পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশে দুই দেশ জুড়ে অরণ্যের বিস্তার। মধ্যে দিয়ে বইছে এক নদী। মানস নদী। তার একদিকে ভুটান। অন্যদিকে ভারতের অসম। ওই নদীর নামেই অরণ্যের নাম। প্রধাণত পর্ণমোচী বৃক্ষের অরণ্য। আর এখানে সেখানে ঘাসবন। সবুজের প্রেক্ষাপটে বিস্তৃত সোনালি ঘাসের প্রান্তরে কুয়াশার মতো ভেসে থাকে কী এক রহস্যময়তা। দূরে দূরে আবছা নীলচে পাহাড়।
নদীর ওপারে ভুটানের অন্তর্গত অরণ্যের নাম রয়্যাল মানস ন্যাশনাল পার্ক। এপারে ভারতের মানস অভয়ারণ্য। মানস ন্যাশনাল পার্ক। হাতির পাল, সোনালি বাঁদর তথা গোল্ডেন লাঙ্গুর বা হর্নবিলেরা সীমানা মানে না। দুই দেশে অবাধ বিচরণ। দক্ষিণ তিব্বত থেকে যাত্রা শুরু করে ওই মানস নদী তিব্বতের কিছু অংশ, ভুটানের প্রায় ৪০০ এবং মানস অরণ্য-সহ অসমের ১০৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ওই রাজ্যের বঙ্গাইগাঁও জেলার জোগীঘোপা এলাকায় ব্রক্ষ্মপুত্র নদী বা নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে । অরণ্য-নদীর সেই যুগলবন্দি সুন্দর, এখনও সত্য।

ফটো সৌজন্যে : এম ডি পি আই
ওই যে সোনালি বাঁদর, সামগ্রিক মানসের অরণ্য ওদের প্রাণের আবাস। পৃথিবীর আর বিশেষ কোথাও এদের দেখা যায় না। পিগমি শূকর, গোল্ডেন লাঙ্গুর, রেড পান্ডা, ব্ল্যাক প্যান্থার, ক্লাউডেড লেপার্ড মানস অরণ্যের বিশেষ বিশেষ বন্যপ্রাণ সম্পদ। বাঘ, হাতি, একশৃঙ্গ গন্ডার, বুনোমোষ আছে এ অরণ্যে। অসম রুফড টার্টলের দেখা পাওয়া যেতে পারে। আর হর্নবিল, মেছো ঈগল, চিল, হ্যারিয়ার, ম্যাগপাই রবিন-সহ প্রায় সাড়ে ৪০০ প্রজাতির পাখি ওড়াউড়ি করে থাকে মানসের অরণ্যে।

ফটো সৌজন্যে : ইন্টারন্যাশনাল রাইনো ফাউন্ডেশন।
অসমের ‘ইউনেস্কো ন্যাচারাল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’-এর তকমাপ্রাপ্ত দুটি অরণ্যের একটি কাজিরাঙ্গা, অন্যটি মানস। গুয়াহাটি, কামাখ্যা শিলং তথা মেঘালয়ের কিয়দংশ ভ্রমণের সূচিতে কাজিরাঙ্গাকে যুক্ত করে নেন অনেকে। তুলনামূলক ভাবে মানস অরণ্যে মনুষ্য পদছাপের হার কম। মানস তার সব রূপ-রসের ডালি নিয়ে নিজের ছন্দে প্রবহমান। ভারতের আওতাধীন মানসের অরণ্য একইসঙ্গে টাইগার রিজার্ভ, এলিফ্যান্ট রিজার্ভ ও বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ।
আসমের চিরাং ও বকসা জেলা এবং স্বশাসিত বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল রিজিয়নের প্রায় ১০০০ বর্গ কিলোমটার এলাকা জুড়ে মানস জাতীয় উদ্যানের বিস্তার। তিনটি রেঞ্জে বিভক্ত সেই অরণ্য। পুবে ভুঁইঞাপাড়া রেঞ্জ, পশ্চিমে পানবাড়ি রেঞ্জ, মাঝে বাঁশবাড়ি রেঞ্জ। বরপেটা রোড থেকে বাঁশবাড়ি রেঞ্জ কাছাকাছি। মানস ভ্রমণের সেরা সময় নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস। বাঁশবাড়ি জোনে এলিফ্যান্ট ও জিপ সাফারির ব্যবস্থা আছে। ভুঁইঞাপাড়া রেঞ্জে জিপ সাফারি করা যায়। চাইলে রিভার রাফটিংয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ আছে।
যাওয়ার পথ
মানস অরণ্যের নিকটতম রেলস্টেশন বরপেটা রোড। এখান থেকে মানস ন্যাশনাল পার্ক ২২ কিলোমিটার। হাওড়া থেকে কামরূপ এক্সপ্রেস আরোনাই এক্সপ্রেস (সাপ্তাহান্তিক) বরপেটা রোড স্টেশনে পৌঁছানো যায় পরের দিন যথাক্রমে বেলা পৌনে ১টা ও সকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ। সরাইঘাট এক্সপ্রেসে, গরিবরথ এক্সপ্রেসে (দ্বি-সাপ্তাহিক) চলে আসা যায় নিউ বঙ্গাইগাঁও স্টেশনেও। এখান থেকে মানস ন্যাশনাল পার্ক ৭৫ কিলোমিটার। গুয়াহাটি থেকে ট্রেনে বরপেটা রোড চলে আসা যেতে পারে। সেখান থেকে গাড়িতে মানস জাতীয় উদ্যান। গুয়াহাটি সিটি সেন্টার এলাকা থেকে মানস যাওয়ার সরকারি-বেসরকারি বাস পাওয়া যাবে। সময় লাগে ৪ থেকে ৫ ঘন্টা।
থাকার ব্যবস্থা
বাঁশবাড়ি লজ (অবস্থান জঙ্গলের প্রবেশপথে), ফোনঃ ০৩৬১-২৬৬ ৭৮৭১।
মুসা জঙ্গল রিট্রিট, (কাছের রেঞ্জ বাঁশবাড়ি) ফোনঃ ০৭৮৯৬৪ ৭১৯৯২।
স্মাইলিং টাস্কার এলিফ্যান্ট ক্যাম্প, বাঁশবাড়ি, ফোনঃ ০৯৪৩৫২ ০৬২৯৬।
ফ্লোরিক্যান কটেজ, ফোনঃ ০৬০০১০ ৯০৪১৯।