ওড়িশা, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী অধ্যুষিত বনাঞ্চলগুলিতে লাল পিঁপড়ের চাটনি বহুকাল ধরেই একটি সুখাদ্য। উপাদেয় ও উপকারি পদ হিসেবে খাওয়া হয়। এখন সেইসব বনাঞ্চলে বেড়াতে গিয়ে অনেক পর্যটকই লাল পিঁপড়ের চাটনি চেখে দেখছেন। ওডিশার ময়ূরভঞ্জ জেলা সম্প্রতি ‘কাই চাটনি’র দেশজ রেসিপির জন্য জিওগ্র্যাফিক্যাল ইন্ডিকেশন ট্যাগ পেয়েছে। অর্থাৎ, এখানকার লাল পিঁপড়ের চাটনি ঐতিহ্যশালী খাদ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল খাদ্য-দরবারে। ময়ূরভঞ্জে লাল পিঁপড়ের চাটনি ‘কাই চাটনি’, ‘সিমলিপাল কাই চাটনি’ নামে পরিচিত। ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়ে পিঁপড়ের চাটনির হাও রিত, চাপড়া চাটনি, ছাপড়া চাটনি, কুরকুট চাটনি নামেও পরিচিত।
পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার আদিবাসীদের মধ্যে কুরকুট চাটনি খাওয়ার চল রয়েছে। পিঁপড়ের চাটনিকে এখানে কুরকুট বা কুড়কুড চাটনি বলে। পার্বণে, ভোজে, মুখের রুচি বদলে আদিবাসীদের ঘরে পিঁপড়ের চাটনি তৈরি হয়েই থাকে। খাদ্যের আকালেও পিঁপড়ে, পিঁপড়ের ডিম আদিবাসীদের সহায় হয়েছে।
ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি, কাঁকরাঝোর, আমলাশোল, ময়ূরঝর্ণা, আমঝর্ণা, খাঁদারানি, তারাফেনি, ঘাঘরা, লালজল প্রভৃতি এলাকাগুলি এখন পর্যটক-প্রিয় এলাকা। এইসব এলাকার আদিবাসীদের মধ্যে লাল পিঁপড়ে ও পিঁপড়ের ডিমের চাটনি খাওয়ার বহুল প্রচলন রয়েছে। আদিবাসীদের যে রেসিপিটি পর্যটকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে সেটি হল ব্যাম্বু-চিকেন। নানা মশলা-সহযোগে মুরগির মাংশের টুকরো বাঁশের মধ্যে পুরে সেই বাঁশের খণ্ডটি পুড়িয়ে নেওয়াই রান্না। সেই রান্নার সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে আদিবাসীদের রন্ধন ঘরানা। এখন এইসব এলাকার অনেক হোমস্টে, লজেই আলাদা করে অর্ডার দিলে কুরকুটের চাটনি পাওয়া যাবে। আদিবাসীদের দোকানেও মিলবে খাদ্যবস্তুটি। বেলপাহাড়্রির একটি গেস্টহাউসের নাম ‘লাল পিঁপড়ে ফ্যামিলি গেস্টহাউস’।

ময়ূরভঞ্জ কাই সোসাইটি লিমিটেড কাই চাটনির জি আই ট্যাগের জন্য আবেদন করেছিল ২০২০ সালে। লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। কাই সোসাইটি লাল পিঁপড়ের রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহার নিয়ে কাজ করে থাকে। ভুবনেশ্বরে অবস্থিত ওড়িশা ইউনিভার্সিটি অফ এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা লাল পিঁপড়ে নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন, এই পিঁপড়েয় রয়েছে মূল্যবান সব প্রোটিন এবং আয়রন, ক্যালশিয়াম, জিঙ্ক, ভিটামিন বি-১২, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, অ্যামাইনো অ্যাসিড প্রভৃতি। মোদ্দা কথা হল, লাল পিঁপড়ের খাদ্যগুন প্রচুর।
বন-জঙ্গল থেকে পিঁপড়ে সংগ্রহ করেন আদিবাসীরা। শাল, আম, কাঁঠাল, লিচু প্রভৃতি গাছের পাতায় বাসা বাঁধে লাল পিঁপড়ের দল। পাতা গুটিয়ে তার মধ্যে বাসা তৈরি হয়। পাতা সেলাই করতে নিজেদের লার্ভা থেকে উৎপাদিত তন্তু ব্যবহার করে পিঁপড়েরা।

আদা, রসুন, লঙ্কা, নুন-সহযোগে পিঁপড়ে বেটে চাটনি তৈরি হয়। আদিবাসীদের আঞ্চলিক বাজারগুলিতে লাল পিঁপড়ে বিক্রি হয়। দাম বাড়ছে ক্রমশ, ৪০০-৬০০ টাকা কেজি। শুধু খাদ্য নয়, আদিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন অসুখের চিকিৎসাতেও লাল পিঁপড়ে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জ্বর, সর্দিকাশি, হাড়ের ব্যথার উপশমে, দুর্বলতা কাটাতে লাল পিঁপড়ে থেকে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করা হয় আদিবাসী সমাজে।
আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরে একইসঙ্গে পথ্য ও ওষুধ হিসেবে লাল পিঁপড়ে ব্যবহার করে আসছে। তাতে পিঁপড়ের বংশ নির্বংশ হয়ে যায়নি কিন্তু। জোগান-চাহিদার বাস্তব ম্যানেজমেন্টটা বোঝেন তাঁরা । ব্যবহারের মধ্যে যথেষ্ট সতর্কতাও বজায় থাকে। জঙ্গলের মহলগুলিতে শালপাতায় মোড়া পিঁপড়ের চাটনি এবার ‘ট্রাইবাল ডেলিকেসি’ হিসেবে ঝলমলে রেস্তোরাঁয় টেবিলে চলে এলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ফটো সৌজন্য-
চলো ওড়িশা
ডিসকভার ইস্ট




