Follow us
Search
Close this search box.

জলপাইগুড়ি থেকে ডুয়ার্স হয়ে নেওড়া ভ্যালি (দ্বিতীয় পর্ব)

জলপাইগুড়ি থেকে ডুয়ার্স হয়ে নেওড়া ভ্যালি (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রথম পর্বের লেখাটি পড়তে পারেন এই লিঙ্কেঃ https://torsa.in/jalpaiguri-via-duars-to-newra-valley/

আজ ১৭ অক্টোবর, ২০২২। গরুমারায় জঙ্গল সাফারির পরে ফিরে এলাম এলিফ্যান্ট ক্যাম্পে। ব্রেকফাস্ট সেরে ফের বেরিয়ে পড়লাম। জলঢাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখে খানিকক্ষণ মূর্তি নদীর তীরে সময় কাটানো গেল। ঝকঝকে রোদ্দুরে ভালো লাগছে সবকিছু। বর্ষার পরে নদী উদ্দাম। নেওড়া ভ্যালির পাহাড় থেকে নেমে এসেছে এ নদী।

পরবর্তী গন্তব্য ভারত-ভুটান সীমান্তের বিন্দু ড্যাম। কালিম্পংয়ের গরুবাথান ব্লকে ড্যামের অবস্থান। বিন্দু পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের শেষ গ্রাম। তারপর ভুটানের এলাকা। জলঢাকা নদী, ভুটানের পাহাড়শ্রেণি, সবুজ জঙ্গল, সবমিলিয়ে এক অসাধারণ দৃশ্যপট রচিত হয়েছে। তিনটি পাহাড়ি নদী একত্রিত হয়েছে বিন্দু এলাকায়। বিন্দু খোলা, দুধ পোখরি ও জলঢাকা। তিন নদী সম্মিলিত ভাবে জলঢাকা নামে প্রবাহিত হয়েছে এখানে। জলঢাকা নদীর মূল ধারাটির উৎপত্তি সিকিমের কুপুপ লেক থেকে। জলঢাকা নদীর ওপরই` বিন্দু ড্যাম।

বিন্দু পরিদর্শন করে আমরা পঁয়তাল্লিশ গাঁওয়ের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ঝালংয়ের কাছাকাছি ডুয়ার্সের পশ্চিমাংশে গ্রামটির আবস্থান। সবুজের রাজ্যপাট এখানে। সবুজ পাহাড়ের সারি। জলঢাকা উপত্যকা। ফুল। পাখি। পঁয়তাল্লিশ গাঁও ভ্রমণার্থীদের কাছে যে খুব পরিচিত হয়ে উঠেছে এমনটা দাবি করা যাবে না, তবে দ্রুত পরিচিত হয়ে ওঠার উপকরণগুলি মজুদ রয়েছে এখানে। পঁয়তাল্লিশ গাঁওয়ে আমাদের একটা রাতই থাকার বন্দোবস্ত করা ছিল। রাতে খাওয়াদাওয়াও ভালো হল। সারাদিন ধরে অনেকটা ঘোরাঘুরি হয়েছে। সুন্দর ঘুম হল। সকালে উঠে পঁয়তাল্লিশ গাঁওয়ের ওই সবুজ রূপটি দেখা গেল। ব্রেকফাস্টের পরে হোমস্টের মালিক নেপালি প্রথা অনুসারে গলায় খাদা বা উত্তরীয় পরিয়ে আমাদের বিদায় জানালেন।

পঁয়তাল্লিশ গাঁও হোমস্টে

আজ ১৮ অক্টোবর। পঁয়তাল্লিশ গাঁও থেকে আমাদের গাড়ি ছাড়ল। গন্তব্য চিসাং ও তোদে-তাংতা। ভারত-ভুটান সীমান্তবর্তী গ্রাম এগুলি। চিসাংয়ের পথে দলগাঁও ভিউপয়েন্ট থেকে দেখলাম দিগন্তবিস্তৃত ঢেউ খেলানো সবুজ। শান্ত পরিবেশের মাহাত্ম বেশ অনুভব করা যায় এখানে। সুন্দর ভিউপয়েন্ট। সিঙ্কোনার বাগান আছে এখানে। সিঙ্কোনা গাছের ছালের নির্যাস থেকে অষুধ, বিশেষ করে ম্যালেরিয়ার ওষুধ কুইনাইন তৈরি হয়।

চলে এলাম চিসাং। এখানে দি ওয়াইল্ড উডস রিট্রিটে আমাদের ঘর বুক করা ছিল। হোমস্টে। বেশ ভালো ব্যবস্থা। কালিম্পংয়ের অন্তুর্ভুক্ত অপরূপ পাহাড়ি গ্রাম এই চিসাং থেকে ভারত-ভুটান সীমান্ত ৪ কিলোমিটার। চিসাং থেকে ভুটানের তেন্ডু উপত্যকা ও নাথুলা রেঞ্জ দেখা যায়। দলে দলে পর্যটক চোখে পড়বে না এখানে। তবে কালে কালে চিসাং যে উত্তরবঙ্গের এক বিশিষ্ট পর্যটন ঠিকানা হয়ে উঠবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। চিসাং ঝালং থেকে ১৫ কিলোমিটার, লাটাগুড়ি থেকে ৬৫ কিলোমিটার, নিউ মাল জংশন স্টেশন ৫৫ কিলোমিটার, এন জে পি স্টেশন থেকে ১০৮ কিলোমিটার। ঝালং, বিন্দু বেড়াতে গেলে সেই যাত্রায় চিসাংকে যুক্ত করে নেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একটা রাত চিসাংয়ে কাটানোর পরামর্শ রইল। ভোরের চিসাং অসাধারণ।

হোমস্টেতে মধ্যাহ্নভোজন সেরে আমরা তোদে-তাংতার উদ্দেশে রওনা দিলাম। একটা জিপ ভাড়া করতে হয়েছিল। তোদে ও তাংতা পাশাপাশি দুটি গ্রাম। উচ্চতা অন্তত ৪০০০ ফুট। তোদে-তাংতা বৃহত্তর নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের আওতাধীন এলাকা। অ্যালপাইন অরণ্যের সবুজ এলাকা। চলে এলাম তোদে বাজার এলাকায়। পাহাড়ের বাজার। অসাধারণ পোড়ানো ভুট্টার স্বাদ। জানা গেল, উপরের দিকে সেন্ট নিকোলাস চার্চে যাওয়া যায়, তবে প্রায় ট্রেক করে। তোদের মূল রাস্তা থেকে নীচের দিকে শতবর্ষ প্রাচীণ আরেকটি চার্চ আছে।

তাংতা মনাস্ট্রি

পেরিয়ে এলাম দবাইখোলা। এ নদীর জলে নানা ওষুধের গুণাগুণ রয়েছে বলে আঞ্চলিক মানুষজনের জোরালো বিশ্বাস। নদীর নামের সঙ্গে তাই দবাই তথা দাওয়াই কথাটি যুক্ত হয়ে আছে। দুটো ডুব দিয়ে গেলে মন্দ হয় না। আমাদের অবশ্য তা হয়ে ওঠেনি। পথে অনেক এলাচের বাগান দেখলাম। বাঁশের ঝাড়, ফুলঝাড়ু গাছের সব আড্ডা। রাস্তা মসৃণ নয়। তবে এক একটা মোড় উন্মোচন ঘটাচ্ছিল ভিন্ন ভিন্ন ছবির।

দবাইখোলা

সুন্দর একটা মনাস্ট্রি আছে চিসাংয়ে। আমরা মনাস্ট্রি দেখলাম ঘুরেফিরে। জায়গাটায় নৈঃসব্দের উত্তর শুধু পাখির ডাক। চিসাং থেকে তাংতে আসতে গাড়িতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে। তোদেতে খানিক বেড়াতে হলে অতিরিক্ত সময়ের দরকার হবে। এই চিসাং থেকে ১০৩০০ ফুট উচ্চতার রচেলা টপ বা রচেলা পিক ট্রেক করা যায়। একদিকে পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম, অন্যদিকে ভুটান। তিনটি সীমানাকে ছুঁয়ে আছে রচেলার পাহাড়। রেড পান্ডার আবাস। মনে মনে তরুণ প্রজন্মের কাঁধে ট্রেকিংয়ের দায়িত্ব সঁপে আমরা ফিরতি পথে অর্থাৎ চিসাংয়ের উদ্দেশে রওনা হলাম। কাল যাব কোলাখাম।

রচেলার পাস ট্রেক রুটের ফটো সৌজন্য: হিমালায়ান ট্রেকার।

রচেলা পাস ছাড়া অন্য সবক’টি ফটোঃ লেখক ।

আগামী পর্বে সমাপ্য-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *