Follow us
English

ডুয়ার্সের বরদাবাড়ি, টোটোপাড়া-লংকাপাড়া

ডুয়ার্সের বরদাবাড়ি, টোটোপাড়া-লংকাপাড়া

বরদাবাড়ি

আলিপুরদুয়ার জেলার হাসিমারার কাছে মাদারিহাট ব্লকে মলঙ্গী নদীর তীরে সবুজ-রঙা বরদাবাড়ি। আর বরদাবাড়ির মলঙ্গী লজ যেন সবুজে মোড়ানো এক টুকরো দ্বীপ। অরণ্য, আকাশ, নদীর জলধারাকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা নেই মলঙ্গী লজের । তবে দুটো দিন কাটিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাতেও ঘাটতি কিছু নেই। পশ্চিমবঙ্গ অরণ্য উন্নয়ন নিগমের লজ এটি। লজের পিছনেই বরদাবাড়ির অরণ্য। লজ থেকেও বন্যজন্তু চোখে পড়তে পারে। আর শুদ্ধ বাতাস, উপচে পড়া ওক্সিজেন বেঁচে থাকার রসদ যোগায়।

বরদাবাড়ির মলঙ্গী লজের অবস্থানগত সুবিধা অনেকগুলো। প্রথমত, চিলাপাতা অরণ্যের গা-ঘেঁষে বরদাবাড়ির অবস্থান। চিলাপাতায় জঙ্গল সাফারি করা যায় সহজে। চাইলে চিলাপাতার গভীর জঙ্গলের মধ্যে নলরাজার গড় দেখে আসতে পারেন। ১৫০০ বছরের একদা গড় এখন ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে। গড় যাত্রায় চিলাপাতা অরণ্যের অভ্যন্তরটা দেখে নেওয়া যায়। জলদাপাড়ার জঙ্গল ও বক্সা টাইগার রিজার্ভও কাছাকাছি।

বক্সা টাইগার রিজার্ভ

মলঙ্গী লজ থেকে জলদাপাড়া ১৫ কিলোমিটার। একশৃঙ্গ গন্ডারের আপনভূমি জলদাপাড়াতেও জঙ্গল সাফারি হতে পারে। দক্ষিণ খয়েরবাড়ির লেপার্ড রেসকিউ সেন্টার বরদাবরি থেকে ২০ কিলোমিটার। বেড়িয়ে আসা যায় মথুরা চা বাগান থেকে। দেখে নেওয়া যায় রসিকবিল পক্ষীনিবাস। বরদাবাড়ি থেকে ভুটানের প্রবেশদ্বার ফুন্টশেলিং ২০ কিলোমিটার। যাওয়া যায় কুঞ্জবাড়ি ইকো পার্কে। এই ভ্রমণে যুক্ত করে নিতে পারেন কোচবিহারকেও। বরদাবরি থেকে কোচবিহার রাজবাড়ি ৩৫ কিলোমিটার।

মলঙ্গী লজ

যাওয়ার পথ

কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে সরাসরি হাসিমারা স্টেশনে নেমে বরদাবাড়ি চলে আসা যায় সহজে। হাসিমারা থেকে বরদাবরি ১৫ কিলোমিটার। আলিপুরদুয়ার পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে মলঙ্গী লজে চলে আসতে পারেন। আলিপুরদুয়ার রেল স্টেশন থেকে মলঙ্গী লজের দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। শিলিগুড়ি থেকে বরদাবাড়ি ১৪০ কিলোমিটার। এন জে পি স্টেশন চত্বর বা শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি ভাড়া করে মলঙ্গী লজে চলে আসতে পারেন। প্রয়োজনে এন জে পি-তে ট্রেন বদল করে বা শিলিগুড়ি জংশন থেকে ট্রেন ধরে আলিপুরদুয়ার এসে সেখান থেকে গাড়িভাড়া করে মলঙ্গী লজে চলে আসা যায়। শিলিগুড়ি থেকে হাসিমারা যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে।

থাকার ব্যবস্থা

মলঙ্গী লজ। ডিলাক্স ও সুপার ডিলাক্স ঘরের ভাড়া যথাক্রমে ২০০০ ও ২৫০০ টাকা। বুকিংয়ের ঠিকানাঃ পশ্চিমবঙ্গ অরণ্য উন্নয়ন নিগম লিমিটেড, কেবি-১৯, সেক্টর-থ্রি, সল্টলেক, কলকাতা-১০৬ (বেলেঘাটা-সল্টলেক-বাইপাস কানেক্টর)। ফোনঃ ৭৬০৪০-৪৪৪৭৯।

টোটোপাড়া-লংকাপাড়া

ভারত-ভুটান সীমান্তের খুব কাছে হিমালয়ের পাদদেশে টোটো জনজাতির নিভৃত গ্রাম টোটোপাড়া। আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট থেকে টোটোপাড়া ২২ কিলোমিটার। চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে অনাবিল জীবন এই আদিবাসী গোষ্ঠীর।

পাহাড় – জঙ্গলে ঘেরা টোটোপাড়া।

ইন্দো-ভুটান যুদ্ধের সময়ে (১৮৬৫) টোটোদের একটি গোষ্ঠী ভুটান থেকে চলে আসে ভারতের সীমানায়। গড়ে ওঠে টোটোপাড়া। একসময় বিপন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল টোটোরা। ১৯৫১ সালের জনগণনা আনুসারে টোটো জনসংখ্যা ছিল ৩২১। আশাপ্রদ কথা হচ্ছে, ২০১১-র জনগণনার হিসেব আনুসারে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৯৬০। টোটো শিশু, কিশোররা এখন স্কুলেও যাচ্ছে।

টোটো কিশোরী।

পাহাড়, জঙ্গলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের সঙ্গে একটি প্রাচীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করার জন্য টোটোপাড়া থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেন। সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বে যাঁদের বিশেষ আগ্রহ তাঁরা পাহাড়ি আদিবাসী জীবনের নানা বৈশিষ্ট খুঁজে পাবেন টোটোপাড়ায়। নৃতত্ত্ববিদদের মতে টোটো জনজাতির সংস্কৃতি, ভাষা আঞ্চলিক অন্যান্য আদিবাসী এবং ভুটানীদের থেকে আলাদা। টোটোদের বিশ্বাস, তাঁদের দেবতা ইশপা থাকেন ভুটানের পাহাড়ে। প্রকারন্তরে পাহাড় তথা প্রকৃতিরই উপাসক টোটোরা ইশপাকে মুরগি, পায়রা ইত্যাদি এবং এউ নিবেদন করে পুজো করে। এউ একপ্রকার দেশীয় মদ। চেইমা টোটোদের দেবী। চেইমার পুজোতেও পানীয় হিসেবে এউ নিবেদন করা হয়। টোটোরা স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে এউ পানে অভ্যস্ত। ভাত, বজরার ছাতু প্রধান খাদ্য। এদের বাড়ি তৈরি হয় মাচার উপরে বাঁশ, মাটি খড় দিয়ে বাসস্থান তৈরি হয়। আদিম একটি জাতিগোষ্ঠীর নানা বৈশিষ্ট্য চোখে পড়বে টোটোপাড়ায়।

টোটোদের বাড়ি।

টোটোদের গৃহস্থালী

টোটোপাড়ায় যাওয়ার পথেই পড়বে লংকাপাড়া। লংকাপাড়া থেকে টোটোপাড়া ৭ কিলোমিটার। লংকাপাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে তিতি নদী। নদীর ওপারে চা-বাগান। তিতি নদীর পার থেকে অপূর্ব সূর্যাস্ত দেখা যায়। লংকাপাড়া কাছেই একটি ওয়াচটাওয়ার আছে। বনবিভাগের তৈরি করা ছোট একটি জলাশয় আছে লংকাপাড়ায়। হরিণ, বাইসনের দল জল খেতে আসে সেখানে। লংকাপাড়ায় অনুচ্চ এক পাহাড়ের মাথায় বনবিভাগের দুটি বাংলো আছে। বাংলো চত্বর থেকে চারপাশের অপরূপ শোভা মুগধ করবে।

লংকাপাড়া

যাওয়ার পথ

ট্রেনে চলে আসুন হাসিমারা। হাসিমারা থেকে মাদারিহাট ১২ কিলোমিটার। মাদারিহাট থেকে লংকাপাড়া ১৫ ও টোটোপাড়া ২২ কিলোমিটার।

থাকার ব্যবস্থা

থাকতে পারেন লংকাপাড়ার বনবাংলোয়। লংকাপাড়ায় থেকেই টোটোপাড়া থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেন। লংকাপাড়ার বনবাংলোয় থাকার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ ডি এফ ও, ওয়াইল্ডলাইফ ডিভিশন-থ্রি, কোচবিহার-৭৩৬১০১। ফোনঃ ০৩৫৮২-২২৭১৮। তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন পশ্চিমবঙ্গ অরণ্য উন্নয়ন নিগমের এই নম্বরেঃ ৭৬০৪০-৪৪৪৭৯।

টোটোপাড়ায়

ব্লু হোমস্টে, ফোনঃ ৯৮৩০৫৮০৮৯৩। গোমতু থাপা হোমস্টে, ফোনঃ ৯৯০৩২৮৩৮৪২। টোটোপাড়া রেস্টহাউস (হোমস্টে), ৬২৯৪৮৩০৩৮৪।

 

টোটোপাড়ার ছবি: শিবুন ভৌমিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *