুমি সুন্দর, তুমি শ্রেষ্ঠ,
ইস্পাত শরীরে দৃপ্ত ভঙ্গিতে তুমি উৎকৃষ্ট
শাণিত বুদ্ধি আর পৌরুষ তোমার অহংকার
রুদ্ধ কন্ঠে নত মস্তকে লজ্জা মোর অলংকার
সৃষ্টির শর্তে লুকিয়ে আছে মোর রূপদান
অন্যায়ে বিরুদ্ধে আড়ালে শক্তিতে রেখেছি অবদান।’

কবিতার প্রথম স্তবকটি উল্লেখ করলাম। সুজাতার কবিতা আবৃত্তির ধরনটি ছিল চমৎকার। সবমিলিয়ে বর্ণময় হয়ে উঠেছিল আমাদের ভ্রমণের শেষ রাতটি। বাইরেটা জোছনায় ভেসে যাচ্ছে।

সবশেষে ছিল আমার আর মণির পালা। যেহেতু আমরা কিছুই সঠিকভাবে উপস্থাপিত করতে পারব না, তাই সঞ্চালক হিসেবে এই ভ্রমণের একটি স্মৃতি আলেখ্য সকলের কাছে পাঠিয়ে দেব বলে অঙ্গীকার করে সে যাত্রায় ছাড়া পেয়েছিলাম।

সেই কাজটাই এই লিখন প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্পূর্ণ হল।

 

ফটোঃ লেখক (মঙ্গলাজোড়ির ছবি ইন্টারনেট এর সৌজন্যে প্রাপ্ত)

 

প্রথম পর্বের লেখাটি পড়তে পারেন নীচের লিঙ্কে ক্লিক করে

https://torsa.in/debrigarh-satkoshiya-manglajori-a-travel-attractions/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *