Follow us
English

স্বামী বিবেকানন্দের আলমোড়ায়

স্বামী বিবেকানন্দের আলমোড়ায়

প্রসঙ্গতঃ ২০২১-এর জুলাই মাসে ‘ভ্রমণ-কথা’ বিভাগে ‘স্বামী বিবেকানন্দের আলমোড়ায়’ শিরোনামেই এই ভ্রমণ-আলেখ্যটি প্রকাশিত হয়েছিল। বহু পাঠক লেখাটি পড়েছেন। আবার অনেকে পড়ে উঠতে পারেননি। লোকমুখে জেনে এবং লেখাটি সম্পর্কে মন্তব্য পড়ে অনেকেই পুনরায় এই লেখাটি প্রকাশের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। লেখাটি তোর্সা ডট ইন-এর ‘আর্কাইভ’-এ ছিল। তবে খুঁজে পাননি অনেকে। সবদিক বিবেচনা করে লেখাটি পুনরায় প্রকাশ করা হল।

সাল ২০১৮। দুর্গাপুজোর নবমীর মাঝরাতের বিমানে চলেছি দিল্লি। সকালে দিল্লি থেকে শতাব্দী এক্সপ্রেস ধরে পৌঁছাব কাঠগোদাম। সেখান থেকে শুরু হবে আমার কুমায়ুন যাত্রা। আমার এবারের এই কুমায়ুন ভ্রমণের বিশেষ একটি উদ্দেশ্য আছে। সে-কথায় আসি।

উত্তর কলকাতার গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের দামাল ছেলে বিলে, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নরেন, আমাদের ভালোবাসার, শ্রদ্ধার স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকার শিকাগো শহরে সর্বধর্ম মহাসম্মেলনে হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করলেন ১৮৯৩ সালে, এ বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ধর্ম মহাসম্মেলনে তাঁর দেওয়া বক্তৃতা ধর্মের ইতিহাসে এক যুগসন্ধিক্ষণ সৃষ্টি করল। আমেরিকা থেকে ফেরার পথে কলম্বো এবং দেশে ফিরে আলমোড়া-সহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর দেওয়া বক্তৃতাগুলি পরে সংকলিত হয় ‘কলম্বো থেকে আলমোড়া’ গ্রন্থটিতে। কৈশরে বইটি পড়ে খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম এবং তখনই ঠিক করেছিলাম, ভবিষ্যতে আলমোড়া গিয়ে স্বামীজির স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলো দেখব।

আলমোড়া যাত্রা

সময় হল ২০১৮-য়। কালের সমাপতন। এ বছরই স্বামীজির শিকাগো বক্তৃতার ১২৫ তম বছর উদযাপিত হচ্ছিল দেশে-বিদেশে। নৈনিতাল, রানীক্ষেত, কৌশানি হয়ে আনন্দিত ও শান্ত মন নিয়ে চলেছি আলমোড়া অভিমুখে। তুষারাবৃত হিমালয়ে অরুণোদয়ের উত্তাপ গায়ে মেখে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম কৌশানির গান্ধি আশ্রম থেকে। পাহাড়, জঙ্গল, সবুজ উপত্যকা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি। আলমোড়া শহরকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলেছি দিনাপাণির দিকে। এই সেই পবিত্র ভূমি, যেখানে স্বামীজি এসেছেন বারবার।

মনের সাধ, স্বামীজির স্মৃতিধন্য সব জায়গাগুলো খুঁজে খুঁজে দেখব। যাওয়ার তিন-চার মাস আগে থেকে তথ্যানুসন্ধান করেছি, নানা জনের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু ধারণা স্বচ্ছ হয়নি। আমাদের ড্রাইভার সুধীর ভাইয়ের কাছ থেকেও তেমন কোনও ধারণা পাওয়া গেল না। গৌতম বুদ্ধ যেমন বুদ্ধগয়ায় বোধিবৃক্ষের নীচে বসে ধ্যান করে বুদ্ধত্ব অর্জন করেছিলেন। তেমন নরেন্দ্রনাথ থেকে আধ্যাত্মিক উন্মোচনের মাধ্যমে বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার পর্বটি ঘটেছিল এই আলমোড়ায়, ১৮৯০ সালে। এরপর ১৮৯৮ সালে ভগিনী নিবেদিতা, ওলিবুল ও অন্যান্য কয়েকজনের সঙ্গে বিবেকানন্দ আলমোড়ায় আসেন এবং সোভিয়ার দম্পতির আতিথ্য গ্রহণ করেন।(১)

কাসার দেবীর মন্দির

পাইনের জঙ্গল পেরিয়ে নির্জন রাস্তা ধরে চলেছি। রাস্তাটা ঘুরতেই পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাম একটি উপত্যকার সামনে। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা অপরিসর রাস্তা। দেখেই বোঝা যায়, এ রাস্তায় তেমন লোক চলাচল হয় না। ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললাম। যেন মন থেকে ডাক এল, দাঁড়াও। গাড়ি থেকে নেমে একটু এগিয়ে যেতে ছোট একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। তাতে লেখা, ‘কাসার দেবী গুহা মন্দির। এখানে স্বামী বিবেকানন্দ ধ্যান করেছিলেন।’ কাসার দেবী দুর্গারই আরেক রুপ। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়লাম। এমনও হয়? কোনও ল্যান্ডমার্ক নেই, গুগুল ম্যাপের পথ ধরেও নয়, কেবল মনের টানে দাঁড়িয়ে পড়েছি। বাঁদিকে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে। দেখে বোঝা যায় এই সিঁড়ি ধরে নিয়মিত পদচারণা হয় না। আশেপাশে কোনও লোকালয়ও নেই।

কাসার দেবীর গুহামন্দির। ছবি সৌজন্য : লেখক

বেশ কয়েক ধাপ উঠতেই একটা ছোট গেট। নিস্তব্ধ পরিবেশ। শুধু বাতাসে গাছের পাতার আন্দোলনের শব্দ। ইতিউতি পাখির ডাক। চারিদিকে জঙ্গল। আরেকটু উঠতে কাসার দেবীর মন্দির চোখে পড়ল। পাশেই প্রকৃতির খেয়ালে গড়ে ওঠা একটি গুহা। গুহার সামনে লেখা আছে, এখানেই স্বামী বিবেকানন্দ ধ্যান করেছিলেন।

স্বামীজি প্রথমবার আলমোড়া এসেছিলেন ১৮৯০ সালে এবং ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই গুহাতেই পরপর তিনদিন(২) ধ্যানস্থ হয়েছিলেন। উপলব্ধি করেছিলেন, ‘কেবল আত্মসুখ নয়, নিপীড়িত মানুষের সেবাই আসল ধর্ম, জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ উল্লেখ্য, ১৮৯০-এর পরে আরও দু’বার, ১৮৯৭ ও ১৮৯৮ সালে বিবেকানন্দ আলমোড়ায় এসেছিলেন। স্বামীজির খুব প্রিয় স্থান ছিল এই আলমোড়া।

ছবি সৌজন্যে: লেখক

মন্দিরে গিয়ে একজন পূজারীর দেখা পাওয়া গেল। দেবীকে প্রণাম করে বেরিয়ে আসতে দেখলাম,অদূরে এক প্রাচীণ বৃক্ষের নীচে এক মাতাজি ধ্যানে বসে আছেন, চোখ বন্ধ। ওদিকে আর এগোলাম না। পাইন বনের মধ্যে দিয়ে শনশন হাওয়া বইছে। গোটা পরিবেশে দেবাত্মা হিমালয় ও স্থান মাহাত্ম্যের প্রভাব কাজ করছে। বড় রাস্তায় নেমে এলাম। একটু এগিয়েই কুমায়ুন টুরিজমের হোটেল। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ওখানেই। হোটেলের বারান্দা থেকে উপত্যকা, তুষারশুভ্র সব পর্বতশৃঙ্গ দেখা যায়।

জঙ্গলে ঘেরা সারদা মঠ

পরদিন সকালেই বেরিয়ে পড়লাম। কাসার দেবীর মন্দিরের পাহাড়ের পাশ দিয়ে একটা পরিষ্কার রাস্তা উপরের দিকে উঠে গেছে। গাড়ি নিয়ে ওঠা যায় ওই রাস্তায়। পাহাড়ের একেবারে উপরে জঙ্গলে ঘেরা নিঃশব্দ পরিবেশে চোখে পড়ল সারদা মঠ। গেট বন্ধ। কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। গেটের সামনে গাড়ি রেখে দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখি, একজন মালী ফুলগাছের পরিচর্যা করছেন। দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গেট খুলে ভিতরে আসতে বললেন। খুব সন্তর্পণে গেট খুলে ভিতরে প্রবেশ করলাম। সামনে একটা ছোট বন্ধ ঘর। তার সিঁড়িতে ভগিনী নিবেদিতার মতো পোশাক পরিহিতা এক বিদেশিনী নিশ্চল হয়ে বসে আছেন। দৃষ্টি বিনিময় হল। কথা না বলে আরেকটু এগিয়ে গেলাম। ততক্ষণে মালী গিয়ে খবর দিয়েছেন মাতাজিকে। মাতাজি এসে মাতৃমন্দিরের দরজা এবং মাতৃমন্দির দর্শন শেষে কোথায় গিয়ে বসব তা দেখিয়ে দিলেন। সেইমতো গিয়ে বসলাম। মাতাজি প্রত্যেকের হাতে প্রসাদ দিলেন। সুধীরভাই আমাদের সঙ্গে মাতৃমন্দিরে প্রণাম করলেন, প্রসাদ নিলেন। বেরিয়ে আসার পথে ওই ছোট ঘরটার দিকে গেলাম, তখন আর কাউকে দেখতে পেলাম না।

আলমোড়া রামকৃষ্ণ মিশন

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য আলমোড়া রামকৃষ্ণ মিশন। জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেল মিশনের অবস্থান আকাশবাণী ভবনের পাশে। যাওয়া গেল আকাশবাণী ভবনের কাছে। রাস্তার ওপরে স্বামীজির বিরাট মূর্তি। পাশ দিয়ে নেমে গেছে সিঁড়ি। অনেকগুলো ধাপ নেমে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। মূল মন্দিরের পাশেই অধ্যক্ষ মহারাজের অফিস। মুগধ হলাম অধ্যক্ষ মহারাজের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তায়। ওখানেই দুপুরের প্রসাদ পেলাম।

পূণ্যভূমি কাকরিঘাট

আলমোড়ার নিকটবর্তী কাকরিঘাট স্বামীজির স্মৃতি-বিজড়িত আরেকটি পূণ্যভূমি। অধ্যক্ষ মহারাজের কাছে খোঁজখবর নিলাম। জানালেন, শহর থেকে কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার দূরে কাঠগোদাম যাওয়ার রাস্তায় পড়বে জায়গাটা। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মুক্তেশ্বর। কাকরিঘাট আর মুক্তেশ্বর বিপরীতমুখী দুটি পথ। তা হোক, গাড়ি চলল কাকরিঘাটের দিকে। একই সমস্যা, না আছে কোনও নির্দিষ্ট ল্যান্ডমার্ক, না আছে গুগুল ম্যাপে নির্দিষ্ট জায়গাটির কোনও উল্লেখ। শুধু এটুকু জানি যে, নদী-সঙ্গমের তীরে কাকরিঘাটের অবস্থান। স্বামীজি আলমোড়া শহরে লালা বদ্রী শাহের বাড়িতে বসে ভক্তদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতেন। কাকরিঘাট যাওয়ার পথে গেলাম সেখানে। দুপুরে বন্ধ ছিল, ঘুরে দেখা হল না।

আলমোড়া শহর ছাড়াতেই নির্জন হয়ে উঠল রাস্তা। দু’পাশে পাইন গাছের সারি। একটু নীচে বয়ে চলেছে ছোট নদী কৌশি। প্রায় ২০-২২ কিলোমিটার যাওয়ার পরে খেয়াল রাখতে লাগলাম। মাঝেসাঝে দু’-একটা ছোট দোকান। কোথাও কোথাও সরু বনপথ চলে গিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে। হথাৎই একটা অনাড়ম্বর চায়ের দোকান চোখে পড়ল। দুপুর দুটো। দোকানে কোনও খরিদ্দার নেই। দোকানী কেটলি,কাপ ইত্যাদি ধুতে ব্যস্ত। গাড়ি দাঁড় করিয়ে এই জায়গাটা কাকরিঘাট কিনা জানতে চাইলাম। লোকটা কোনও কথা না বলে শুধু মাথা উপরে-নীচে দুলিয়ে বোঝালো আমাদের অনুমান সঠিক। স্বামী বিবেকানন্দ এখানে কোথায় এসেছিলেন জানেন? ভাঙ্গা হিন্দিতে জিগ্যেস করলাম। মুখে কোনও উত্তর পাওয়া গেল না। দোকানের পাশ দিয়ে একটা ছোট রাস্তা চলে গেছে ডান দিকে। দূরে অপরিসর একটি কাঠের সেতু। সেইদিকে আঙুল দেখালো লোকটা। বুঝলাম, এর বেশি আর জানা নেই ওঁর।

চায়ের দোকানীর নির্দেশিত পথে চলতে শুরু করলাম। রাস্তার পাশে মাঝে মাঝে ছোট ছোট দোকান। বেশির ভাগই বন্ধ। কয়েকটা বাড়িও চোখে পড়ল। হঠাৎই চোখে পড়ল একটা প্রাইমারি স্কুল। তার বারান্দায় বসে শীতের দুপুরে রোদে পিঠ দিয়ে তাস খেলায় মগ্ন কয়েকজন মাঝবয়সী দেহাতি মানুষ। স্বামী বিবেকানন্দ এখানে কোথায় ধ্যান করেছিলেন জানেন? একজন সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ালেন। নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। ভদ্রলোক স্কুলের পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া একটা সিঁড়ি দেখিয়ে দিলেন। তরতর করে নেমে যাচ্ছি সিঁড়িপথ ধরে। এক অমোঘ আকর্ষণ যেন টেনে নিয়ে চলেছে আমাকে। ঠিক কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি তা পরিষ্কার করে জানিয়ে আসা হল না গাড়িতে বসে থাকা অন্য সঙ্গীদের। নিজেই কি স্পষ্ট করে জানি গন্তব্য, উদ্দেশ্য?

সিঁড়ি নেমে গেছে অনেকটা নীচে। আমিও চলেছি। হঠাৎই চোখে পড়ল এক নদী। তাহলে কি এখানেই নদীর সঙ্গম? ডান দিকে একটা শিবমন্দির। তার বারান্দায় একজন সাধু গায়ে কম্বল দিয়ে বসে আছেন। চোখে দেখতে পান না। উদ্দেশ্য জানাতে হাত দিয়ে ডানদিকে খানিকটা নীচের দিকে দেখালেন। এই শিবমন্দির কত পুরনো জানি না। এখানেই সঙ্গমের কাছে অশ্বথথ গাছের তলায় বসে ধ্যান করেছিলেন স্বামীজি। আলমোড়া রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজের কাছে শুনেছি সেই পুরনো অশ্বথথ গাছটি আর নেই। ২০১৪ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে গাছটি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তারই একটি শাখা থেকে ক্লোন করে আবার একটি গাছ লাগানো হয়েছে একই জায়গায়। পুরনো গাছটির ডাল পবিত্র নিদর্শন হিসেবে রামকৃষ্ণ মিশনের বিভিন্ন শাখায় রাখা হয়েছে।

কাকরিঘাটের নদী-সঙ্গম তীরে লেখক। ছবি সৌজন্যে: লেখক

নদীর ডানদিকে বিস্তৃত বেলাভূমি। ওদিক থেকে স্নান করে উঠে আসছেন স্থানীয় একজন মানুষ। আমি একটু এগিয়ে গেলাম। লোকটি মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। উনি শিবলিঙ্গকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলে আমি জিগ্যেস করলাম, স্বামী বিবেকানন্দ এখানে কোথায় ধ্যান করেছিলেন জানেন? উনি মন্দিরের পিছনে ডানদিকে যেতে বললেন। গেলাম। সেখানে একটা ছোট বোর্ডে লেখা আছে, ‘১৮৯০ সালে স্বামী বিবেকানন্দ এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং এই অশ্বথথ গাছের নীচে বসে ধ্যান করেছিলেন’। আলমোড়ার পথে রাত্রিবাসের জন্য কাকরিঘাটের পানচাকির কাছে যে অশ্বথথ গাছের নীচে বসে ধ্যান করেছিলেন এই সেই পবিত্র ভূমি। ধ্যান শেষে স্বামীজি তাঁর সঙ্গীকে ডেকে বললেন, “এই বৃক্ষতলে একটা মহা শুভ মুহূর্ত কেটে গেল, একটা বড় সমস্যার সমাধান হয়ে গেল; বুঝলাম, সমষ্টি ও ব্যষ্টি, বিশ্ব-ব্রম্ভাণ্ড ও অনু-ব্রম্ভাণ্ড এক নিয়মে পরিচালিত।”

এখানে পুরনো অশ্বথথ গাছের নীচে বসে ধ্যান করেছিলেন স্বামীজি । ছবি সৌজন্য: লেখক

স্বামী অখন্ডানন্দের কাছে রক্ষিত একটি নোটবুকে স্বামীজি সেদিনের অনুভূতির কথা লিখে রাখেন। তিনি বাংলায় লিখেছিলেন। ইংরেজি জীবনী-গ্রন্থে মুদ্রিত কথাগুলি এরকমঃ “I have just passed one of my greatest moments of my life. Hereunder the peepal tree, one of the greatest problems of my life has been solved. I have found the oneness of macrocosm with microcosm, I have seen the whole within an atom.” একটু বড় আকারে বঙ্গানুবাদ এরকমঃ “বিশ্ব ব্রম্ভাণ্ড ও অনু ব্রম্ভাণ্ড একই নিয়মে সংগঠিত। ব্যষ্টি জীবাত্মা যেমন একটি চেতন দেহের দ্বারা আবৃত, বিশ্বাত্মাও তেমনি চেতনাময়ী প্রকৃতির মধ্যে বা দৃশ্য জগতের মধ্যে অবস্থিত। শিবা শিবকে আলিঙ্গন করিয়া আছেন। ইহা কল্পনা নয়। এই একের দ্বারা অপরের আলিঙ্গন যেন শব্দ-অর্থের সম্বন্ধের সদৃশ, তাহারা উভয়ে অভিন্ন এবং শুধু মানসিক বিশ্লেষণের সাহায্যেই উহাদিগকে পৃথক করা চলে। শব্দ ভিন্ন চিন্তা অসম্ভব। সৃষ্টির আদিতে ছিলেন শব্দব্রহ্ম, অতএব আমরা যাহা কিছু দেখি বা অনুভব করি সবই সাকার ও নিরাকারের মিলনে সংগঠিত।”(৩)

কতক্ষণ ওখানে একাকী দাঁড়িয়েছিলাম খেয়াল করিনি। সম্বিৎ ফিরল হঠাৎ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, প্রায় এক ঘন্টা হতে চলল। ধীরে ধীরে উপরে উঠে এলাম। পরিবারের সকলে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিল। অত নীচে মোবাইলে টাওয়ার সংযোগ ছিল না। তাই ফোন করে পায়নি। এবার ওদের সঙ্গে নিয়ে চেনা পথে নীচে নামলাম। শিবমন্দির, নদীর সঙ্গম, অশ্বথথ গাছ, সব ঘুরিয়ে দেখালাম। মন্দিরের চাতালে বৃদ্ধ সাধুটিকে আর দেখা গেল না। দেখা গেল না স্নান করে ফেরা সেই মানুষটিকেও। সে যেন আমাকে অভিষ্ট জায়গাটি দেখিয়ে দিতেই এসেছিল।

১৮৯০ থেকে ১৮৯৮-এর মধ্যে স্বামীজি তিনবার আলমোড়ায় এসেছিলেন। বোধি অর্জনের বছর ১৮৯০। এই স্থান তীর্থভূমি। এই নদী-সঙ্গম তীরে কান পাতলে যেন এখনো শোনা যাবে, স্বামীজি বলছেন, “ওঠো জাগো লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না”।

গ্রন্থসূত্র

(১) ‘স্বামীজিকে যেরূপ দেখিয়াছি’-গ্রন্থকার ভগিনী নিবেদিতা, উদ্বোধন প্রকাশনী (পৃষ্ঠা ৫২)।
(২) ‘A Haven of peace and serenity’- সারদা মঠ (কাসার দেবী, আলমোড়া) কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকা।
(৩) ‘যুগনায়ক বিবেকানন্দ’- গ্রন্থকার স্বামী গম্ভীরানন্দ, উদ্বোধন প্রকাশনী (পৃষ্ঠা ২৩০-২৩১)।

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বরঃ ৯৪৩৩৪-২১৮৮০।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *