Follow us
English

অমৃতধারার সন্ধানে

অমৃতধারার সন্ধানে

সাল ১৯৯৬। পুজো সেবার অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে। চার-পাঁচ মাস আগেই প্ল্যান রেডি, এবার গঙ্গোত্রী হিমবাহ ধরে চৌখাম্বা আইসফল অবধি যাবো। কিন্তু বিধি বাম। যাবার মাস খানেক আগে উত্তরাখণ্ডে প্রবল বন্যার সাথে ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে গেল। ক্ষতি ওপরদিকেই বেশি হয়েছিল। ফলে শেষ মুহূর্তে আমাদের প্ল্যান পালটাতে বাধ্য হলাম। ঠিক হল তপোবন অবধি যাব, তারপর পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিক হবে পরবর্তী পথ।

এবার আমরা মোট ন’জনের দল। সঞ্চয়ন(দাদু), নিমাই, তাপস, নূপুর, রামু, রানা, হেমন্ত, মনু (মুনম্যান) আর আমি। একটু অদ্ভুতভাবে আমরা হরিদ্বারে গেলাম। হাওড়া থেকে শক্তিপুঞ্জ ধরে ধানবাদ, সেখান থেকে গঙ্গা-শাটলেজ এক্সপ্রেস ধরে লাক্সার। লাক্সার থেকে হরিদ্বার। সঞ্চয়ন আমাদের ম্যানেজার। দু’বছর আগে গোচালা থেকে ফেরার সময় পথে নিমাইয়ের সঙ্গে আলাপ। এখন আমাদের টিমের অন্যতম সদস্য। তাপস সর্বভারতীয় এক পাঁপড় কোম্পানির পূর্ব ভারতের সেলস ম্যানেজার। নূপুর জেনারেল অর্ডার সাপ্লায়ার। মনুদের কয়েক পুরুষের কাগজের ব্যবসা বড়বাজারে। হেমন্ত বি জি প্রেসের চাকুরে। রামু ফটোগ্রাফার। রানা প্রিন্টিং লাইনে মিডিলম্যানের কাজ করে। সঞ্চয়ন স্টিল ফার্নিচার ম্যানুফ্যাকচারার। আর আমি, কি করি নিজেও জানি না।

ধানবাদ ঢুকে গেলাম সাড়ে পাঁচটায়। প্রচন্ড গরম। প্ল্যাটফর্মে পাহাড় প্রমান মাল নামিয়ে প্রথমে তাপস, সঞ্চু, নূপুর আর নিমাই লাইনের পাশে রেলের যে জলের লাইন থাকে সেখানে নেমে পড়লো চান করতে। সবাই সঞ্চুর পেছনে লাগে। আর সঞ্চু সেটা এনজয়-ও করে। হেমন্ত নিমাইকে প্রায় পাগল করে দেয় পেছনে লেগে থেকে। সঞ্চুর সঙ্গে রানার খিটিমিটি চলতেই থাকে। রানার অ্যলকোহলে একটু বেশিই দুর্বলতা আছে । অদ্ভুত একটা গ্রুপ আমাদের। রামুর একটা চোখ গতবছর নষ্ট হয়ে গেছে থাম্বস আপের বোতল বার্স্ট করে। এখন ওই চোখে পাথর বসানো। আসার আগে রামুর বৌদি আমার হাত ধরে বলেছিলেন, একটু চোখে চোখে রাখবেন ওকে। আপনাকে খুব মান্যি করে ও। দেখবেন যেন কোন বিপদ না হয়। আমি কথা দিয়ে এসেছি, যেমন নিয়ে যাবো রামুকে ঠিক তেমনই ফিরিয়ে দেব আবার।

যাই হোক, প্রায় আড়াই দিন পর হরিদ্বারে এসে আমাদের পুরনো ডেরায় উঠলাম। পরদিন ভোরের বাসে গঙ্গোত্রী রওনা দেব। টুকটাক কিছু কেনার ছিল, সে-সব সেরে রাত দশটা নাগাদ শুয়ে পড়লাম।

পরের দিন সকাল ছ’টার বাস ধরেছি। সিদ্ধান্ত হয়েছে, সবাই মিলে আজ উত্তরকাশীতে থেকে যাব। আড়াই দিনের ট্রেনের ধকল নিয়ে আজ এর বেশি শরীরে পোষাবে না। পথের বর্ণনা দিয়ে পাঠকদের ক্লান্ত করব না একদমই। যাঁরা পড়ছেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই কখনো না কখনো এ পথে গেছেন। উত্তরকাশী পৌঁছলাম বেলা তিনটে নাগাদ। সোজা গিয়ে একটা হোটেলে (পুরোনো ঠেক) উঠলাম। সবাই ক্লান্ত। একটু ফ্রেশ হয়ে আমি, নিমাই আর দাদু বেরোলাম পোর্টার ঠিক করতে। কাজ সেরে দাদু বললো, নেব নাকি একটা বোতল? ন্যাকা না কি! নিলে নে। মনে হচ্ছে আমার পারমিশনের অপেক্ষায় আছিস চল, ঢং না করে, বলি আমি। বোতল, একটু শশা, টোম্যাটো, পিঁয়াজ, লেবু আর পকোড়া নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। সাতটা বাজে। সঞ্চুকে বললাম, তাড়াতাড়ি শেষ করবি। ঘুমোতে হবে জম্পেশ করে। তাপস, নূপুর আর হেমন্ত খায় না। নিমাইও না খাবার মতই। বাকি আমরা পাঁচজন। স্যালাড, জল, গ্লাস বোতল নিয়ে আমরা চারজন মাটিতে বসেছি আর বাকিরা খাটে বসে আছে। কালও আমরা এখানে থেকে যাই, আমার মনে হয় আরও একদিন বিশ্রাম পেলে ভালোই হবে, প্রস্তাব করি আমি। কেউ প্রতিবাদ করল না, মনে মনে হয়তো এটাই চাইছিলো সবাই। রাতে রুটি, ভেজ কোর্মা আর পনির পালক খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

আজ শুধু বিশ্রাম আর বিশ্রাম। বিকেলে একটা গাড়ি ভাড়া করে কাছেই একটা লেক দেখতে গেলাম। জঙ্গলের মধ্যে নিরিবিলিতে শান্ত পরিষ্কার সুন্দর এক তাল। ফেরার পথে সন্ধ্যের অন্ধকারে রামু উত্তরকাশীর একটা ছবি তুললো। পরে যখন ছবি দেখেছিলাম তখন আমার এই ছবিটা দেখে একটাই কথা মনে হয়েছে, অসাধারন বললে একটু কমই বলা হয়।

আজ অবশেষে আমরা গঙ্গোত্রীর পথে চলেছি একটা টাটা সুমোয় চেপে। আবার বৃষ্টি নেমেছে। ঝিরঝিরে একটানা বিরক্তিকর বৃষ্টি । হরশিলে গাড়ি দাঁড়ালো। ক্ষনিকের বিরতি। চা-পাকোড়া খাওয়া সেরে গাড়িতে উঠতে যাবো, পিছন থেকে জামায় টান। তাকিয়ে দেখি একটা পাঁচ-ছয় বছরের মেয়ে একটা ছোট্ট টুকরিতে দশ বারোটা সবুজ আপেল নিয়ে দাঁড়িয়ে। কত দাম জিঞ্জেস করতে বললো দশ রুপইয়া। আমি ওকে কুড়ি টাকা দিয়ে নিয়ে নিলাম সবগুলো। বালিকার খুশির হাসি প্রাণটা জুড়িয়ে দিল। গাড়ি চালু হতেই সবার হাতে আপেল। কামড় দিতেই রস গড়িয়ে কুনুই বেয়ে পড়তে শুরু করলো। খুব মিস্টি। তিনটে নাগাদ লঙ্কা এসে গেলো। আইস ব্লু জিনসের মত নদীর জল। বৃষ্টি আরো বেড়েছে। ঝমঝম বৃষ্টির ভেতরেই গঙ্গোত্রী পৌঁছলাম পাঁচটা নাগাদ। অক্টোবরের মাঝামাঝির বৃষ্টি, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। তাড়াতাড়ি গিয়ে পূর্ব পরিচিত ধর্মশালায় উঠলাম। রাতে খিচুড়ি আর ওমলেট। একটু লুকিয়ে খেতে হবে, আমিষ খাওয়া মানা ধর্মশালায়। এই বৃষ্টিতে আর বেরিয়ে কাজ নেই। বরং তারাতাড়ি ডানহাতের কাজ শেষ করে শুয়ে পরতে পারলেই বাঁচে সবাই।

পরদিন সকাল একদম ঝকঝকে। ঠিক আটটায় বেরিয়ে পরলাম ভূজবাসার পথে। দেখতে দেখতে চীরবাসা পেরিয়ে গেলাম। আমি নূপুর তাপস আর রানা এক জায়গায় বসলাম সিগারেট ‌ধরিয়ে। বেশ কিছুটা দূরে বাকিদের দেখা যাচ্ছে আসতে। হঠাৎ রানা বললো, ওই দেখ, মুনম্যান আসছে। দেখি মনু আসছে গোল মোটা শরীর নিয়ে।। ব্লু ট্রেকস্যুট ওপর নীচে, গোল মোটা ফ্রেমের চশমা, পিঠে ব্লু-ব্রাউন রঙের স্যাক, মাথায় ব্রাউন হুনুমান টুপি, পরে হেলেদুলে আসছে। মনে হচ্ছে যেন মহাকাশচারীদের মত ভেসে ভেসে আসছে। মনুর নতুন নামই হয়ে গেলো মুনম্যান। পথ ক্রমে চড়াই হচ্ছে। সবুজ অনেক কমে গেছে। ধসা পাহাড় অঞ্চলে চলে এসেছি। আর বেশি পথ বাকি নেই। দেখা যাচ্ছে ভূজবাসার লালবাবার আশ্রম আর ওপরে জিএমভিএন বাংলো। বেলা তিনটে নাগাদ ঢুকে পড়লাম ভূজবাসার লালবাবার আশ্রমে।


শরীরের ঘাম শুকিয়ে যেতেই মালুম পেলাম ঠান্ডার দাপট। জল খাওয়া যাচ্ছে না, এত ঠান্ডা। লালবাবার সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। শীতে যখন গোটা অঞ্চল বরফের নীচে চলে যায় তখন প্রায় ছ’মাস লালবাবা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ঘুরে বেড়ান ভক্তদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। ফান্ড কালেকশন করেন। কলকাতাতেই প্রায় তিন মাস থাকেন ভবানীপুর অঞ্চলে। বছর কুড়ি আগে আমরাই ঠিক করে দিয়েছিলাম জায়গাটা। পয়সাকড়ি কিছু লাগে না। এছাড়া সারা বছর পরিচিত মানুষ কেউ এ পথে এলেই তার হাত দিয়ে অনেক ওষুধ পাঠিয়ে দিই। তাই আমাদের খাতির একটু বেশিই হয়। একটা আলাদা খড়ের গদিওয়ালা ঘর বরাদ্দ হলো আমাদের জন্য। ঘন ঘন চা আর পকোড়া আসতে থাকল। কম্বল মুড়ি দিয়ে আড্ডা চলছে। আরতি শেষ করে লালবাবা নিজে এলেন দেখা করতে। আগেই শুনেছিলাম পাইলসে খুব কষ্ট পাচ্ছেন। স্যাক থেকে ওষুধ বের করে বুঝিয়ে দিলাম কীভাবে কখন খেতে হবে। তারপর যখন শুনলেন এবার হয়তো আমরা একটু বেশি দিন তপোবনে থাকবো তখন বললেন, চিন্তা নেই কিছু, আমার লোক আছে তপোবনে। বাঙালি আদমী আছে। আমার একটা চিটঠি ওর হাতে শুধু দিয়ে দিবি পৌঁছে। রাতে লিখে রাখবো।
রাতে রুটি আর রাজমা খেয়ে থালা ধুতে গিয়ে দেখি ড্রামের জল জমে পাথর। হাতুড়ি মেরে বরফ ভেঙে জল বার করতে হলো। দুর বাবা, আর কোন কথা নয়। চারটে কম্বল নিয়ে শুয়ে পড়লাম ডাইভ মেরে।

ভোরে মঙ্গলারতির সময় ঘুম ভাঙল। বাইরে এসে এক নিমেষেই মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠলো। ডানদিকে ভাগীরথী বয়ে চলেছে। সামনে বাঁদিকে ভাগীরথী রেঞ্জের মাথা আর ডানদিকে শিবলিঙ্গের শৃঙ্গে সোনালী আভা খেলে বেড়াচ্ছে। পকেট থেকে হাত বার করা যাচ্ছে না। দু’দিন পরে লক্ষ্মীপুজো। মনটা খুশিতে ভরে উঠলো।

সাড়ে আটটা নাগাদ সবাই তৈরি হয়ে বেরিয়ে পরলাম তপোবনের পথে। লালবাবা একটা চিঠি দিয়ে দিয়েছেন তপোবনের বাঙালিবাবার জন্য। আর আমাদের সঙ্গে রাম নামের এক গাড়োয়ালি ছেলেকে দিয়ে দিয়েছেন গাইড হিসেবে। এই রাম আমাদের পূর্ব-পরিচিত। বেশ কয়েকবার কলকাতায় এসেছে লালবাবার সঙ্গে। উজ্জ্বল টকটকে গায়ের রং। হাসিখুশি স্বভাবের। এগিয়ে চললাম হাসি মজায়। একটু পরেই নীচে গোমুখের পথ ছেড়ে আমরা ওপরের তপোবনের পথ ধরলাম। ফেরার সময় গোমুখ হয়ে ফিরব। চড়াই পথে চলেছি। সিজনের শেষ পর্যায় এখন। ওপরের সব বরফ গলে গিয়ে ক্রিভার্সের মুখগুলো সব হাঁ করে আছে। মুখের চারপাশে নীলচে সবুজ রং। অনেক বছরের পুরনো বরফের রং। বেশ ভালো চড়াই, তবে বাড়াবাড়ি রকমের নয় মোটেই। একটু চোখ কান খোলা রেখে চললে যে কেউ যেতে পারেন তপোবনে। মাঝে এক জায়গায় একটু বিশ্রাম নিতে নিতে খেজুর, আমসত্ত্ব আর কেক খাওয়া হলো। বেলা প্রায় দু’টো নাগাদ তপোবনে এসে পৌঁছলাম। ওপরে উঠে বাঁদিকে একটু এগোলেই একটা পাথরের গুহা। আগে একবার ওখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেই গুহাটাকে সামনে টিন দিয়ে আরো বড় করে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাঙালিবাবার আশ্রম। আমাদের বেশ কিছুটা আগে রাম এসে বাবার হাতে চিঠিটা দিয়ে দিয়েছে।

স্বয়ং লালবাবার সুপারিশ বলে কথা। আমরা পৌঁছতেই তাঁর দেখা পেলাম। বছর ষাটেকের একজন মানুষ, খালি গা, হাঁটু অবধি ধুতি, গলায় মোটা পৈতে। মাথার সামনে চুল কম, কিন্তু পেছনে বেশ বড় জটা। চেহারাও বেশ ভালো। দেখলেই বোঝা যায় শক্তিশালী পুরুষ। ঠান্ডায় দীর্ঘদিন থাকার ফলে কিনা জানি না গলাটা ভাঙ্গা, কর্কশ। ফাটা বাঁশের মতো। আমাদের দেখেই বললেন, এসো বাবারা এসো। আগে বসে একটু জিরিয়ে নাও, জল আর চা খাও, তারপর ভেতরে যাও। সবাই প্রণাম করলো, কেউ কেউ তো ষষ্ঠাঙ্গে। আমি একটু দূরে একটা পাথরের ওপর বসে সিগারেট খাচ্ছিলাম। সবার প্রণামের পর্ব শেষ হতে এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আয় বাবা, এদিকে আয়, তোর জন্যই তো অপেক্ষা করছি রে। আমি এগিয়ে বললাম,কি চাই? সিগারেট? হেঁ হেঁ..দে দেখি একটা। দিলাম প্যাকেট থেকে বার করে। উঁহু, তুই ধরিয়ে আমায় দে। বললাম, ধরালে তো এঁটো হয়ে যাবে! ..আরে, তোর প্রসাদ খাবো বলেই তো বসে আছি রে কবে থেকে।

বুঝলাম, মনে মনে বললাম, বহুত ধড়িবাজ তুমি। যতই নাটক করো না কেন, এ চিঁড়ে ভিজবে না বাবা। কালিঘাটের এ মাল বহু ঘাটের জল খাওয়া বাবা, সে আর তুমি জানবে কি করে।

বসলাম এবার পাথরের চাতালে। খিঁচড়ে যাওয়া মনটা নিমেষে ভালো হয়ে গেল। সামনে তপোবনের বিস্তৃত হলদেটে সবুজ ঘাসের ময়দান। মাঠের শেষে খাড়া পাহাড়ের দেয়াল উঠে গেছে। বাঁদিকে কোনাকুনি শিবলিং কি এক অদ্ভুত মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে, পাশ থেকে বেবি শিবলিং (মেরু পর্বত) উঁকি মারছে। শেষ বিকেলের আলো এক মোহময়ী পরিবেশ তৈরি করেছে। পায়ে চলা পথ ধরে সামনে এগোলেই বাঁদিকে গঙ্গোত্রী হিমবাহ দেখা যাচ্ছে। হিমবাহের ওপারে ভাগীরথী রেঞ্জ পড়ন্ত সূর্যের আলোয় এক অপূর্ব রুপ ধারণ করেছে। আর রয়েছে নন্দনবন। আরেক অসাধারণ জায়গা। নন্দনবনকে ঘিরে রয়েছে চতুরঙ্গী, রক্তবর্ণ আর গঙ্গোত্রী হিমবাহ। এরপরে যদি কারুর স্বর্গ বাসের লোভ থাকে তা হলে ঈশ্বর তাকে নির্ঘাত নরকে পাঠাবেন।
হঠাৎ দেখি এক মাঝবয়সি মহিলা হাতে একটা লোহার বালতি নিয়ে ময়দানের দিক থেকে আমাদের দিকে আসছেন। মাথায় ভিজে গামছা জড়ানো। বোঝাই যাচ্ছে, সদ্য স্নান সেরে এলেন। বাবা বললেন, দ্যাখো গো তোমার ছেলেরা এসেছে, একটু খাতিরদারি কোরো ভালো করে। ভদ্রমহিলা ভেতরে চলে গেলেন। দশ মিনিটের মধ্যেই প্রথমে চা আর কুচো নিমকি চলে এলো। চা শেষ করতে করতে অন্ধকার নেমে এলো। আমরা ভেতরে চলে এলাম। ঠান্ডায় বসা যাচ্ছে না আর। ভেতরে একটু চাপাচাপি করে জনা পনেরো মানুষ শুতে পারবে আরামসে। একটু পরেই গরম গরম লুচি, বাঁধাকপির তরকারি আর নারকোল নাড়ু এলো। এ কিরে বাবা! এ তো পুরো জামাই আদর! দাদু বললো, আরে এনজয় কর। এতো ভাবিস না। আমাদের পুরো রেশনটাই দিয়ে যাবো যাবার সময়। মনে মনে বললাম…নাঃ, কেমন যেন একটা গন্ধ পাচ্ছি। বুঝবি পরে। আবার একপ্রস্থ চা এলো। চা খেয়ে এবার বাইরে এলাম।

রাত তখন প্রায় আটটা। কাল লক্ষ্মীপুজো। আজ গোটা তপোবন আলোয় ভেসে যাচ্ছে। এখন বিশাল হলুদ থালার মতো চাঁদ প্রায় হাতের নাগালে। কলকাতায় এত বড় চাঁদ কেউ দেখেনি কখনো। সব কিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সিগারেট ধরালাম। নিমাই এসে পাশে বসলো, এ কি দেখছি দাদা! এ তো মনে হচ্ছে বাইরে বসেই রাত কাটাতে হবে গো! ভেতরে থাকবো কেমন করে এ জিনিস ছেড়ে! সামলাতে পারলাম না নিজেকে, বললাম,বিয়ে তো করিসনি এখনো, তাই এই কথা বলছিস। বিয়ের পর বলবি,বাইরে থাকবো কেমন করে!
ধ্যার বাবা, আপনার না মুখের কোন তাল নেই মাইরি। দিন দেখি, একটা সিগারেট দিন। দিলাম একটা। বললাম, কথা বলিস না। চুপ করে বোস আর চোখ কান খোলা রাখ। চুপ করে বসে আছি দুজনে। অনেকক্ষণ। চটকা কাটলো ফাটা বাঁশের আওয়াজে, ওরে, ও অমল, আয় বাবা ভেতরে আয়, খেয়ে নে বাবা। ঠান্ডা লেগে যাবে এরপর। আবার খিঁচড়ে গেলো মেজাজটা। চলে এলাম ভেতরে দু’জনে। সবাই অর্ধেক শরীর স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঢুকিয়ে আড্ডা মারছে। বাঙালি বাবা কিন্তু সেই খালি গায়ে। রাতে লুচি, ঘুগনি, রাজমা আর ক্ষীর। আরে লোকে ট্রেক করে স্লিম হয়ে বাড়ি ফেরে, আর আমরা তো মনে হচ্ছে ভুঁড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরবো। যা খাতির হচ্ছে, বাঁচলে হয়! খেয়ে উঠে আবার বাইরে এলাম। সিগারেট খেতে। এখন চাঁদের রং প্রায় সাদা। জোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে গোটা তপোবন। চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে।

পরের পর্বে তপোবনের প্রান্তর থেকে শিবলিং আর মেরু পর্বত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *