তুষার পাত্র
পাথরে খোদাই করা এত সূক্ষ্ম কারুকার্য আগে দেখিনি। একটা মোড় ফেরা মানেই যেন আরেকটা বিস্ময়ের মুখোমুখি হওয়া। কর্নাটকের বেলুরে চেন্নাকেশব মন্দিরচত্বরটিতে ঢুকে পড়ার মানে যেন এক অন্য জগতে প্রবেশ করা। মন্দিরগাত্রের শিল্পকর্মে দ্বাদশ শতকের আঞ্চলিক জীবনচর্চার নানা চিত্রের সঙ্গে রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরানের নানা দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাথর খোদাই করে। সেই শিল্পকর্মের নৈপুণ্য দর্শককে বিস্ময়ে হতবাক করে দেয়।

চেন্নাকেশব মন্দিরটি দক্ষিণ ভারতে হোয়সল বংশের রাজত্বকালে নির্মিত হয়েছিল। এ বংশের আদি নিবাস ছিল পশ্চিমঘাট অঞ্চলে। চালুক্য ও চোলাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজেদের রাজত্ব তৈরি করে হোয়সলরা। দশম থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত কন্নড়ভাষী হোয়সলরা রাজত্ব করেছে কর্নাটকে। সেই রাজত্বকালটি কর্নাটকের স্থাপত্যশিল্পকে এক উচ্চাঙ্গের তারে বেঁধে দিয়েছিল। কর্নাটকের সাহিত্যও প্রভূত উন্নতি করেছিল এ সময়ে। চতুর্দশ শতকে প্রথমে আলাউদ্দিন খলজি, তারপরে মহম্মদ বিন তুঘলকের আক্রমণে হোয়সল রাজত্বের পতন ঘটে।

প্রথমে বেলুর রাজধানী স্থাপন করেছিল হয়সলরা। পরবর্তীকালে হলেবিড়ুতে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। হলেবিড়ুতেও রয়েছে বিখ্যাত হোয়সলেশ্বর মন্দির। মহীশূর (মাইসোর) থেকে বেলুরের দূরত্ব ১৫০ কিমি। বেঙ্গালুরু থেকে ২২০ কিলোমিটার। কর্নাটকের হাসান শহর থেকে বেলুর ৩৫ কিলোমিটার। বেলুর থেকে হলেবিড়ু শহর ১৬ কিলোমিটার।

বেলুড়ের চেন্নাকেশব স্বামী মন্দির ও হলেবিড়ুর হয়শলেশ্বর মন্দির দেখতে সকাল ৮টা নাগাদ গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলাম মহীশূর থেকে। চমৎকার রাস্তা। ঘন্টা তিনেকের মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিলাম বেলুরে। দূর থেকে দেখা যায় মন্দিরের তোরণ। প্রবেশ মূল্য নেই। গাড়ির জন্য পার্কিং ফি দিতে হয়। বিশাল বর্গাকার মন্দির চত্বর। ১১১৬ সালে হয়সল রাজা বিষ্ণুবর্ধন ইয়াগাচী নদীর তীরে চেন্নাকেশব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে হোয়সল রাজবংশের তিন প্রজন্ম ধরে মন্দির নির্মাণের কাজ চলেছিল। ‘চেন্না কেশব’ মানে ‘সুন্দর কেশব’। বিষ্ণু মন্দির এটি। মূল মন্দিরটির চারিপাশে ছড়িয়ে রয়েছে আরও কিছু মন্দির। প্রধান মন্দিরের গর্ভগৃহকে প্রদক্ষিণের জন্য পথ রয়েছে। মন্দিরে প্রবেশ করার পরেই চোখ আর মন টেনে নেবে মন্দিরের গঠনশৈলী ও মন্দিরগাত্রের অবিশ্বাস্য সব শিল্পকর্ম। মূল মন্দিরের এক পাশে রয়েছে নরসিংহ স্তম্ভ। ৩০ ফুট উচ্চতা ও প্রায় ৪৫ টন ওজনের গ্ৰানাইট পাথরের এই স্তম্ভেও রয়েছে খোদাই করা কারুকাজ। আসাধারণ জ্যামিতিক পরিকল্পনা কাজ করছে বিপুল স্তম্ভটির শয়ে শয়ে বছর ধরে দণ্ডায়মান থাকার পিছনে। শিল্প ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটেছে এক্ষেত্রে।

মন্দির প্রাঙ্গণে দীর্ঘক্ষণ ঘোরাঘুরির পর বীরনারায়ণ মন্দিরের বারান্দায় বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলাম। এবার যাব হলেবিড়ুর মন্দির দর্শনে। রাস্তায় এক হোটেলে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নেওয়া গেল। এখানেও মন্দিরে প্রবেশের জন্য কোনও মূল্য লাগে না। বেলুরে বিষ্ণুমন্দির। এ মন্দিরের আরাধ্য দেবতা শিব। সূর্যদেবের জন্য আলাদা গর্ভগৃহ রয়েছে। এখানেও মন্দিরগাত্রে রয়েছে অসাধারণ সব কারুকাজ। হয়সল রাজত্বের স্বর্ণযুগে, দ্বাদশ শতকে এই মন্দিরচত্বরটি গড়ে উঠেছিল। হোয়সল শিল্পকলার অবিশ্বাস্য নিপুণতার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে হলেবিড়ুর হয়সলেশ্বর মন্দির।

বেলুর ও হলেবিড়ুর দুটি মন্দিরচত্বরই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। করে নেবারই কথা। প্রাচীন শিল্পসৌকর্যের নিরিখে এ তো সমগ্র মানব্জাতির কাছেই অমূল্য সম্পদ। এইসব অমূল্য সম্পদ রক্ষাই এখন চ্যালেঞ্জ।
ফটো লেখক






