Follow us
Search
Close this search box.

টোকিওর শিনজুকু উদ্যানে চেরি ব্লজম

টোকিওর শিনজুকু উদ্যানে চেরি ব্লজম

শেখর বসু

জাপান ভ্রমণে বেরিয়েছেন লেখক। ব্যস্ত ভ্রমণ সূচির মধ্যেই জাপান থেকে লেখাটি পাঠিয়েছেন। কয়েকটি পর্বে প্রকাশিত হবে তাঁর জাপান বেড়ানোর কথা। এটি প্রথম পর্ব।

কলকাতা থেকে ব্যাঙ্কক হয়ে টোকিও পৌঁছালাম যখন, ওখানকার সময় অনুসারে তখন বিকেল সাড়ে ৩টে। ভারত থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টা এগিয়ে জাপানের সময়। কলকাতায় তখন বেলা ১২টা। আজ ১ এপ্রিল, ২০২৬। মার্চ থেকে মে, অন্তত মে মাসের প্রথমার্ধ পর্যন্ত জাপানে বসন্ত। মার্চের শেষার্ধ থেকে এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহ জাপানের দিগ্বিদিকে ঝাঁকে ঝাঁকে চেরি ফুল ফোটে। জাপানের সেই চেরি ফুলের উৎসব ‘চেরি ব্লজম’ নামে খ্যাত। চেরি ফুলের উৎসব জাপানি ভাষায় ‘সাকুরা’ নামে পরিচিত। সারা পৃথিবী থেকে পর্যটকরা প্রকৃতির সেই উৎসবে শামিল হতে জাপান ভ্রমণে আসেন এ সময়ে। আমিও এ সময়টাকে জাপান বেড়ানোর জন্য বেছে নিয়েছি ওই সাকুরার একটা ঝলক চাক্ষুষ করার আশা নিয়েই।

জানা গেল, টোকিওর শিনজুকু গোয়েন তথা শিনজুকু পার্কে রাশি রাশি চেরি ফুটেছে। এটি জাপানের একটি জাতীয় স্তরের উদ্যান। রওনা দিলাম সিনজুকুর উদ্দেশে। টোকিওর ২৩টি সিটি ওয়ার্ডের একটি শিনজুকু অঞ্চলটি। শিনজুকুর রেল স্টেশনটি পৃথিবীর ব্যস্ততম রেলস্টেশনগুলির একটি। টোকিওর কেন্দ্রস্থল থেকে ট্রেনে শিনজুকু পৌঁছে যাওয়া যায় লাইন অনুসারে ১৫ থেকে ২৫ মিনিটের মধ্যে। স্টেশন চত্বর থেকে হাঁটাপথে ১০ মিনিটের মধ্যে শিজুকু পার্কে পৌঁছে যাওয়া যায়। বাস, উবরের মতো যানও পাওয়া যাবে। সড়কপথে পৌঁছালাম শিনজুকু গোয়েন ন্যাশনাল পার্কে। প্রবেশমূল্য ফি ৫০০ ইয়েন। ভারতের রুপির হিসেবে ২৯৩ টাকার মতো। সিনিয়র সিটিজেন, ছাত্রছাত্রী ও শিশুদের জন্য ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

হালকা গোলাপি রঙের চেরি ফুলে ছেয়ে আছে শিনজুকুর উদ্যান। নানা প্রজাতির চেরি ফুল ফুটেছে। কেন্দ্রে লালের ছিটে দেওয়া সাদা ফুলও চোখে পড়ল। জানা গেল, সহস্রাধিক চেরি ফুলের গাছ আছে এই উদ্যানটিতে। সকলে মিলে সে চমৎকার এক চোখ ও মন জুড়োনো দৃশ্য। খানিকক্ষণ শুয়েছিলাম ফুলে ছাওয়া এক গাছের নীচে নরম ঘাসের ওপর।

১৪৪ একর এলাকা জুড়ে পার্ক। ছোট ছোট জলাশয়, তার উপর দিয়ে ছোট ছোট সুদৃশ্য ব্রিজ, ফুলে ভরা গাছ, শান্ত পরিবেশ, এ-সব নিয়ে ঐতিহ্যমণ্ডিত জাপানি ঐতিহ্যের বাগিচার সঙ্গে, ফরাসি ও ব্রিটিশ রীতির বাগানও রয়েছে শিনজুকু পার্কের মধ্যে। ফরাসি স্টাইলের বাগিচায় ইউরোপিয়ান ল্যান্ডস্কেপিং সম্পর্কে একটা ধারণা হয়। অনেকটা উন্মুক্ত ধরনের ব্রিটিশ রীতির বাগানের আরেকটা অংশ রয়েছে শিনজুকু গোয়েনে।

১৮৭৯ সালে সম্রাটদের আমলে ‘শিনজুকু ইম্পিরিয়াল বোটানিক্যাল গার্ডেন’ তৈরির কাজ শেষ হয়েছিল। সে-ছিল রাজকীয় উদ্যান। সাধারণের জন্য ছিল নানা বিধিনিষধ। দ্বিতিয় বিশ্বযুদ্ধে দু’দুটো পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণ জাপান জুড়ে ধ্বংসলীলা চালালো। এই সময়ে শিনজুকুর উদ্যানও কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ধ্বংস্তূপের মধ্যে থেকে উঠে আসা একটা জাতি ফের গড়ে তুলল দেশটাক, সুন্দর করে। অত্যন্ত যত্ন করে শিনজুকুর উদ্যানটিকেও ফের জীবন্ত রূপ দেওয়া হল। ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটল। ১৯৪৯ সালে আম জনতার জন্য খুলে গেল শিনজুকুর ছবির মতো এই উদ্যানটি। নিয়ম-কানুন বদলালো। বদল ঘটল না উদ্যানের পুরনো রূপটির। সেটাই যেন ছিল রূপকারদের চ্যালেঞ্জ।

শিনজুকু উদ্যানের মধ্যে থেকে আকাশচুম্বী সব অট্টালিকা দেখা যায়। পশ্চিম শিনজুকুকে ‘স্কাইস্ক্রাপার ডিস্ট্রিক্ট’ বলা হয়। পূর্ব শিনজুকু বিখ্যাত এর এন্টারটেনমেন্ট জগতের জন্য। বিশাল সব শোরুম, হোটেল, রেস্তোরাঁ, কাফে, বার, সব মিলিয়ে বছরভরই জমজমাট। এখানকার নাইটলাইফ নিয়নের রংবাহারী আলোয় উদ্ভাসিত হয়। খুব ব্যস্ত শহর শিনজুকু। তার ফুসফুস যেন গোয়েন বা উদ্যানটি। শহরটা ধুলোয়, জঞ্জালে ভরা থাকলে শিনজুকুর উদ্যানটি এমন প্রাকৃতিক থাকতে পারত না। পরিচ্ছন্নতার জন্য জাপানের প্রসিদ্ধি বিশ্বজুড়ে। শিনজুকু প্রকৃতই ঝকঝকে। তাই শিনজুকুর এই উদ্যান সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনা আসলে বৃহত্তর এক ব্যবস্থাপনার অংশ। সেই ম্যানেজমেন্টটা উপলব্ধি করতে পারলে মাথাটা আমাদের ঝুঁকে আসে। প্রখর শৃঙ্খলাবোধ জাপানিদের। সেটা প্রকৃতই স্বচ্ছ জাপানের গুপ্তমন্ত্র বলে মনে হয়েছে আমার।

সর্বোচ্চ ফটোটি টোকিওর রেনবো ব্রিজ।
ফটো লেখক –

Comments are closed.