Follow us
English

বৃষ্টিতে বনপাহাড়ি পুরুলিয়ায়

বৃষ্টিতে বনপাহাড়ি পুরুলিয়ায়

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় একটু হেঁটে এসে দাঁড়ালাম পাড়ডি জলাধারের তীরে। সন্ধ্যা নামছে। গড়গাবুড়ু পাহাড়ের পাদদেশে পাড়ডি ড্যাম ও জলাধার। এখন পাহাড় জল জঙ্গল জুড়ে এক অদ্ভুদ নীলচে আভা। শব্দ বলতে ঝিঁঝিঁ-র কলতান। পড়ন্ত বিকেলে পাড়ডি ড্যাম থেকে সূর্যাস্তের এক জাদুকরী দৃশ্য দেখা যায়। পাহাড়ের পিছনে সূর্য ডোবে। আর অস্তগামী সূর্যের আলোর রোশনাই ছড়িয়ে পড়ে পাড়ডির জলরাশিতে।

পাড়ডির জলাধার। প্রাক সন্ধ্যায়।

আঁধার ঘনালো। হাঁটা লাগালাম আস্তানার দিকে। আছি গড়গাবুড়ু ইকো স্টে-তে। পাড়ডি ড্যামের পথে ওটাই শেষ বাড়ি। সুসজ্জিত মাটির বাড়ি। পাশেই জঙ্গল। পরিবেশের সঙ্গে মানানসই সুন্দর এই থাকার ব্যবস্থাটি গড়ে তুলেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী সুকন্যা পাল। ইকো স্টে তথা হোমস্টেকে কেন্দ্র করে ডানা মেলছে পরিবেশ পর্যটন ও সামাজিক কল্যাণের নানা স্বপ্ন ও উদ্যোগ। নিস্তব্ধ পরিবেশে ইকো স্টে থেকে হঠাৎ ভেসে এল হাসির ছররা। বুঝলাম, সঙ্গীদের আড্ডা জমে উঠেছে। ভিজে শরীর, হোমস্টের এক কর্মী হাতে তুলে দিলেন ধূমায়িত চা আর হোমস্টেতেই বানানো কেক।

অগস্টের মাঝামাঝি। বৃষ্টি হচ্ছে। কাছাকাছি কোথাও থেকে বেড়িয়ে এলে হয় না? জড়ো হল তিন মাথা। আমি ছাড়া বন্ধুবর বিক্রম ও তাঁর অর্ধাঙ্গিনী শ্রেয়া। সিদ্ধান্ত হল। চালাও পানসি বৃষ্টিভেজা রাঙ্গামাটির দেশে। এ সময় ওখানকার পাহাড় নদী জঙ্গল ঝরনা নাকি অন্য রূপে প্রকাশিত হয়। আমার এই প্রথম যাওয়া বাংলার দক্ষিণের পুরুলিয়ার হিল স্টেশনে। হ্যাঁ, বেড়িয়ে আসার পরে অযোধ্যা পাহাড় ও তার আশেপাশের অঞ্চলগুলি একত্রে যে এক অবাক করা হিল স্টেশন, এ কথা বুক ঠুকেই বলছি। এক লপ্তে সবক’টি ভ্রমণ ঠিকানায় যেতে পারিনি। যতটুকু দেখেছি তাতে মুগধ হয়েছি। আবারও যাব নিশ্চয়ই।

এক বৃষ্টিমুখর রাতে ১২-০৫ এর হাওড়া-চক্রধরপুর এক্সপ্রেসে (রাত ১২-০৫) চড়ে পরের দিন সকাল সাড়ে ৬টায় পৌঁছানো গেল পুরুলিয়া স্টেশনে। গাড়ি বুক করা ছিল।

চায়ে চুমুক দিয়ে উঠে বসলাম গাড়িতে। প্রথম গন্তব্য মুরগুমা লেক। পথে কিছুটা সময় কাটল বেগুনকোদর স্টেশনে। পুরুলিয়ার এই রেলস্টেশনটি ‘ভুতুড়ে’ স্টেশন হিসেবে কুখ্যাত। ১৯৬৭ সালে বেগুনকোদরের স্টেশন মাস্টার রহস্যজনক ভাবে মারা যান। রটে যায়, তিনি ভুত দেখে ভয়ে মারা গিয়েছেন। রেল দুর্ঘটনায় মৃত এক মহিলার অশরিরী অবয়বকে নাকি রাতে রেললাইন ধরে হেঁটে যেতে দেখা যায়। স্টেশন মাস্টারের মৃত্যুর পর থেকে স্টেশনটিকে কেন্দ্র করে একটা আতঙ্কের আবহ গড়ে ওঠে। সে আতঙ্ক এতটাই যে, রেল ১৯৬৭ সালে স্টেশনটিকে বন্ধ করে দেয়। ফের স্টেশনের কাজকর্ম শুরু হয় ২০০৯ সালে। বিষয়টি নিয়ে অনেক অনুসন্ধান হয়েছে। অনুসন্ধান করেছেন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের প্রতিনিধিরাও। তাঁরা ‘ভুত’ এর তথাকথিত ধারনাকে নস্যাৎ করেছেন।

বেগুনকোদর স্টেশন।

আমরা কিছুক্ষণ ছিলাম শুনশান স্টেশন চত্বরে। ট্রেন আসার সময় হলে টিকিটঘর খোলে। শুনলাম, এখনো বিকেলের পরে কেউ পারতপক্ষে স্টেশনে পা রাখে না।

বেলা সোয়া ১০টা নাগাদ আমরা মুরগুমা পৌঁছালাম। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা বিপুল জলরাশি দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। আকাশ মেঘলা। লাল মাটির রাস্তা চলেছে গ্রাম অভিমুখে। কাছের পাহাড়ে মেঘের ছায়া, দূরের পাহাড়ে রোদ্দুর। সবমিলিয়ে অবাক করা এক ছবি যেন। জায়গাটা ছেড়ে যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু যেতে তো হয়-ই। আমরাও গেলাম।

মুরগুমা লেক।

গেলাম সুইসাইড ভিউ পয়েন্টে। মুরগুমা থেকে অযোধ্যা পাহাড়ে যাওয়ার মূল পথ থেকে একটু হেঁটে ভিউ পয়েন্টে পৌঁছাতে হয়। পাহাড়, নদী, উপত্যকা মিলিয়ে এক অসাধারণ দৃশ্যপটের মুখোমুখি হলাম ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে। দুর্দান্ত একটি ভিউ পয়েন্ট এটি। ভিউ পয়েন্টের সঙ্গে ‘সুইসাইড’ কথাটি যুক্ত হয়েছে কেন, তা নিয়ে সামান্য অনুসন্ধান চালিয়েছিলাম। সঠিক উত্তর পাওয়া গেল না।

সুইসাইড ভিউ পয়েন্ট।

দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ পৌঁছালাম অযোধ্যা পাহাড়ের শীর্ষে। ওখানে কল্যাণ ফরেস্ট রিসর্টে ঘর বুক করা ছিল। বৃষ্টি হচ্ছে। ঘরের প্রশস্ত সব জানলা দিয়ে বৃষ্টিস্নাত পাহাড়, জঙ্গলের নানা ছবি দেখা যাচ্ছে। দুপুরের খাওয়াদাওয়া সারা হল। ইতিমধ্যে লিও নামের একটি কুকুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তার সঙ্গে অযোধ্যা টপের এদিক ওদিক পায়চারি করলাম আমরা।

পরের দিন সকালে গেলাম ময়ূর পাহাড়ে। কাছেই। গাড়ি রেখে সিঁড়ি বেয়ে মিনিট দশেক হেঁটে পাহাড়ের মাথায় উঠে আসা যায়। ময়ূর পাহাড়ের উপর থেকে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। আমরা গিয়েছিলাম সকালের দিকে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেল, বিকেলে ময়ূর পাহাড় থেকে খুব সুন্দর সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যায়। এ বারের ভ্রমণে সে দৃশ্য দেখা হয়নি আমাদের।

পরের গন্তব্য মার্বেল লেক। বর্ষায় জলে টইটম্বুর। এক সময় এখান থেকে পাথর তোলার কারণে তৈরি হয় খাদান। সেই খাদানই এখন অতীব সুন্দর মার্বেল লেক। জলাশয়ের চারপাশে পাথুরে দেওয়াল। ঘন সবুজ পরিবেশ। প্রচলিত ভিউ পয়েন্টের একটু আগে অন্য একটি রাস্তা ধরে মিনিট দুয়েক হেঁটে এমন একটি জায়গায় পৌঁছানো যায়, যেখান থেকে পাখির চোখে লেকটিকে দেখা যায়।

মার্বেল লেক।

আহা, লাল মাটির দেশের নাচের ছন্দ যেন বামনি ঝরনা। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল এই বামনি ঝরনা। প্রথমেই একটা কথা বলে রাখি, বামনি ফলস দেখতে যেতে হবে হাতে একটু সময় নিয়ে। ঝরনার একেবারে তলদেশ থেকে জলপ্রপাতটি দেখতে হলে ৪০০ ধাপের সিঁড়ি ভেঙে একেবারে নীচে নামতে হবে। সে না হয় নামা গেল। কিন্তু ৪০০ ধাপের সিঁড়ি ভেঙে উঠেও আসতে হবে যে।

বর্ষায় ভরা যৌবনা ঝরনা। বাতাস জলীয় বাস্প ও বনজ গন্ধে ভারী হয়ে আছে। ধাপে ধাপে প্রবল বেগে নেমে আসছে বর্ষার প্রপাত-ধারা। এখানে স্প্রুস বৃক্ষের দেখা মেলে। এক জায়গায় অন্য রকমের কয়েকটি গাছ দেখে একজন স্থানীয় ব্যক্তির কাছে গাছের নাম জানতে চেয়েছিলাম। তিনি জানালেন, “ওগুলো ফিট গাছ, আপনি বাতাসে ওই গাছের গন্ধ পাচ্ছেন।” পরে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে নেটে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, ওটা স্প্রুস গাছ। ফিট হয়তো গাছটির স্থানীয় নাম। এ গাছ অন্যত্র, পাহাড়েই দেখেছি। নাম জানা ছিল না। জায়গাটি জীববৈচিত্রের নিরিখে বেশ সমৃদ্ধ বলে মনে হয়েছে। আমরা ১৫০ ধাপ সিঁড়ি নেমেছিলাম। গায়ে জলকণার ছিটে লেগেছিল। শরীর, মন প্রশান্ত হয়েছিল। একেবারে নীচে না যেতে পারার কারণে একটা আপশোসও থেকে গেল অবশ্য।

তারপর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাথুরে পথ ধরে তুরগা ঝরনার কাছে এসে দাঁড়ানো। পাথুরে পথ ধরে চলার পথ করে নিয়েছে ঝরনাটিও। বামনির মতো এই তুরগা উপর থেকে ঝাঁপ দেয়নি। পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমেছে অনাবিল ঝরনাধারা। মনে হয় অঞ্জলি ভরে পান করি এ জল, ঝরনার জলে সৃষ্ট কুণ্ডে শরীর ডুবিয়ে স্নান করি।

তুরগা ঝরনা।

ওই স্নান করতে গিয়ে এক বিপত্তি। এক ভদ্রলোক নিম্নাঙ্গে অন্তুর্বাস এবং চোখে সানগ্লাস ধারণ করে স্নান করতে নেমেছিলেন ঝরনা-কুণ্ডে। জলে ডুব দিয়ে উঠে দেখেন চোখে সানগ্লাস নেই, তলিয়ে গিয়েছে জলে। তবে ছাড়বার বান্দা নন ভদ্রলোক। ডুবুরির মতো করে খুঁজতে লাগলেন প্রিয় সানগ্লাসটি। হঠাৎ জল থেকে প্রথমে উঠে এল দুটি হাত। এক হাতে সেই মহার্ঘ সানগ্লাস। জল থেকে মাথা তুলে তিনি পারে দাঁড়ানো গুটিকয় ভ্রমণার্থীর উদ্দেশে দুই আঙুলে ‘ভি’ তথা ভিকট্রি চিহ্ন দেখালেন। হাততালিও পড়ল কিছু।

তুর্গা ড্যাম দেখে আমরা এসে উঠেছিলাম শুরুতে বলা গড়গাবুড়ু ইকো স্টে-তে। রাতে মুষলধারায় বৃষ্টি হল। সকালে বৃষ্টির লেক দেখতে গেলাম সকলে মিলে।

আজ আমাদের বেড়ানোর তৃতীয় দিন। মেঘ-বৃষ্টিতে বেলা বাড়ল। বেরিয়ে পড়লাম সাড়ে ১০টা নাগাদ। গাড়িতে বিশ মিনিট সময় লাগল পাখি পাহাড় পৌঁছাতে। ৮০০ ফুট উচ্চতার মুরাবুরু পাহাড়টাই এক বিশাল ক্যানভাস। তাতে খোদাই করে কত যে পাখির ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী চিত্ত দে মহাশয় ও তাঁর সহযোগীরা, দেখলে বিষ্মিত হতে হয়। হরিণের ছবিও দেখলাম। পাহাড়ের পাদদেশেও ছড়িয়ে থাকা বোল্ডারে নানা ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনও কোনও ছবিতে রং ব্যবহৃত হয়েছে।

পাখি পাহাড়ের পাদদেশে বোল্ডারে শিল্পকর্ম।

এরপর খয়রাবেরা লেক। জঙ্গল আর অনুচ্চ সবুজ পাহাড়ে ঘেরা লেক খয়রাবেরা। জলে সবুজের ছায়া। শুধু লেকের পাশেই দুটো দিন বিশ্রামে কাটিয়ে দেওয়া যায়। লেকের এক পাশ দিয়ে হাতি চলাচলের পথ। পুরুলিয়া শহর থেকে খয়রাবেরা ড্যাম ৬৭ কিলোমিটার।

খয়রাবেরা ড্যাম ও লেক।

লেকের এক পারে খয়রাবেরা ইকো অ্যাডভেঞ্চার রিসর্ট। নানা অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস, গাইড়-সহ ট্রেকিংয়ের ব্যবস্থা আছে এখানে। এ যাত্রায় এখানে থাকার পরিকল্পনা ছিল না। আবার আসব, প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়ে আমরা গড়িমসি করে মুখোশ তৈরির গ্রাম চরিদার উদ্দেশে রওনা হলাম। চরিদা যে খুব ভালো করে বেড়াতে পেরেছি এমন দাবি করতে পারি না। এক্ষেত্রেও ফের আসার লক্ষ্যে প্রতিশ্রুত হওয়া গেল।

যাত্রা শুরুর প্রথম দিন থেকেই বৃষ্টি আমাদের চতুর্থ সঙ্গী। এ ক’দিনে বেশ সয়ে গিয়েছে। হালকা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পৌঁছানো গেল লোয়ার ড্যামে।

লোয়ার ড্যাম।

বাঁধের একদিকে জলাধার অন্যদিকে বিস্তৃত উপত্যকা। আপার ড্যামের জলাধারটি তুলনামূলক ভাবে আয়তনে বড়। পাহাড়, জলাধার, বাঁধের রাস্তা, উপত্যকা, সব মিলিয়ে অত্যন্ত সুন্দর সমগ্র জায়গাটি। অনেকটা সময় কাটানো গেল বাঁধের রাস্তায়।

আপার ড্যাম।

আজ আমাদের ফেরার দিন। এই তিন দিনে গোটা অঞ্চলটির সঙ্গে বড় একাত্ম হয়ে পড়েছি। ছেড়ে যেতে মন চায় না। কিন্তু ছেড়ে যেতে হয়। রাস্তায় এক রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজন সারা গেল। তারপর পুরুলিয়া স্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা। বাইরে, মনের ভিতরেও রৌদ্র-ছায়ার খেলা। রাত ৯ টায় আমাদের হাওড়া ফেরার ট্রেন।

আমরা যেখানে ছিলাম
গড়গাবুড়ু ইকো স্টেঃ ফোন ৯৩৩০৫ ৭৩৫৬৬
কল্যাণ ফরেস্ট রিসর্টঃ ফোন ৭০০৩৬ ৭৩৩১২

গাড়ির ভাড়াঃ বোলেরো গাড়িতে ৩ দিনের ভাড়া ৮,০০০ টাকা। গাড়িটি পুরুলিয়া স্টেশন থেকে পিক আপ থেকে পুরুলিয়া স্টেশনে ড্রপ পর্যন্ত সঙ্গে সঙ্গেই ছিল।

সর্বোচ্চ (হেডার) ছবিঃ আপার ড্যাম থেকে দেখা দূরের দৃশ্য।

ছবিঃ লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *