Follow us
English

করোনা ও পর্যটন

করোনা ও পর্যটন

সম্পাদকীয়

পর্যটন তথা ভ্রমণ বা চলতি কথায় বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির সরাসরি একটা যোগাযোগ রয়েছে বলে একটা ধারণার কথা উঠে আসে থেকে থেকেই। বাস্তব চিত্রটি নিয়ে খানিক আলোকপাত করা যেতে পারে।

২০১৯-এর ডিসেম্বরে চিনের উহানে করোনাভাইরাসের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। ক্রমশ সারা পৃথিবী চলে গিয়েছিল করোনা অতিমারির কবলে। তারপর কেটে গিয়েছে আড়াই বছর। ভ্যাকসিন এসেছে বাজারে। এ দেশেও ভ্যাকসিন নিয়েছেন কোটি কোটি মানুষ। বেড়াতে ভালোবাসেন যাঁরা, তাঁরা তো নিয়েছেনই। অন্যথায় হোটেলে জায়গা পাওয়া যাবে না, ঢোকা যাবে না বিভিন্ন ভ্রমণাঞ্চলে। এখন তো বুস্টার ডোজ নেওয়ার পালা চলছে। অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে করোনা। মাঝেমধ্যে সংক্রমণের মৃদু ঢেউ উঠছে, ঢেউ নামছেও।

একটু নজর রাখলে দেখা যাবে বেড়ানোর ব্যাপারে পর্যটকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও বদল এসেছে গত আড়াই বছরে। ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে বেড়িয়ে আসার প্রবণতা বেড়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, প্রকৃতি পর্যটনে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। অফবিট ট্যুরিস্ট স্পটগুলিতে বেড়ানোর ঝোঁক বেড়েছে। অনেকেই গাড়ি ভাড়া করে বা নিজেদের গাড়ি নিয়ে কাছাকাছি জায়গা থেকে বেড়িয়ে আসছেন। ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এখন ‘ওয়ার্ক ফ্রম এনিহয়্যার’ ধারণায় বিস্তৃত হয়েছে। শান্ত পরিবেশে কোনও ভ্রমণ-আবাসে থেকে অফিসের কাজ করছেন অনেকেই। কাজের জন্য ভ্রমণ আমাদের দেশে একটা নতুন ধারণা।

হোটেল, রিসর্ট, হোমস্টে, লজগুলিতে করোনা প্রতিরোধক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। ট্র্যাভেল এজেন্টরাও এ ব্যাপারে, মানে ভ্রনণার্থীদের জন্য হোটেল নির্বাচনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতন ও সাবধানী। বেশিরভাগ পর্যটকও নিরাপদে বেড়ানোর ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করছেন।

এ বছরের পুরীর রথযাত্রা, চারধাম যাত্রা, অমরনাথ যাত্রায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটেছে। এমন সব বৃহৎ ধর্মীয়-ভ্রমণ সমাবেশগুলিতে করোনার মতো রোগের কিছুটা সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে যায় অবশ্যই। তবে এক্ষেত্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নানা বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়ে থাকে।

রাজনৈতিক মিটিং, মিছিল, সমাবেশে সংক্রমণের আশঙ্কা কি কম কিছু? কোভিড-প্রতিরোধক ভ্যাকসিন নেওয়া থাকলে তবেই রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণ করা যাবে, এমন নির্দেশ থাকে কি? যাত্রী বোঝাই বাস, ট্রেন চলছে। সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে সেখানেও। বাজার-হাটে মানুষকে তো যেতেই হয়। শুধু পর্যটনকে বলির পাঁঠা করা যায় কি?

এবার আসা যাক আরেকটি প্রসঙ্গে। ভারতীয় পর্যটনের সম্ভাবনা এবং কোভিডের কারণে সেই সম্ভাবনায় মারত্মক আঘাতের প্রসঙ্গ। ওয়ার্ল্ড ট্র্যাভেল অ্যান্ড টুরিজম কাউন্সিলের হিসেব অনুসারে, ২০১৮ সালে ভারতীয় ও বিদেশী পর্যটকদের কাছ থেকে এ দেশের পর্যটন ক্ষেত্রে ১৬.৯১ লক্ষ কোটি টাকা (২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) উপার্জিত হয়েছিল। এই অঙ্ক দেশের জিডিপি-র ৯.২ শতাংশ।

২০২০-তে দেশের জিডিপি-তে ট্র্যাভেল-টুরিজমের অংশ নেমে দাঁড়িয়েছিল ৪.৭ শতাংশে। ২০১৯-এ জিডিপি-র ৭ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল এই ক্ষেত্রটি থেকে।

কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রী জি কিষান রেড্ডি এ বছর ১৪ মার্চ লোকসভায় প্রশ্নোত্তর পর্বে জানিয়েছেন, অতিমারির কবলে পড়ার আগে দেশের পর্যটন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ৩ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ। করোনার তিনটি ঢেউয়ে এ ক্ষেত্রের ২ কোটি ১৫ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, কোভিড অতিমারির প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউয়ের সময়ে ভারতে বিদেশী পর্যটকের আগমন যথাক্রমে ৯৩, ৭৯ ও ৬৪ শতাংশ হারে কমেছে।

কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুসারে ভারতের পর্যটন ক্ষেত্রে বিদেশী মুদ্রা অর্জনের পরিমাণঃ ২০১৮ সালে ১,৯৪,৮৮১ কোটি টাকা, ২০১৯ সালে ২,১১,৬৬১ কোটি টাকা ও ২০২০ সালে ৫০,১৩৬ কোটি টাকা।

করোনা-সংক্রমণের তীব্রতা যখন নিম্নমুখী, দেশের পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্প তখন ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। মানুষ বেড়াতে চাইবেনও। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেড়াতে হবে এমনটা কাম্য নয় মোটেই। করোনা প্রতিরোধক যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন করে বেড়ানোর ব্যবস্থা তো হতেই পারে।

শহুরে দূষণ থেকে খানিক দূরে সরে গিয়ে গ্রামীণ পরিবেশে বা পাহাড়ের অভ্যন্তরে বা অরণ্যপ্রান্তে অথবা সৈকতভূমিতে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যেমন ভ্রমণ, তেমন কোভিড-বিরোধী অভিযানও বটে।

ফটোঃ সৌমাভ রায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *