গরুমারা অরণ্যের দক্ষিণাংশে এই কালিপুর ইকো ভিলেজ। মেদলার জঙ্গলের গা ঘেঁষে ইকো ভিলেজের অবস্থান। জঙ্গুলে পরিবেশের সঙ্গে গ্রামীণ জীবনযাত্রার নানা চিত্র চোখে পড়ে কালিপুর ইকো ভিলেজ-সংলগ্ন এলাকায়। মোষের গাড়িতে করে গ্রাম বেড়াতে যাওয়া যায়। বুধারাম, চাটুকা, বিছাভাঙ্গা প্রভৃতি গ্রামের অনেক মানুষ গরুমারার জঙ্গলের ওপর নির্ভরশীল। কালীপুরও জঙ্গলে ঘেরা একটি গ্রাম।

কালিপুর ইকো ভিলেজ-সৌজন্যে: ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট্ ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি
কাছেই মেদলা ওয়াচটাওয়ার। গণ্ডারের দেখা পাওয়া যেতে পারে মেদলা নজরমিনার থেকে। একশৃঙ্গ গণ্ডার। ভারতে একশৃঙ্গ গণ্ডার রয়েছে একমাত্র গরুমারা অরণ্যেই। হাতির পিঠে চড়ে মেদলার ওয়াচটাওয়ারে যাওয়া যায়। কালিপুর ইকো ভিলেজ থেকে খানিকটা হেঁটে গেলে যাদবপুর চা-বাগান। উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব দিক থেকে চায়ের বাগান পেরিয়ে গেলে মূর্তি নদী। রোমাঞ্চ, বৈচিত্র ও সৌন্দর্যের বিনুনি বাঁধা আছে কালিপুরে। কালিপুর ইকো ভিলেজ চত্বরে একটি শিমূল গাছকে গ্রামবাসীরা পুজো করে। গাছটিকে কেন্দ্র করে লৌকিক নাচ-গানের আসর বসে।
হিমালয়ের পাদদেশে ডুয়ার্স অঞ্চলে গরুমারা অরণ্যাঞ্চল। জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার সাব-ডিভিশনের অন্তর্গত গরুমারা বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত হয় ১৯৪৯ সালে। জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা পেয়েছে ১৯৯৪ সালে। ৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গরুমারা অরণ্যের অন্দরে থাকার জন্য রয়েছে গরুমারা রাইনো ক্যাম্প, গরুমারা এলিফ্যান্ট ক্যাম্প (ধূপঝোরা) ও চাপরামারি ওয়াইল্ডারনেস ক্যাম্প, পানিঝোরা। সব জায়গাই তার নিজের নিজের মতো।

গরুমারা অরণ্যাঞ্চল
দিনে কত ছবি। দিনের জঙ্গল, বন্যপ্রাণী দেখার জন্য অরণ্যের বিভিন্ন অংশে রয়েছে নজরমিনার। মেদলা, যাত্রাপ্রসাদ, চকচুকি ও চন্দ্রচূড় ওয়াচটাওয়ার। চুকচুকি ওয়াচটাওয়ার থেকে নানা পাখির দেখা মেলে। পরিষ্কার আবহাওয়ায় গরুমারা রাইনো ক্যাম্প চত্বর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়।
রাতটা অনুভবের। কান পেতে শোনার। হঠাৎ কোনও জন্তু বা পাখির ডাক নাড়িয়ে দিতে পারে সত্ত্বাকে। জোছনায় বন বড় মায়াময়।
একশৃঙ্গ গণ্ডার গরুমারার অহঙ্কার। হাতি, গাউর বা বাইসন, লেপার্ড ইত্যাদি-সহ প্রায় ৪৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০০ প্রকার পাখি, অন্তত বিশ প্রজাতির সাপ, নানা কীটপতঙ্গ রয়েছে গরুমারার জঙ্গলে। নদী, অন্য জলাশয়ে পাওয়া যায় ২৭ প্রজাতির মাছ। ৭ প্রজাতির কচ্ছপের আবাস গরুমারা অরণ্য।
শাল শিমূল শিশু টিক বহেড়া ওদাল খয়েরের গভীর জঙ্গল। বিস্তৃত ঘাসবন। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, জঙ্গলের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জলঢাকা। গ্রীষ্মে নদী শুষ্ক। বর্ষায় জলঢাকা উদ্দাম। মূর্তি, গরাতি, ইনডং গরুমারা অরণ্যের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত অন্যান্য নদী। ডুয়ার্সের অরণ্য, তার জীববৈচিত্রকে প্রাণবন্ত রেখেছে এইসব নদী।
গরুমারা অরণ্যে জিপ সাফারির ব্যবস্থাও আছে। তবে হাতির পিঠে চেপে জঙ্গল বেড়ানোর রোমাঞ্চই আলাদা। হাতি ঝোপঝাড় ভেঙে জঙ্গলের এমন সব এলাকায় চলে যায় যেখানে জিপ যেতে পারে না। কালিপুর থেকে এলিফ্যান্ট সাফারির ব্যবস্থা আছে। গরুমারা রাইনো ক্যাম্প এবং গরুমারা এলিফ্যান্ট ক্যাম্প (ধূপঝোরা) থেকেও হাতির পিঠে চেপে জঙ্গল সাফারি করা যায়।
যাওয়ার পথ
ট্রেনে নিউ মাল জংশন স্টেশনে নেমে একটা গাড়ি ভাড়া করে গরুমারা চলে আসুন চালসা হয়ে। দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে গরুমারা ৯৫ কিলোমিটার।
থাকার ব্যবস্থা
কালিপুর ইকো ভিলেজ একটি অরণ্য-আবাস। পরিচালনা করে রাজ্যের বনবিভাগ। থাকার জন্য রয়েছে ৪টি কটেজ। ডিলাক্স ঘরের ভাড়া ২০০০ টাকা (ব্রেকফাস্ট সহ)।
ঘর বুক করতে পারেন এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমেঃ www.wbfdc.net ফোনঃ ৭৬০৪০৪৪৪৭৯ (বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টে)। গরুমারার অন্য কোনও অরণ্য-আবাসও বুক করা যাবে এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই।
কাছাকাছি
গরুমারা জাতীয় উদ্যানের প্রায় গা ঘেঁষে ছোট্ট, সুন্দর শহর চালসা। চালসায় একটা দিন থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেন পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের শেষ গ্রাম বিন্দু থেকে। ভারত-ভুটান সীমান্তে বিন্দুর অবস্থান। চালসা থেকে ডুয়ার্সের আরেক ভ্রমণ ঠিকানা সামসিং ১৫ কিলোমিটার।
পাহাড়ের ঢালে ঢালে মখমল সবুজ চায়ের বাগান। দূরে দূরে নীলচে আভার পাহাড়। চায়ের বাগানকে ঘিরে জঙ্গল। মন মাতানো ফুলের বাগান। শীতে কমলালেবুর বাগানগুলো এক আশ্চর্য আলোয় উদ্ভাসিত হয়। সকালে ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে। গ্রীষ্মে আরামদায়ক আবহাওয়া। জায়গাটা ফাগু।
হাতে সময় থাকলে অরণ্যের ছায়াঘন পরিবেশের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে একটা দুটো দিন কাটাতে পারেন চা-বাগানের এমন ঝলমলে পরিবেশে। মালবাজার থেকে আশেপাশের নানা চা-বাগান দেখে আসা যায়। ফাগুর চা-বাগানের পরিবেশ পর্যটকদের মন কেড়েছে। গরুমারা থেকে চালসা হয়ে ফাগুর রাস্তা। নিউ মাল জংশন স্টেশন থেকে লোয়ার ফাগু টি এস্টেট ১৯ কিলোমিটার। চালসা থেকেও লোয়ার ফাগুর দূরত্ব একইরকম। মালবাজার থেকে ফাগু ২০ কিলোমিটার। এন জে পি থেকে সরাসরি ফাগু ৭৫ কিলোমিটার।
ফাগুতে থেকেও গরুমারার অরণ্য বেড়িয়ে আসা যায়। ফাগু থেকে খানিকটা নীচের দিকে ফাফর খেতি। সবুজ প্রেক্ষাপটে চেল নদী, ঝর্ণা, পাখি, চায়ের বাগান, সব মিলিয়ে অনিন্দ্যসুন্দর পরিবেশ। যেতে পারেন ফাগু টি ফ্যাক্টরিতে। সঙ্গে গাইড নিয়ে জঙ্গলের পথে ট্রেক করতে পারেন। হাঁটাপথে গ্রাম বেড়াতে পারেন।

ফাগু। ছবি সৌজন্যে: দ্য রিসার্ভ ফাগু।
থাকার ব্যবস্থা
চালসায়ঃ হোটেল সেন্টার পয়েন্ট, ফোন ৯৪৩৪৪-৬১৬০৩। রিলায়েবল হোমস্টে, ফোন ৯৬১৪৮-১০১৯৪। জে এম ডি রিসর্ট, ফোন ৯৮৩০০-৯৩০০৭। সিনক্লেয়ার্স রিট্রিট, ৩৫৬২২-৬০২৮২।

চালসা
বিন্দুর দিকটাতে থাকা যায় প্যারেন-ঝালং-বিন্দু পথের যে-কোনও জায়গায়। কয়েকটি থাকার জায়গাঃ
বনানী (পশ্চিমবঙ্গ অরণ্য উন্নয়ন নিগম), ফোন ৭৬০৪০-৪৪৪৭৯। জলঢাকা হোমস্টে, ফোন ৯৪৩৪৯-৪১৩২৮। ঋতিকা হোমস্টে (ঝালং), ফোন ৯৪৭৫৯-৪৬০৯০। ঝালং রিভার ক্যাম্প (পশ্চিমবঙ্গ অরণ্য উন্নয়ন নিগম), ফোন ৭৬০৪০-৪৪৪৭৯। হামরো হোম ঝালং রিসর্ট, ফোন ১৮০০ ১২৩ ৩৭৫৯। হোমস্টে বাজার (ঝালং-বিন্দু রোড), ফোন ৯৪৭৫৯-৪৫৪১৫। মিয়াং প্যারেন, ফোন ৯৪৭৫৭-৫৮৫২৭। নেচার ক্যাম্প রিট্রিট, প্যারেন ফোন ৯৮৭৪৪-৩৯৫৭১।
ফাগুতেঃ দি রিজার্ভ, ফাগু, ফোন ৯৭৩৩৫-০৮৬০০।
ফাগু টি এস্টেটের শতাব্দী প্রাচীণ ব্রিটিশ বাংলোতে থাকা যায়। ফাগু বাংলোয় এখানে সেখানে ব্রিটিশ স্টাইলের নানা নমুনা চোখে পড়বে। ফোন ০৩৩-২৫২৯-৯৬৮৯/ ৯৮৩৬০-৭৭২০২।

ফাগু টি বাংলো