পহলগাম থেকে গিয়েছিলাম কাশ্মীরের অফবিট ভ্রমণ ঠিকানা দকসুমে। ২,৪৩৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত দকসুম অনন্তনাগ জেলার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। অনন্তনাগের শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার। পহলগাম আগে দেখা। দকসুম প্রথম। সেখান থেকে বরফে বরফে ছয়লাপ সিন্থন টপে। পথে মার্তণ্ড মন্দির দর্শন হয়েছে। মুঘল সম্রাজ্ঞী নুর জাহানের প্রিয় বাগিচা আছাবলে খানিক সময় কেটছে। দকসুম, সিন্থন টপ দেখে পহলগামে ফেরার পথে কোকেরনাগের অনেকগুলো ধারায় প্রবাহিত ঝরনাটিও দেখা হল। গত বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধ। এদিন সকাল ১০টা নাগাদ পহলগাম থেকে শ্রীনগরের উদ্দেশে যাত্রা করা গেল।

আসার সময়ে শ্রীনগর পৌঁছেছিলাম শেষ বিকেলে। রাতটা কেটেছিল শ্রীনগরের হোটেলে। ওই প্রথম দিন সন্ধ্যায় বেরিয়েছিলাম একটু। গিয়েছিলাম জিরো ব্রিজে। কাঠের আর্চ ব্রিজ। নীচ দিরে বয়ে চলেছে কাশ্মীরের বহু ইতিহাসের সাক্ষী ঝিলম নদী। পঞ্চাশের দশকে তৈরি হয়েছিল এই সেতুটি। আশির দশকে ব্রিজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে চালু হয় আবার। জায়গাটা শ্রীনগরের একটি হেরিটেজ ল্যান্ডমার্ক। এখন হেঁটে সেতুটি পারাপার করা যায়। সেদিন সন্ধ্যায় শ্রীনগরের তাপমাত্রা ছিল ৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। ভালোই ঠান্ডা লাগছিল। অবশ্য পহলগামে থাকার সময়ে মনে হয়েছিল, শ্রীনগরের ঠান্ডা তো কিছুই নয়। রাতে পহলগামের তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছিল প্রায় মাইনাসের ঘরে। শ্রীনগরে পৌঁছালাম বেলা ১টা নাগাদ। টিউলিপ ফেস্টিভ্যাল চলছে এখন। এপ্রিলের শ্রীনগরের প্রধান আকর্ষণ ওই টিউলিপের বাগিচা। ভ্রমণার্থীও প্রচুর।
মধ্যাহ্নভোজন সেরে গেলাম জবরওয়ান পর্বতশ্রেণির পাদদেশে টিউলিপের বাগিচায়। প্রকৃতির বর্ণবহুল বিশাল এক ক্যানভাস। বিভিন্ন প্রজাতির টিউলিপের সঙ্গে ফুটেছে ডাফোডিল, হায়াসিন্থ, নার্সিসাস, মুসকারিয়া, আইরিস ফুল। ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ান দিয়েছে যেন আকাশপানে। মানুষ বিস্মিত হয়ে দেখছে সেই বর্ণবাহার।
প্রবল শীতের মরসুম পেরিয়ে মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে মাঝ-এপ্রিল পর্যন্ত অতীতের ফিরোজ বাগ, বর্তমানের ‘ইন্দিরা গান্ধি মেমোরিয়াল টিউলিপ গার্ডেন’ ফুলে ফুলে, রঙে রঙে ছয়লাপ। শ্রীনগর শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে টিউলিপ গার্ডেনের দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। পাশেই ডাললেক।

এই সময়ে হালকা গোলাপী আর সাদার মিশেলে অ্যামন্ডের ফুল ফোটে কাশ্মীরে। শ্রীনগরের বাদামওয়ারীর অ্যামন্ড বাগানে ঝাঁকে ঝাঁকে সে ফুল দেখা যায়। মার্চের শেষ দিক থেকে চেরি, পিচ অ্যাপ্রিকটের ফুল ফুটতে শুরু করে। নেদারল্যান্ডসের কেউকেনহফকে ইউরোপের বাগান বলা হয়। এখানকার টিউলিপ জগদ্বিখ্যাত। শ্রীনগরের ইন্দিরা গান্ধি মেমোরিয়াল টিউলিপ গার্ডেন এশিয়ার বৃহত্তম টিউলিপ বাগিচা। গোটা কাশ্মীর উপত্যকাটাই এ সময়ে ফুলের সাজে সেজে ওঠে।

সন্ধ্যায় বেরিয়ে এলাম টিউলিপ গার্ডেন থেকে। ডাললেকের পারে বুলেভার্ড রোড জমজমাট। প্রচুর পর্যটক। বাতাসে তুজির (কাবাব) আঘ্রাণ। ডাললেক থেকে দূরের পাহাড়ে আলোকিত পরীমহল স্বপ্নের মতো মনে হয়। ব্যস্ত হাউসবোট, গমগমে হোটেল-রেস্তোরাঁ, শ্রীনগরে বসন্তোৎসব।
মার্চ থেকে মে-র প্রথমার্ধ পর্যন্ত উপত্যকায় জাগ্রত থাকে বসন্তের মরসুম। পাহাড় ঢালের ঘাসে ঘাসে ছোট ছোট নাম না জানা আরও কত যে ফুল। কোথাও কোথাও ছোট আকারের হলুদ বর্ণের সর্ষের খেত চোখে পড়েছে। রঙিন চিনার, উপত্যকার গ্রামে গ্রামে অ্যামন্ড, পিচ, চেরি ফুল, রাস্তায় চলতে চলতে স্নো-ড্রপ, ফরসিথিয়া, ডাফোডিল।

শ্রীনগরের বাজারগুলোতে নানা আকার ও নকশার বাস্কেট চোখে পড়েছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম, ওগুলো পিকনিকের বাস্কেট। এ সময়ে প্রধাণত উইলো কাঠের তৈরি এই বাস্কেটের চাহিদা বাড়ে। ঘর সাজানো বা অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য ভ্রমণার্থীরা সুদৃশ্য এই বাস্কেট কিনতে পারেন। লোকাল বাজারে ঢুঁ মারতে হতে পারে জিনিসটি হস্তগত করার জন্য। দামেও খানিক সস্তা হবে সেখানে। সুভেনির বা গিফট হিসেবে চমৎকার।
আগে দু’বার কাশ্মীর ভ্রমণে এসেছি। বসন্তের কাশ্মীরে এই প্রথম। এলাম, দেখলাম এবং বর্ণময় আরেক কাশ্মীর উন্মোচিত হল চোখে, মনে।
ফটোঃ উপর থেকে নীচে যথাক্রমে –
গ্রেটার কাশ্মীর
কাশ্মীর লাইফ
ইন্ডিয়াফিল্ডস
ভিলেজ স্কোয়ার
লেখক



